somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দু'টি কথা: সেন্ট মার্টিন যাবেন ?

১৭ ই মে, ২০১১ দুপুর ১২:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :






জুলাই মাস। টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, রংপুর। এখানে আমাদের বি.এড. ট্রেনিং। ট্রেনিং শিক্ষাবর্ষের গোড়ার দিককার কথা। অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী ম্যাডাম জনাব কানিজ মোর্শেদ। সহ পাঠ্যক্রমিকের অংশ হিসেবে ঘোষনা দিয়ে দিলেন- আমরা বিজ্ঞান বিভাগের প্রশিক্ষণার্থীরা শিক্ষা সফরে যাব। সে মোতাবেক সেশনের শুরু থেকেই তিনি জোর তাগিদও দিয়ে আসছিলেন।

নানা জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে অবশেষে আমাদের সামনে উপস্থিত হলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। ৩ জন স্যার-ম্যাডাম। আমরা ১৭ জন প্রশিক্ষণার্থী। মোট ২০ জনের একটি দল রংপুর থেকে সোজা রওনা হলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।

দক্ষিণাঞ্চলের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা আর কক্সবাজার কাউকে টানেনা এমন লোক পাওয়া ভার। আমিও তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম নই। তবে বরাবরের মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সেন্টমার্টিনের প্রতি আমার আগ্রহটা একটু অন্যরকম। এখানকার জনবসতি, মানুষের পেশা, জীবনাচরণ আমাদের মতো অতটা সহজ নয়-খুবই কঠিন। কিন্তু আমরা যারা দু’এক দিনের জন্য এখানে বেড়াতে যাই তারা এসব দেখে পুলকিত হই, আনন্দিত হই।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিনে অবস্থিত এই সেন্টমার্টিন দ্বীপ এর অদূরেই রয়েছে আরোও কয়েকটি দ্বীপ। সেন্টমার্টিনের আয়তন প্রায় ৫৯০ হেক্টর। দ্বীপটি উত্তর-দক্ষিনে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। টেকনাফ উপজেলার বদর মোকাম হতে ১০ কিঃ মিঃ দক্ষিন-পশ্চিমে অবস্থিত অপরূপ এই সৌন্দর্য্যমন্ডিত দ্বীপটি। দ্বীপটি উত্তর দক্ষিণে লম্বা এবং অনেকটা ডাম্বেল আকৃতির। এর প্রধান দুটি অংশ হলো উত্তর পাড়া ও দক্ষিন পাড়া। মাঝখানে সংকীর্ণ অংশটির নাম হলো গলাচিপা। ভূ-তাত্ত্বিক বিবেচনায় সেন্টমার্টিন দ্বীপটি পলল গঠিত মহাদেশীয় একটি দ্বীপ। মূলতঃ এই দ্বীপটি বিভিন্ন ধরনের শিলার উপর বহুদিন ধরে বালি, সমুদ্রিক শামুক, ঝিনুকের চূর্ণ জমা হয়ে গঠিত হয়েছে। এরও সর্ব দক্ষিণে রয়েছে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ, যা জোয়ারের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনটি ছোট দ্বীপের রূপ ধারণ করে। দ্বীপের উত্তর পূর্বাংশ ব্যতীত প্রায় সম্পূর্ণ তীরবর্তী অঞ্চলই পাথরময়। স্থানীয়ভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপ “নারিকেল জিনজিরা” নামে পরিচিত।

ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে এই দ্বীপে বসতি স্থাপিত হয়। বর্তমানে এই দ্বীপের স্থায়ী জনবসতি প্রায় ছয় হাজার। দ্বীপের বেশির ভাগ মানুষের পেশা মাছ ধরা ও মাছ শুকানো, কিছু মানুষ কৃষিকাজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথেও জড়িত। অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বিচিত্র ধরণের প্রবাল সহ নানা প্রজাতির জীবজন্তু দ্বীপটিকে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এই দ্বীপে ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল ও ১৫৭ প্রজাতির স্থলজ গুপ্তজীবি উদ্ভিদ রয়েছে। এখানে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক ও ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। ৪ প্রজাতির উভয়চর ও ২৯ প্রজাতির যাযাবর পাখি সহ মোট ১২০ প্রজাতির পাখি এবং ৪ প্রজাতির সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ মোট ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি চোখে পড়ে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র স্থান যেখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সামুদ্রিক প্রবাল জন্মে। দ্বীপের জোয়ার ভাটা অঞ্চলে নিম্নবর্তী পাথরময় অঞ্চল হতে সাগরের তলদেশের বেশ কিছুদূর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির প্রবাল জন্মে। সমুদ্রে বসবাসকারী এক ধরণের অতি ক্ষুদ্র প্রাণীর দেহের দেহাবশেষই হচ্ছে এই প্রবাল। এগুলো জমাট বাঁধার পর পাথরে রূপ নেয়। প্রবাল নানা ধরনের নানা রঙের হয়ে থাকে।

অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে স্পঞ্জ, পাথুরে কাঁকড়া, সন্যাসী কাঁকড়া, লবস্টার, ঝিনুক, সমুদ্র শশা, শড়খ শামুক ইত্যাদি সেন্টমার্টিন দ্বীপে পাওয়া যায়। এছাড়া দ্বীপ সংলগ্ন সাগরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রজাপতি মাছ, বোল মাছ, রাঙ্গা কৈ, ত সুঁই মাছ, লাল মাছ, নাক-কোরাল, উডুক্কু মাছ, সজারু মাছ, এ্যন্জেল ফিস, প্যারোট ফিস, সারজন ফিস, রাস মাছ, বিশেষ ধরনের বাইম মাছ ইত্যাদির উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক একটা বাইম মাছের দৈর্ঘ্য দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সেন্টমার্টিনের পার্শ্ববর্তী সমুদ্র এলাকায় বিচরণ করে ২ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী- পরপইস ও হ্যাম্পব্যাক ডলফিন। আপনার যাতায়াতের সময় ডলফিনগুলো আপনার চোখে পড়েও যেতে পারে। দ্বীপের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে- কেয়া, শেওড়া, ছাগল লতা, ক্ষুদ্রাকৃতির বিরল প্রজাতির পেঁয়াজ। দ্বীপের দক্ষিণ দিকে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল প্যারাবনের কিছু অংশ এখনোও অবশিষ্ট রয়েছে। এখানে আমরা ঘুরতে ঘুরতেই দেখা পেয়ে গেলাম স্টার ফিস আর জেলী ফিস এর।

উদ্ভিদ, প্রাণী এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদান সমূহের মধ্যেকার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নিয়েই গঠিত হয় কোন স্থানের প্ররিবেশ ব্যবস্থা। কিন্তু মানুষের অপরিকল্পিত কার্যকলাপের কারণে দেশজুড়ে পরিবেশ ব্যবস্থা দিন দিন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ আমাদের দেশের পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এই পর্যটন কেন্দ্রটিকে রক্ষা করতে ও আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হলে সরকারী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও কিছু করনীয় রয়েছে, যা আমাদের দেশীয় রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে সেই সাথে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে আমাদের দেশের।

আমাদের এই পর্যটন কেন্দ্রটিতে থাকা উচিত পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলে পরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা করা উচিত। স্থানীয় জনগণের কাছে জানা যায় রাতের বেলা সৈকতে সংশ্লিষ্ট হোটেল-মোটেল ও দোকানের অতিরিক্ত আলো এবং পর্যটকদের জ্বালানো আগুনের জন্য সামুদ্রিক কাছিমের আগমন দিন দিন কমে যাচ্ছে। যা সামুদ্রিক কাছিমের বংশ বৃদ্ধিতে বাধার সৃষ্টি করছে। সামুদ্রিক কাছিম ও পরিয়ারী পাখিদের আবাসস্থলে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, দ্বীপটির আশেপাশের কেয়াবন ধ্বংশ করে অবৈধ হোটেল-মোটেল, তৈরী করা, প্রশাসনের চোখে ধূলি দিয়ে সামুদ্রিক প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, কেয়াফুল, ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়, দ্বীপে মৎস আহরণের জন্য অবৈধ জাল ব্যবহার করা, নৌকা ও জাহাজের তেল ফেলে সমুদ্রের পানি দূষণ করা, নৌকার নোঙর ফেলে প্রবাল ধ্বংশ করা, প্রবাল ও শৈবালযুক্ত পাথরের উপর হাঁটাচলা করা, যেখানে সেখানে কাঁটা তারের বেড়ার উপস্থিতিতে জীবজন্তুর গমনাগমনে প্রতিন্ধকতা সৃষ্টি করা দ্বীপটির সৌন্দর্য্যকে ম্লান করে দেয় এবং জীব-বৈচিত্র ধ্বংশ করে দেয়। এই বিষয়ে সচেতন থেকে দেশের সরকার ও আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রাকৃতিক বন, প্রবাল-শামুক-ঝিনুক আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, বণ্যপ্রাণী শিকার বা হত্যা করা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট করা এবং মাটি ও পানির গুণাগুণ নষ্ট করতে পারে এমন যে কোন কাজ সরকারীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসকল বিধিনিষেধ ও বিধিবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রমাগতভাবে উক্ত দ্বীপসহ দেশের অন্যান্য জীব-বৈচিত্রময় এলাকায় প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক লীলা ভূমি ও পরিবেশ ধ্বংস করছে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী লোক যা বা যারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। উল্লেখিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় আইনটি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারলে রক্ষা পাবে আমাদের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সহ অন্যান্য পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ও আমাদের দেশ-বাংলাদেশ।


Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১২ দুপুর ১:০৭
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। বিদায় পঙ্কজ উদাস

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:১৩



চান্দী জ্যায়সা রঙ্গ হ্যায় তেরা
সোনে জ্যায়সে বাল
এক তূ হী ধনবান হ্যায় গোরী
বাকী সব কাঙ্গাল


৭০ দশকের শেষে পঙ্কজ উদাসের এই গান শুনতে শুনতে হাতুড়ি বাটালের মূর্ছনা এক অদ্ভুত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্যালেষ্টাইনিয়ান অথরিটির ক্যাবিনেট পদত্যাগ করেছে।

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৮:০৬



মনে হয়, আমেরিকা চাপ দিচ্ছে প্যালেষ্টাইনিয়ান অথরিটির নতুন ক্যাবিনেট গঠন করতে। আমেরিকা কি করার চেষ্টা করছে, তা পরিস্কার নয়; পুরো ফিলিস্তিনে কেহ এখন আর প্যালেষ্টাইনিয়ান অথরিটিকে বিশ্বাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

কার্ড

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৯:১৫


তার সাথে আমার যখন দেখা হয়েছিল, তখনও এই শহরে মেট্রোরেল আসে নি। লোকাল বাসে করে যাতায়াত করি মিরপুর-মতিঝিল-মিরপুর। ক্লান্তিকর। সেদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও সরাসরি মতিঝিলের বাস পাই নি ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সহজ ভাষায় লিখলে হয় সস্তা-দরের লেখক!

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:২৭


ওপার বাংলার কথাশিল্পী সমরেশ মজুমজারের সাথে হুমায়ূন আহমেদের বেশ খাতির ছিল।তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ও শরতচন্দ্রের পরে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ‘হুমায়ূন আহমেদ’।
তবে আমার মত ভিন্ন; আমি মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনতার উচিৎ মেয়েটির কাছে ক্ষমা চাওয়া

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:৪৭



কিছু হলেই অনুভূতিতে আঘাত, পান থেকে চুন খসলেই ধর্ম গেলো গেলো; মেরে ফেলো, কেটে ফেলো, পুতে ফেলো এসবই হচ্ছে ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর মনোভাব। সময় এসেছে এসব সেন্টিমেন্টাল জনগোষ্ঠীর অনুভূতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×