somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি মসজিদ-ইঁদুরের দিনলিপি

২৫ শে মে, ২০০৬ বিকাল ৪:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মসজিদটি বেশ বড়ই। এবং বেশ পুরনোও। তিন-চার গাঁয়ের মানুষ এখানে নামাজ পড়তে আসে। জুম্মা আর ঈদে এখানে মানুষের জায়গাই হয় না। কিন্তু মানুষের জায়গা না হলে কি হবে, আমাদের হয়, আমরা বেশ কয়েকঘর আছি এই মসজিদের ভিটায়। আমার সনত্দান-সনত্দতি নিয়ে আমার বসবাস ঠিক মিম্বরের নীচেই।

মসজিদে আছি বলেই হয়তো আমাদের কারোরই খাওয়া-দাওয়ায় কোনও কষ্ট নেই। শুনেছি আজকাল যারা মাঠে-ৰেতে থাকে তাদের খুব অসুবিধে, ফসলে আজকাল যে হারে বিষ দেয়, বেশিরভাগই ঠ্যাং উল্টে চিতপটাং। আমার সনত্দানদের তাই আমি মাঠে যেতে নিষেধ করি, কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মেরও কাহিনী, মানুষই শোনে না, তা ওরাতো ইঁদুর!

আমার দিনটি শুরম্ন হয় খুব ভোরেই, যদিও ইঁদুর ধর্মানুযায়ী সারারাত ঘুমহীন আমার সকালে ঘুমুবার কথা। কিন্তু খুব ভোরে যে ব্যক্তি মসজিদে আসে সে দীর্ঘৰণ মসজিদের সামনে পায়চারী করে, এক হাত দিয়ে লুঙ্গিটা নীচ থেকে তুলে অনেকৰণ হাঁটে সে। সেই শব্দেই জেগে যাই। তারপর তো মেলা পদশব্দ। কখনও সুর করে, কখনও বিড়বিড় করে বিজাতীয় ভাষায় কবিতার মতো কি যেনো পড়া হয়। এই দেশে জন্ম, এই দেশের খেয়েপরে বেঁচে থাকা, মানুষের মুখের ভাষাটা তাই পরিচিত, কিন্তু মসজিদে কেন অন্য ভাষা চলে কে জানে? ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা যখন এই ভাষা মুখসত্দ করে তখন ওদের চোখে-মুখে না-বোঝার অসহায়তা দেখে কষ্ট লাগে। আমার সনত্দানদের কেউ যদি দুষ্টুমি করে তবে ওদের আমি বলি, তোমরা দুষ্টুমি করলে যাদু দিয়ে তোমাদের মানুষ বানিয়ে ফেলবো, তারপর ওই ওদের মতো তোমাদেরও. . . . . !

সকালের পরে অনেকৰণ মসজিদ নিশ্চুপ, তখনই যা একটু চোখবোজার সময় পাই আমরা। তারপর আবার শুরম্ন হয়, তবে গ্রামের মসজিদ তো, মানুষজন ৰেতে-খামারে কাজ করে, তারা খুব একটা আসে না মসজিদে। তারাও আমাদেরই মতোন, পেটের চিনত্দায় তাদের দিন যায়, রাত কাটে না, দুপুরে তাদের পিঠে নুন ফুটে বের হয়। ভাগ্যিস তাদের মতো আমাদের শরীর ঢাকার চিনত্দা করতে হয় না। আমরা খাই-দাই-হাগি, সবই এই মসজিদে।

প্রতিদিন সকালে আমরা অপেৰায় থাকি কে মসজিদে বাতাসা কিংবা মুড়ির মোয়া বা অন্য কিছু দিয়ে যাবে সে জন্য, শুধু আমরা না বুঝতে পারি, আরও কেউ কেউ মসজিদে কখন কি আসবে সেই অপেৰায় থাকে। আমাদের মতো সেও মসজিদের ওপরই ভরসা করে বেঁচে থাকে। তবে আমাদের সঙ্গে তার পার্থক্য হলো, সে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ওই বিজাতীয় ভাষায় কি যেনো বলে। সপ্তাহের যেদিন অনেক লোক জমা হয়, সেদিন অনেক খাবারও আসে। সবাই যখন নিশ্চুপ থাকে, শুধু একজনের মুখের কথা শুনে সে যা বলে সবাই তা করে যায় তখন আমরা চুপিসারে জিনিসপত্র সরাতে থাকি, কখনও পায়েস, কখনও ফল, কখনও বা অন্যকিছু। তাও কি আর পারি? মানুষের চোখ, মাটিতে কপাল ঠেকালেও চোখ থাকে খাবারের দিকে। ওদিকে মাটিতে ঠেকাতে ঠেকাতে কপালে গোল কালো দাগ পড়ে গেছে!

গ্রামের মসজিদ বলেই সুনসান সারাদিন, আমরা মহানন্দে ঘোরাফেরা করি চারদিকে। শুধু রাত হলেই রাজ্যের ভয় এসে জড়ো হয় আমাদের মনে। কারণ তখন ইয়া বড় বড় সাপ বের হয় কোত্থেকে যেনো। মানুষেরা বলে শুনি, মসজিদে নাকি কোনও কিছুর ভয় নাই, কে বলে, এই মসজিদের ভিটাতেই থাকে গোখরা, দাঁড়াস, শংখচূড়, আরও কতো রকম সাপ! সবাই আমাদের খেতে আসে। কিন্তু সকালবেলা একটা মানুষের হাত সাপের মতো মেয়ে শিশুর বুকে ছোবল মারে, সকালে এখানে আসা অনেক মেয়েরই মুখ তখন ব্যাথায় নীল হয়ে যায়। সেই হাত-সাপ ওদের গিলে খায় না বলে ওরা প্রতিদিন মরে, প্রতিদিন বেঁচে থাকে। আহা আমরা ইঁদুররা একবার মরি!

মাঝে মাঝে আমার মনে প্রশ্ন ওঠে, মানুষেরা মসজিদে আসে কেন? ওদের বলতে শুনি, এখানে এলে, মাটিতে মাথা ঠেকালে, বিড়বিড় করে বিজাতীয় ভাষা আওড়ালে নাকি মৃতু্যর পরে অপার শানত্দি আসবে। ওদের এই সমবেত পাগলামি দেখে আমরা ইঁদুরেরা হাসি, হেসে লুটোপুটি খাই, ওদের এই এ্যাত্ত বড় মাথা, কিন্তু আমাদের এক রত্তি মাথার চেয়েও ওদের বুদ্ধি কম মনে হয়। মৃতু্যর পর আমরা ঠ্যাং উল্টে পড়ে থাকি আর ওদেরকে মাটির নীচে রেখে যাওয়া হয়, আমাদের মতো আরও অনেকের ভোজের জন্য। ওদের হাড়গোড় আমরা মাটিতেই মিলিয়ে যেতে দেখি, আমাদের চোখের সামনে।

এই মসজিদের পাশেই একটি কবরস্থান, প্রতিটি কবরের খোঁজ আমার জানা, কার হাড্ডির কতোটুকু অবশিষ্ট আছে, কার নেই, নতুন ক'টি কবর হলো, সব। মৃতু্যর পর যদি ইঁদুরেরই খাবার হবি তো সেজ্দা গুতিয়ে মাথায় কালোদাগ ফেলার কী কারণ!

ওরা খুব ভয় পায়, মৃতু্যর পরে কী হবে? কিছুই হবে না ইঁদুর কিংবা সাপখোপের খাবার হবি, তারপর মাটিতে মিশে যাবি, আর কি? এই মসজিদে প্রতিদিন ওদের ভয় দেখানো হয়, যে ভয় দেখায় সে ভয় দেখিয়ে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়, আমরা বুঝি, সে খাটতে চায় না, সে লাঙলের গুটি ধরতে জানে না, সে জানে শুধু কথা বলতে, কথা বলে সে বেঁচে থাকে। এদিক দিয়ে কিন্তু আমরা ওই মানুষটার চেয়ে ভালো, আমরা সারাদিন দেঁৗড়ে ফিরি খাবারের জন্য, কষ্ট করে খাবার আনি, আমরা কারো ৰতি করি না, স্বভাবমতো আমাদের কাজ করি, অনুশোচনাহীন। অনুশোচনা থাকলেই পাপ-চিনত্দা আসে, পাপ-চিনত্দাই ভয় ঢুকিয়ে দেয় মনে, আর সেই ভয়ে যে মানুষেরা কতো কিছু করে! আমরা ভাবি, ভাবি আর হাসি, ভাবি আর হাসি, হাসতে হাসতে আমরা লেদিয়ে ভরে ফেলি এই মসজিদ।

খুব ইচ্ছে করে, একদিন মুখে মুখে পেস্নগ-বীজ নিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে আসি, ওদের বোকামির যোগ্য পুরষ্কার সেটাই _ কে জানে হয়তো ওরা ভয় পেয়ে তখন আমার মতো ছোট্ট ইঁদুরকেও খোদা ভেবে.. হাহ. . . হা. . . হা. . . হা

সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×