somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি `জোছনার শহর' উপাখ্যান

২৮ শে নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সুনামগঞ্জের সাশ্রয়ী চাঁদ... আকাশ ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’। এই ছিল ভোরের কাগজের মেলায় প্রকাশিত প্রধান ফিচারের শিরোনাম। ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারি ছাপা হয়েছিল। সেই থেকে সুনামগঞ্জকে নিয়ে দেশ-বিদেশে ‘জোছনার শহর' গল্পের প্রকাশ। এ গল্পের ‘নায়ক’ ছিলেন একজন। তিনি মরমী কবি হাছন রাজার প্রোপৌত্র মমিনুল মউজদীন। জোছনার শহরের রূপকার।
অন্যজন নেপথ্যের ‘মহানায়ক’ শিল্পী-সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী। প্রায় এক দশক পূর্বে জোছনার শহরকে প্রকাশ করে তোলার একটি মুহূর্তে এই নায়ক-মহানায়কের মাঝখানে অবস্থান ছিল আমার। জোছনার শহর আছে, কিন্তু নায়ক আর মহানায়ক নেই। বড় অসময়ে আর অকালে বলতে গেলে পিঠাপিঠি সময়ে দুজনই চলে গেলেন প্রায় এক সঙ্গে। তাই শোনাতে চাইছি- জোছনার শহর উপাখ্যান।
মেঘ-পাহাড়, হাওর-নদী বেষ্টিত শহর সুনামগঞ্জ। দণি ভাগে দেখার হাওর। উত্তরজুড়ে প্রবহমান সুরমা, তারপর মেঘালয় পাহাড়। প্রকৃতির শান্ত-সুমন্ত ভাবের শহর মরমী কবি হাছন রাজার জম্মের শহর। মানুষের মনে কবিতার টান, মন মজানো বাউলিপনা মিলিয়ে শহরের পরিবেশ অন্যরকম। শান্তি-সম্প্রীতির শহর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার একটি পরিপ্রেতি ঠেকাতে ১৯৯৩ সালে তরুণ মমিনুল মউজদীন পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। হাওর-নদীর প্রাকৃতিক বেষ্টনের কারণে সুনামগঞ্জ শহর জোছনার রাতে আশ্চর্য রকম সুন্দর হয়ে ওঠে। পরিবেশ-প্রতিবেশ সবই কবিতার। মমিনুল মউজদীন শহরকে ‘কবিতার শহর’ ঘোষণা করলেন। চুপিচুপি আরেকটি কাজও করলেন। জোছনা রাতে শহরের স্ট্রিট লাইটের বাতি নিভিয়ে শহর ঘুরে জোছনা উপভোগ করা।
একান্ত নিজের এ আনন্দ যখন শহরবাসী অনেকের আনন্দ হয়ে ওঠল, তখন মমিনুল মউজদীন এটিকে একটি উদ্যোগে পরিণত করার চিন্তা করলেন। পাঁচ বছর পর পৌর পরিষদের একটি বৈঠকে এ ব্যাপারটি জানালেন। লোডশেডিংয়ের মধ্যে বাতি নিভিয়ে জোছনা দেখায় ছোট্ট করে হলেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। আমি তখন ভোরের কাগজের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে ‘ব্যতিক্রম’ শিরোনাম দিয়ে একটি খবর পাঠালাম। মফস্বল সম্পাদক রমেন বিশ্বাস এ রিপোর্টকে বক্স আইটেমে ছাপতে দেন। কিন্তু পেস্টিং রুম থেকে রিপোর্টটি উধাও হয়ে যায়। ফেব্র“য়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের একদিন রমেন বিশ্বাস জানালেন, রিপোর্টটি ছাপার আগে উধাও হওয়ার কাহিনী।
ভোরের কাগজের মেলার বিভাগীয় সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী। ফোন করলেন আমাকে। সোজাসুজি জানালেন, যদি লিখতে পারেন- তাহলে সেই ছোট্ট রিপোর্টটি হবে মেলার ‘প্রধান ফিচার’। না লিখতে পারলে ডেস্কের ঝুড়িতে...!’ আমি বিচলিত, তবু দ্রুত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করি। জোছনা রাতের আড্ডার ছবি তুলি। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার নাগরিকদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে লেখা দাঁড় করি। এক হাজার ৫০০ শব্দের সেই লেখা। সঞ্জীব চৌধুরী পড়ে বললেন- ‘হবে’।
মেলা প্রকাশের আগের দিনে মূল পাতায় কী কী থাকছে, তার একটা বর্ণনা থাকত। কিন্তু ১৫ ফেব্র“য়ারি এ রকম কোনো ঘোষণা না থাকায় আমি ভাবলাম, এ সংখ্যায় বোধ হয় ছাপা হচ্ছে না। ১৬ ফেব্র“য়ারি সোমবার সকালে ঘুম ভাঙল টেলিফোনের পর টেলিফোনে। শহরজুড়ে যারপরনাই কৌতূহল একটি লেখাকে ঘিরে। ‘আকাশ ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে...।’
‘হাছন রাজার দেশে চাঁদ ওঠে। সেই কবেকার প্রাচীন গোল চাঁদ জোছনা হয়ে ঝড়ে। হাছন রাজাও ভিজেছিলেন এই জোছনায়। চন্দ্রমুগ্ধ কণ্ঠে তার সুর জেগেছিলেন- নিশা লাগিল রে। নিশা আজো লাগে। প্রতি পূর্ণিমার রাতে নিভে যায় সুনামগঞ্জ পৌরসভার সব বাতি। চাঁদের আলোয় চন্দ্রগ্রস্ত হয়ে পড়েন সুনামগঞ্জবাসী।’ সঞ্জীব চৌধুরী আমার লেখার অঙ্গসজ্জা করতে গিয়ে দু কলম নিজেও লিখেছিলেন। পড়ে আমি বলেছিলাম, ‘দাদা দারন হয়েছে।’ জবাবে তিনি রস করে বলেছিলেন, ‘হবে না কেন, আমার বাড়ি হবিগঞ্জ না!’
তারপর? তার আর পর নেই! পরের গল্প তো সবার চোখের সামনে। সুনামগঞ্জ শহরকে নিয়ে ‘জোছনাবাদ’ এবং একজন পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল মউজদীনকে নিয়ে ‘জোছনাবাদী কবি’র উপাখ্যান ঘটে। আর আমি উপলব্ধী করি একটি ফিচার কিভাবে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমার এক দশকের সাংবাদিকতাজীবনে অনেক বিষয়বস্তু নিয়ে লিখেছি। কিন্তু এ লেখাকে আমি ছাড়িয়ে যেতে পারিনি।
লেখার নায়ক মমিনুল মউজদীন আর নেপথ্যের মহানায়ক সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে পরে যতবার দেখা হয়েছে তাঁরাও অকপটে স্বীকার করেছেন এ বিষয়টি।
ঘটনাবহুল জীবনে একটি লেখার নায়ক-মহানায়ক, দুজনই না ফেরার দেশের বাসিন্দা হলেন প্রায় একই সঙ্গে। একটি শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেকটি শোক। সঙ্গে ছিল ‘সিডর’। জোড়া শোকে কতটা বিমূঢ় হতে হয়, তাঁরা কবিতায় বা গানে গানে বলে যেতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা বলে যাননি। না মউজদীন ভাই, না সঞ্জীবদা!

৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×