সদকাতুল ফিতর বা ফেতরা ইসলামের একটি আর্থিক ইবাদত। ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদ জাকাত যেমন আর্থিক ইবাদত, ফেতরাও তেমনি। জাকাতের জন্য ফরজ হওয়ার নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া এবং সে অবস্থায় একটি বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত, ফেতরার জন্য তেমন শর্ত নেই। কেবল ঈদুল ফিতরের দিনের সকালে যিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন বা মালিক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা যার বিদ্যমান থাকে, ফেতরা দেয়া তার ওপরই ওয়াজিব। এ থেকেই বোঝা যায়, ফেতরার অন্যতম একটি তাত্পর্য বা দর্শন হচ্ছে ঈদের আনন্দে অভাবী-দুঃখী মানুষদের শরিক করা। দীর্ঘ একটি মাসের সংযম শেষে যে আনন্দ বা পুরস্কার প্রাপ্তির দিনকে ঈদের দিন হিসেবে ইসলামে ঘোষণা করা হয়েছে তার বাহ্যিক ও অনুমোদিত আনন্দ-আয়োজনে ধনী-গরিব সবাইকে শরিক করার এক তাত্পর্যপূর্ণ বিধান হচ্ছে ফেতরা প্রদান।
এক হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ফেতরা দিয়ে একদিনের জন্য হলেও গরিব মানুষদের অসহায়ত্ব ও প্রার্থী হওয়ার মতো দুরবস্থা দূর করতে মুসলমানদের উত্সাহিত করা হয়েছে ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সচ্ছল রোজাদারদের সে জন্যই ফেতরার জন্য বর্ণিত পাঁচ প্রকার খাদ্য-খেজুর, পনির, যব, কিশমিশ, গমের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ উত্তম ও মূল্যবান জিনিস বা তার মূল্য দান করার চেষ্টা করা উচিত। তবে সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী (যাদের ওপর ফেতরা দেয়া ওয়াজিব) সর্বনিম্ন হার নির্দিষ্ট পরিমাণ গমের মূল্য ধরেও ফেতরা দিতে পারেন। এদেশে এই হারটির কথাই প্রচারিত হয়। এই হারটিকে ফেতরার একমাত্র হার মনে করা ঠিক নয়, বরং এটি হচ্ছে ফেতরার সর্বনিম্ন হার। এজন্য অধিকতর সচ্ছল ও বিত্তবান শ্রেণীর জন্য অন্যান্য উঁচু হারের যে কোনো একটি অনুযায়ী ফেতরা দেয়া শ্রেয়।
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ফেতরার আরেকটি গূঢ় তাত্পর্য হচ্ছে, রোজাদারদের এক মাসের রোজায় মান ও পূর্ণতাগত যেসব বিচ্যুতি ও ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দান। যেসব ত্রুটির কারণে রোজা ভেঙে যায় ফেতরা দিয়ে সেসবের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু রোজা না ভাঙলেও রোজার মান ও পূর্ণতায় ছেদ ঘটে এবং রোজার ঘোষিত পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, গরিব-দুঃখীকে ফেতরা দেয়ার মাধ্যমে সে অপূর্ণাঙ্গতা ও বঞ্চনা থেকে বাঁচার পথ উন্মোচিত হয়। প্রত্যেক রোজাদারই যেহেতু মানুষ, তাই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় রমজানের পূর্ণ পবিত্রতা ও মান রক্ষা করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। ফেতরা প্রদানের মাধ্যমে সে অক্ষমতা ও ব্যর্থতা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার এই সুযোগ আমাদের দেয়া হয়েছে।
সংযম সাধনার মাস রমজানের সঙ্গে, রমজান পরবর্তী ঈদের সঙ্গে জড়িয়ে দেয়া মহান আর্থিক এই ইবাদতের মধ্যে আনন্দের সর্বজনীনতা দান, সহমর্মিতা প্রকাশ ও নিজেদের রোজার অপূর্ণাঙ্গতা ঘটিত ক্ষতিপূরণের সুন্দর অবকাশ বিদ্যমান। বাহ্যিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নিষ্ঠা ও আত্মিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তাই সবার উচিত ফেতরা প্রদানে কোনো গড়িমসি না করা এবং একই সঙ্গে ফেতরা দানে সক্ষম প্রত্যেককে ফেতরা দিতে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বটি পালন করা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


