আনন্দানুষ্ঠান সামাজিক মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজ হইতে কয়েক দশক পূর্বে, যখন বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবার আপন বসতবাটিতে বাস করিতেন, তখন অনুষ্ঠানগুলিও বাড়িতেই হইত। সময় বদলাইয়াছে, বাজারের তাগিদেই ফ্ল্যাটবাড়িগুলো ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বাসস্থানে পরিণত হইয়াছে। ইহার একটি অনিবার্য ফর, নিজস্ব বাসস্থানে আর আনন্দানুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানসঙ্কুলান হইতেছে না। সেই সমস্যার সমাধানও বাজারই করিয়াছে। প্রায় প্রত্যেক লোকালয়েই অনুষ্ঠানের ভাড়াবাড়ি গড়িয়া ওঠিয়াছে কিন' এই সমাধানের সংলগ্ন একটি সমস্যা আছে, যাহার সমধান বাজার করিতে পারে নাই।
আনন্দানুষ্ঠানের সহিত শব্দ, আবর্জনা, যানবাহনের আধিক্য ইত্যাদি সমস্যা প্রায় অঙ্গাঙ্গি হইয়া থাকে, এবং সেই সমস্যাগুলি অনুষ্ঠানের পরিসীমা ছাড়াইয়া প্রতিবেশের অধিবাসীদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। পূর্বে, যখন আপন প্রতিবেশীর গৃহে অনুষ্ঠান হইত, তখন প্রতিবেশীরা সাধারণত অসুবিধাটুকু মানিয়া লইতেন। তাহার কারণ দুইটি: এক, প্রতিবেশিকে আপন ভাবা, দুই, অনুষ্ঠানগুলি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল না কিন' বাড়াবাড়িতে এই দুইটি কারণই অনুপস্থিত। ফলে, অনষ্ঠানের নিত্য অশান্তিতে প্রতিবেশীদের জীবন অতিষ্ঠ হইয়া উঠা স্বাভাবিক। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ্নি জারি করিয়াছে, ভাড়া অনুষ্ঠান বাড়িতে মাইক চালানো নিষিদ্ধ, গভীর রাত্রে অন্য কোনোও প্রকার শব্দ করাও চলিবে না।
আইনটি নিঃসন্দেহে স্বাগত। বাজার যেখানে স্থানীয় মানুষদের স্বার্থ দেখিতে ব্যর্থ হয়, সেখানে আইনগত বাধ্যবাধকতা ভিন্ন উপায় নাই কিন' এই আইন জারি করিবার ঘটনাটি দুঃখজনক, কারণ ইহা স্পষ্টতই সভ্যসমাজের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।
এই সমাজ আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করিতে পারে, কিন' তাহার ফলে অন্যদের অসুবিধার সুরাহা করিতে পারে না, ইহা লজ্জাজনক কিন' বাস্তব। ইহা অনস্বীকার্য যে আনন্দে মাতিয়া, প্রবল কোলাহল করিয়া, গভীর রাত্রি পর্যন্ত উচ্চগ্রামে মাইক বাজাইয়া আপনার অনুষ্ঠান উপভোগ করা হয় বটে কিন' নিকটবর্তী বাসিন্দার নিকট তাহা অত্যাচারমাত্র, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাঁচিবার অধিকারবিরোধী।
সমাজেরই উচিত, এই সমস্যার সমাধান করা। সমাধানের কয়েকটি পন্থা রহিয়াছে। প্রথমত, যদি প্রত্যেক আপন অনুষ্ঠানে মাতিবর সময় প্রতিবেশীর স্বাচ্ছন্দ্যের কথাটি স্মরণে রাখেন, তাহা হইলে সমস্যাটি প্রভূত হ্রাস পাইবে। দ্বিতীয় পন্থাটি কিঞ্চিৎ জটিল কিন' বাস্তবোচিত। একটি বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানগৃহ স্থাপন করিতে এখনও পর্যন্ত পুরসভার অনুমতি লওয়াই যথেষ্ট। নিয়ম হওয়া উচিত, যে পলি্লতে অনুষ্ঠানগৃহটি গড়িবার প্রস্তাব আসিয়াছে, সেই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দার মতামত যাচাই করিয়া লওয়া। নির্দিষ্ট যে স্থানে অনুষ্ঠানগৃহটি অবস্থিত, তাহার নিকটতম বাসিন্দাদের মতামতকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। ইহার ফলে অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সমস্যা হয়তো কমিবে না কিন' আপনার শান্তি বিঘি্নত হইতে দিবেন কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় মানুষের মতামতটি গুরুত্ব পাইবে।
আরও একটি কথা: বর্তমান আইনটির ফলে হয়তো উচ্চগ্রামে মাইকের শব্দ প্রতিরোধ করা যাইবে, কিন' নিত্য উল্লাসের অত্যাচার হইতে, অতিথি-অভ্যাগতদের গাড়ির ভিড় হইতে স্থানীয় মানুষদের বাঁচাইবে কে? যাহাদের স্বার্থে আইন, আইন প্রণনয় করিবার সময় তাহাদের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সহিত ভাবিতে হইবে। তখনই আইনটি সার্থক হয়।
আনন্দবাজার 19 মার্চ 06
Source: Internet Newspaper
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




