মূলত: কোচিং সেন্টার-এর শাব্দিক অর্থের বিচার বিশ্লেষণ না করেই, আমরা কোচিং সেন্টার-এর বিরোধিতায় মগ্ন- বাংগালির স্বভাব, কিছু করার নেই। দুটো কথা অনস্বীকার্য-- কোচিং সেন্টার ভাল ও মন্দ দুটি গুনের অধিকারী এবং এটি অবশ্যই একটি ব্যবসা, এ কথাটিও ভুললে চলবে না, যেমন ভুললে চলবে না যে স্কুল, কলেজ, এন.জি.ও. ইত্যাদি মহৎ উদ্দোগ-ও মূলত: এক প্রকার ব্যাবসা। তবে ব্যাবসা করার সুযোগ যদি কেউ কাউকে করে দেয় তাহলে ব্যাবসায়ীর দোষ কেন? এখন কোচিং সেন্টার-এর বিরোধিতার হারটি নির্ভর করে, ব্যাবসা করেও কোন কোচিং সেন্টার কতটা ভালো সার্ভিস দেয় তার উপর। কোচিং সেন্টার-এর সমালোচনার হারও নির্ভর করে এর রেজাল্ট এবং কত কোয়ালিটিপূর্ণ সার্ভিস সেই কোচিং দিতে পারছে তার উপর । এবার আমি ক্লাসিফাইড গ্রুপে ভাগ করে বিভিন্ন প্রকার কোচিং সেন্টার-এর একটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি:
1. 1ম শ্রেণীর স্কুল ভর্তি কোচিং: প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সিট দেশের কোয়ালিটি সম্পন্ন স্কুল গুলোতে, তাই কোচিং ছাড়া নেই গতি। কয়েক হাজার কোচিং আছে দেশে এই লেভেলের জন্য। তবে সত্যিকারের ছবি একটু ভিন্ন - অন্য স্কুলে 2য়/3য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়ে এনে অভিভাবকরা কোয়ালিটি সম্পন্ন স্কুল গুলোতে তাদের ইঁচরে পাকা সন্তানদেরকে ভর্তি করান। তারপরও কোচিং লাগে। তবে অধিকাংশ বাচ্চা ভর্তি পরীক্ষায় না টিকলে দোষ কিন্তু ঐ কোচিং-এর!! প্রয়োজনের তুলনায় প্রতুল সিট থাকলে এই লেভেলের কোচিং দেশে আপনিই বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।
2. 5ম ও 8ম শ্রেণীর বৃত্তি কোচিং: সবাই বৃত্তি পেতে চায়, আর তাই কোচিং, যদিও বৃত্তি পায় নির্দিষ্ট মেধাবী কিছু শিক্ষার্থী, কারণ কোটা কম! তবে বৃত্তি না পাওয়ার দোষ "ব্যাবসায়ী কোচিং সেন্টার-এর"!!
3. নবম থেকে দ্বাদশ ( এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি) কোচিং: এটি বড় ভয়াবহ সেক্টর! জি.পি.এ. 5 পাবার মরণ নেশায় মত্ত এই লেভেলের শিক্ষার্থীরা। কিছু শেখার দরকার নেই, চতুর্থ বিষয় যোগ করে জি.পি.এ. 5 প্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে সরকার দেখিয়ে দিতে চায় তার ক্ষমতার আমলে পাশের হার কত বেশি!! কোচিং ছাড়া জি.পি.এ. 5? সে তো স্বপ্ন! স্কুল শিক্ষকের কাছে না কোচিং করলে প্র্যাকটিকালে পুরো নম্বর মিলবে না, পড়ো আর না পড়ো স্কুল শিক্ষকের বাসায় একমাস চেহারা দেখালেই 25 এ 25!! তা ছাড়া অবজেকটিভ পরীক্ষা, মডেল টেষ্ট, ক্র্যাশ প্রোগাম ইত্যাদি খুলে বসে আছে হাজারো কোচিং সেন্টার। আর আছে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী বিভিন্ন "স্যার ও ম্যাডাম"। ব্যাবসার সাথে সাথে কিছু হলেও মহৎ উদ্দেশ্য আছে। যত বেশি জি.পি.এ. 5 ততই ভবিষ্যত ব্যাবসার হার উজ্জল। শিক্ষা ব্যাবস্থা অন্যরকম হলে আর স্কুল কলেজের পড়ার মান সঠিক থাকলে এই কোচিং সেন্টার গুলোর দাপট আপনিই কিছু হলেও কমতো।
4. "ও লেভেল" এবং "এ লেভেল" কোচিং: বিদেশী শিক্ষা ব্যাবস্থা হয়েও রক্ষা পায়নি এ পদ্ধতির শিক্ষার্থীরা, কারণ ভুলে গেলে চলবে না এটি বাংলাদেশ!! "ও লেভেল" এবং "এ লেভেল"-এ প্রবেশ করা মাত্রই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন "একাডেমির" আশ্রয় নেয়, আর সেই সাথে আছে স্কুল শিক্ষকের বাসায় গিয়ে এঙ্পেনসিভ প্রাইভেট পড়া যেখানে, পড়ার নামে যে কি চলে আর শুরু হয় তার রাজস্বাক্ষী হাযির করতে পারব অনেক। উদ্দেশ্য কি? একটাই। সব বিষয়ে "এ" পেলেই মুক্তি আর তারপর স্যাট 1, স্যাট 2 দিয়ে বিদেশ গমন। আর নতুবা আছে নর্থ, সাউথ, ইস্ট, ওয়েস্ট.... ওহ... ওগুলোতেও কিন্তু কোচিং লাগবে!!
5. মেডিকেল, বুয়েট, বিশ্ববিদ্যালয়, ভর্তি কোচিং: মেধার মূল্যায়ন-এর চাইতে জি.পি.এ.-এর প্রাধান্য ধ্বংস করছে মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যাবস্থা। কোচিং ছাড়া গতি নেই তাও। কোচিং-এর প্রভাব কমানোর জন্য বুয়েট, একেক বছর, একেক সময়ে ও পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিচ্ছে। লাভ কি? আছে ক্র্যাশ প্রোগাম! অল্প সময়ে যে কোন পদ্ধতির পরীক্ষার প্রস্তুতি তৈরিতে রেডি কোচিং! 2005-2006 শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় 26,000 ছাত্র-ছাত্রী, সিট সংখ্যা সরকার দিল বাড়িয়ে- 1,350 থেকে 1,900! লাভ কি? শুধু এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি-তে জি.পি.এ. 5 প্রাপ্তদের সংখ্যাই যে 5,000 যাদের অধিকাংশেরই আছে জীববিদ্যা! এদের মাত্র 20%ও যদি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় (যা অবান্তর) তবেই অন্য অনেক মেধাবীকে মেডিকেলে পড়তে আর হল না শুধু একটু কম জি.পি.এ.-এর জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির দৃশ্যপট আরও ভয়াবহ। দোষ কার? কোচিং-এর। কোচিং বেশী ফিস নেয় আবার কোচিং করে এলাও-ও হয় না, তো দোষ কার?? কোচিং-এর ই তো।
6. প্রি-মেডিকেল ও প্রি-বুয়েট কোচিং: নাম শুনে যায় চেনা কি বলিবারে চাই! আমার অনেক সিনিয়র এক ভাই, বুয়েট থেকে ইলেকট্রিকাল ইনজিনিয়ারিং-এ পাশ করে, কোন দিন কোন চাকরি করেন নাই- তার কাজ হল 1ম, 2য় ও 3য় বর্ষের ছাত্রদের পড়ানো। এখনও তার আয় মাসে 50 হাজার টাকার উধের্্ব!
7. বি.সি.এস. কোচিং: কিছু লেখার নাই কারণ, প্রতিবছর বি.সি.এস. প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে এদের জুড়ি নেই! কেউ বি.সি.এস. দেবেন আর কোচিং করবেন না এটা ভাবা মুশকিল। পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র বিক্রি হয় শুনি এসব স্থানে।
8. আই.ই.এল.টি.এস, টো-এফেল, স্পোকেন ইংলিশ, জি.আর.ই. ইত্যাদি কোচিং: আই.ই.এল.টি.এস দেয়ার আগে নিজে সত্যিই ভেবেছিলাম বেশ কয়েকবার যে, কোচিং করব কি না! 7/8 পাইয়ে দেবে এরা! পরীক্ষা কেন্দ্রে একজন শিখালো, দুপুর 12 টা বেজে গেলে স্পিকিং-এ ঢুকে বলতে হবে-"গুড আফটানুন!!!" আফটারনুন না কিন্তু! তার হাত ভরা এ যাবত কালের সব কিউ কার্ড আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল সত্যি!
আর পারছিনা!! অনেক বিষয়ের অনেক কোচিং চারিদিকে। ব্যাবসা করছে তারা করুক, কিছু সার্ভিসও দিচ্ছে। আমরা কোচিং-এর নেগেটিভ দিক নিয়ে চিন্তা করে করে শুধুই হতাশ, তবে কেউই নেই না গোড়ায় কোন পদক্ষেপ যা ঘটাতে পারে কোচিং সেন্টার-কে বন্ধ করার সত্যিকারের গোড়াপত্তন। কিছুদিন আগে যে একমুখী শিক্ষা চালুর কথা হয়েছিল তা নাকি কোচিং সেন্টার বন্ধ করার ডাক দিয়েছিল!! শিক্ষকদের হাতে নম্বর-এর একটা ভাগ তুলে দিয়ে ইনকামট্যাঙ্বিহীণ প্রাইভেট পড়ার ডাক যে কোচিং সেন্টার-এর-ই ছদ্ম রূপ তা কে বোঝাবে এই দেশের সরকারকে?
কোচিং সেন্টার-এর এক অবিচ্ছেদ্য চক্রে জড়িয়ে গেছি আমরা। এর হাত থেকে কি করে, কবে যে বেরিয়ে আসতে পারব আমরা, তা বলা এই মূহুর্তে অসম্ভব। সাইট ভিসিটরদের মূল্যবান ও সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

