অন্ততঃ ৪ পদের ঝিঁঝিঁ পোকা, আর ৪ থেকে ৫ ধরনের রাতপাখি... কোনটা ডেকে উঠছে হঠাৎ করে, আবার কোনটা নির্দিষ্ট বিরতিতে। আর আছে কিছু তক্ষক, বাতের রুগীর মতো কঁকিয়ে উঠছে থেকে থেকেই। এমন ফাজিল মার্কা একটা আওয়াজ, সুকুমার রায়ের বেচারাথেরিয়াম যেন, শুনলে হাসি পেয়ে যায়। সব কিছুর উপরে আছে একটা হুতুম, নিস্তব্ধ রাতের অশরীরী এই ঐক্যতানে তার পদ বুঝি হাতে সাদা কাঠি নিয়ে ব্যান্ড-কনডাকটরের...!! সবার যাবতীয় সুর চাপা দিয়ে শোনা যাচ্ছে তারগাম্ভীর্যময় ডাক — হুত্তুম... হুত্তুম...
রাতের অন্ধকার যত ঘন হয়ে নামে, অলীক নৈশঃব্দের কালো চাদরে ঢাকা বহিরাঙ্গনে বিভিন্ন মাত্রার আওয়াজ এক অপার্থিব আয়োজন সম্পন্ন করতে থাকে। রাতের অন্ধকারে যে এত প্রানী সজাগ আর সক্রিয় থাকে, বান্দরবান না এলে সে কথা আর কে জানতো...? এতো এতো রাতপাখি... কে জানে কোনটার নাম কি...? দিনের আলোয় কি নিয়ে ব্যাস্ত থাকে এই সব প্রাণীকুল?
ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো ডাকছে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির মেগাহার্টজএ, বিভিন্ন ওয়েভ লেন্থএ। কয়েক পদের ঝিঁঝিঁ পোকার অস্তিত্বের কথা টের পাওয়া যায়, শুধু বিরতি নেওয়ার জন্য থামলে। তা না হলে এক সময় বিবশ হয়ে আসে কান, আলাদা কোন শব্দের উপস্থিতি আর ধরা পড়ে না তাদের এই একটানা আওয়াজে।
এই একটানা আওয়াজের পটভুমিতে মুল গায়কী রাতপাখীদের। রাতের এই সেরা কন্ঠের প্রতি্যোগীতার আসরে এসে রেওয়াজের ঢংএ গেয়ে যাচ্ছে দু’ একটা কলি — টিট্রিভ ... টিট্রিভ... অথবা কুবো কুব কুব... কুবো কুব কুব... কিংবা তীক্ষ্ণ চিঈরাপ চিঈরাপ...। আলাদা ভাবে আর একটা পাখিকে বেশ চেনা যায়। ডাল থেকে ডালে উড়ে যাওয়ার পাখা ঝাঁপটানোর শব্দ, আর সেই সাথে — খ্যাক্কোড়... খ্যাক্কোড়... ডাক। ভালোমতন বোঝা যায় না আজকের আসরে তার ভুমিকা উৎফুল্ল শ্রোতা, নাকি নাড়া বাঁধতে হয় যার কাছে, সেই ওস্তাদের!! তার ডাক কি আহা উহু, কি শুনিলাম ধরনের উচ্ছাসের...? নাকি কি হচ্ছেটা কি মার্কা গুরুমশায়ের...? কে জানে...
কক্সবাজারের পাট চুকিয়ে, আজ বিকালের সুর্য ডোবার মুখে বান্দরবান এসে পৌঁছেছি। আগেই জেনে এসেছি বান্দরবান ম্যালেরিয়া প্রবন এলাকা। কাজেই মশা থেকে সাবধান, কামড়ানোর সুযোগই দেওয়া যাবে না। রাতে বিছানায় শোওয়ার আগে মশারীর চারপাশ ভাল ভাবে গুঁজে নিতে হবে। সারাদিনের সফরে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছি... নিস্তব্দ হয়ে আসা চরাচর মেতে উঠল বিচিত্র সব আওয়াজে। আমরা বান্দরবান এসেছি — সাঙ্গু নদীর উপত্যকা আর তাজিংডং পর্বতের টানে, গভীর খাদের পাশ দিয়ে চুলের কাঁটার মতো বাঁক খাওয়া রাস্তা দিয়ে ঘুরতে, আর পাহাড়ের চূঁড়ায় উঠে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যেতে... কিন্তু সে সব দেখার আগেই পরিচয় হলো বান্দরবানের রাতের বাসিন্দাদের সাথে। পেঁচা, তক্ষক, ঝিঁঝিঁ পোকা, আর রাতপাখিদের সাথে। এই এলাকা যথেষ্ট শান্তিপুর্ণ এবং কোন ধরনের বিপদের আশঙ্কা নাই — এই ধরনের একটা নোটিশ বোর্ড কর্তৃপক্ষ সব কটেজের দেয়ালেই একটা করে এঁটে রেখেছেন, সেটার কথা ভাবতে ভাবতেই খাঁটি ঈমানদারের মতো কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর আস্থা নিয়ে তলিয়ে গেলাম গভীর ঘুমে।
রাতে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম — বিশাল ডানাওয়ালা প্রাগৈতিহাসিক এক পাখি, আমাকে পিঠে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে সবুজ উপত্যকার দিকে... নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে, অবিকল বিমান থেকে জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যাবলী। পাখিটা উঠছে উপরের দিকে, আর পেছনের দিকে আমি পিছলে যেতে থাকি ক্রমশঃ...
ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার মতো মেঘ এসে আমাদের ঢেকে দিয়ে যাচ্ছিল...
With us, you are never a stranger…
বান্দরবান শহর থেকে আড়াই মাইল দূরে মিলনছড়ি, জায়গাটা চিম্বুক রোডের ওপর। গাইড ট্যুরস লিমিটেড এর রেষ্ট হাউস হিলসাইড রিসোর্ট এই মিলনছড়িতেই, এখানেই আমাদের থাকার জন্য বুকিং দেওয়া আছে। উঁচু নীচু অসমান বিশাল একটা চত্বর জুড়ে এই পুরো রিসোর্টটা। মাটির পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে কাটা সিড়ি, সেটা দিয়ে কখনো নিচে নামতে হয়, কখনো উপরে উঠতে হয় (হাঁপাতে হাঁপাতে)। কোন কোন কটেজ আমাদের মাথার উপরে, কোন কোনটি আবার পায়ের নীচে। এখানে কটেজের নামগুলো বেশ সুন্দর... ময়না , মারমা...। কিছু কটেজ তৈরি হয়েছে স্থানীয় উপজাতিদের ঘরের আদলে। পাহাড়ের ঢালে বাঁশের খুটি, তার উপরে তার উপরে দাড়িয়ে থাকে পুরো কটেজটা... এক হিসাবে ভীষন অশ্লীল। ঢালের নিচে দাঁড়ালে দেখা যায় ঘরের মেঝের নীচটা। যেন স্কার্টের তলায় উঁকি মেরে দেখছি!! অছলীল অছলীল...!
অছলীল অছলীল...!
মেঝেতে বাঁশের চাটাই ( আমার কাছে তেমন আরামদায়ক মনে হয় নাই অবশ্য, জোরে হাঁটলে পা দেবে যায়, মেঝে দুলে উঠে আর বিশ্রী ক্যাঁচড় ম্যাচড় আওয়াজ হয়) দেয়াল থেকে শুরু করে বারান্দার রেলিং পর্যন্ত সবই বাঁশের। মাথার উপর পাতার ছাউনি। ইদানিংকার কটেজগুলো ইট সিমেন্টের পাকা দালান। যদিও ঘরের শিলিং আর দেয়ালগুলো শীতল পাটি দিয়ে মোড়া। কিন্ত সবচেয়ে আকর্ষনীয় ব্যাপার হলো বাথরুমগুলো, আধুনিক ফিটিংস দিয়ে মোড়া, পাকা দালানের কটেজগুলোতে গরম পানির জন্য রয়েছে গীজার।
আমাদের কটেজটা( ময়না-১) পাকা দালানের এক তলা, অথচ পেছনের বারান্দাটা পুরোটাই ব্যালকনির মতো ঝুলছে মহাশুন্যে, কারন বারান্দার নিচ থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে ঢাল — নেমে গিয়েছে কয়েক ধাপ নিচে, তারপর একসময় হারিয়ে গেছে অনেক দুরের পাহাড়ের খাদে। পুরো এলাকাটা ঘন সবুজ গাছ দিয়ে মোড়া, একমাত্র পায়ে চলার এক চিলতে পথটুকু বাদ দিলে — এক ইঞ্চি জায়গাও মিলবে না, যার উপর সবুজের আস্তরন নাই। আমাদের কটেজের চারপাশটা নিবিড় জঙ্গল, তাতে কলাগাছ থেকে শুরু করে কাঁঠাল আর পেঁপে গাছ পর্যন্ত পরিচিত সব গাছের ভীড়। আর আছে বিশাল বিশাল সব বাঁশঝাড়, থোকায় থোকায় ফুটে থাকা লাল টুকটুকে জবা ফুল । জান পেঁহেচান আছে এমন আরো গাছের মধ্যে আছে শাল, মেহগনি, গজারী, শিরীষ আর বিস্তর রেইনট্রি।
গাইড ট্যুরস এর গুলশানের অফিস থেকে আমরা আগেই কটেজের বুকিং দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু কক্সবাজার থেকে বান্দরবান যাবো কিভাবে, এটা নিয়ে কোন পরিকল্পনা করি নাই। কক্সবাজার থেকে কোন গাড়ী ভাড়া করে নেওয়াটাই সহজ সমাধান হতো, সীগাল এর ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে জানালো তারা গাড়ী যোগাড় করে দিবে, ভাড়া লাগবে ৪০০০টাকা। সেই বিকালে কক্সবাজারের বীচ মার্কেটে ঘোরার সময় এক রেন্ট এ কার কোম্পানী জানালো তাদের গাড়ীর ভাড়া পড়বে আড়াই হাজার টাকা। রাতে হোটেলে ফিরে যোগাযোগ করলাম গাইড ট্যুরসএ, তারা বান্দরবান থেকে গাড়ী পাঠাতে পারে, ভাড়া পড়বে, ৩০০০ টাকা। বান্দরবানের পাহাড়ী রাস্তায় যাওয়ার জন্য স্থানীয় ড্রাইভারই নিরাপদ, এই যুক্তিতে আমরা রাজি হয়ে গেলাম...
সে অনুযায়ী পরদিন সকাল ১০টা নাগাদ, একটা মাইক্রোবাস এসে আমাদের তুলে বান্দরবান পৌঁছে দেওয়ার কথা। ব্যাগ গুছিয়ে আমরাও রেডি হচ্ছি, বিল মিটিয়ে চেক আউট করার জন্য আমি আর ইমরান গেলাম ফ্রন্ট ডেস্কে... আর তখনই টের পেলাম নতুন এক ঝামেলার।
সমস্যা হলো হোটেল সীগালএ প্লাস্টিক মানি অচল... তারা ক্যাশ ছাড়া অন্য কিছু নেয় না। এমন কি হোটেলে কোন এটিএম বুথও নাই। হিসাব করে দেখলাম বিল মেটানোর পরে আমাদের কাছে যা ক্যাশ থাকবে তা বান্দরবানের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু কোন জরুরী প্রয়োজনের (কিংবা শপিং) কথা ভাবলে তা যথেষ্ট নয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আবার চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার। ক্যাশ মেশিন থেকে টাকা তোলার জন্য। গাড়িতে উঠে বললাম ড্রাইভারকে আমাদের পরিকল্পনার কথা, তারপর দরাদরি করে রফা করলাম নতুন ভাড়া ৫০০০ টাকায়। ফিরে চললাম আবার চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রাম কক্সবাজার রোডের (আরাকান রোড) প্রায় মাঝামাঝি কেরানীহাট, সেখান থেকে বান্দরবান যাওয়ার রাস্তা শুরু হয়েছে, দুরত্ব ২৮ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ফলে আমরা কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পৌছলাম কেরানীহাটের উপর দিয়েই — ফিরে আসবো আবার কেরানীহাট, কিন্ত তখন কক্সবাজার যাওয়ার বদলে বাঁয়ে মোড় ঘুরে নতুন রাস্তা নেব... গন্তব্য বান্দরবান।
কর্ণফুলী নদীর উপর ষ্টীল ক্যাবলের টানা দেওয়া, বেশ হাল ফ্যাশনের একটা ব্রীজ তৈরী হতে দেখলাম, নির্মাণ কাজ মনে হলো শেষ পর্যায়ে। কিন্ত তার আগে পুরানো ব্রীজের দুমাথার যান জট আমাদের অনেকটা সময় খেয়ে ফেললো। আজ চট্টগ্রামের আবহাওয়া বেশ মনোরম... বাইরে নরম রোদ, বৃষ্টির কোন চিহ্ন নাই, চারপাশে বেশ ফুরফুরে হাওয়া। বেলা গড়িয়ে সুর্য তখন মাথার উপরে... কর্ণফুলির নিস্কলুষ বাতাসে আমাদের বেশ ক্ষুধার উদ্রেক হলো। কিন্ত খাওয়ার জন্য নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নাই, অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগেই বান্দরবান পৌছানো দরকার।
চট্টগ্রামের মেয়েদের এই প্রথম খোঁজ পেলাম (নাম ভুলে গেছি) এক ফুড কোর্টে গিয়ে। সাদামাটা নিরীহ গোছের কিছু মেয়ে তাদের ছেলে বন্ধু অথবা কাজিনদের সাথে সেখানে সময় কাটাচ্ছিল। এই শহরের খাঁপ ছাড়া ধারালো তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ মেয়েরা, কোথায় বসে সময় কাটায় কে জানে...? তবে আক্ষেপ জাগলো ফুড কোর্টের খাবারের দোকানগুলোতে গিয়ে। সার বেধে একটানা সারিবদ্ধ খাবারের দোকান। তাতে খাবারের বৈচিত্র্য যথেষ্ট, ভুনা খিচুড়ি থেকে বিরিয়ানী, ফ্রায়েড রাইস থেকে চাউমিন। বার্গার থেকে হটডগ, সমুচা থেকে সিঙ্গারা... খাবারের বিশাল আয়োজন। অথচ খাবার সাজিয়ে রাখা থেকে খাবার প্যাক করে ডেলিভারি দেওয়া পর্যন্ত, এতটা অগোছালো আর অপরিপাটি, খাওয়ার রুচিটাই আর থাকে না। ডিসপ্লেতে যে খাবারগুলো রাখা হয়েছে — তার জলীয় অংশটা এমন ভাবে উবে গেছে, আইটেমগুলো হয়ে গেছে শুস্ক আর নিস্প্রান। দোকানের ভেতরে যে কর্মচারীরা কাজ করছে পদে পদে তাদের আনাড়ীপনা এবং অপেশাদারীত্ব ফুটে উঠে। তাদের অনেকের কাছেই সম্ভবতঃ ফুডকোর্টএ খাবার পরিবেশন করার চাকুরি আর কোন গুদামে কাজ করার মধ্যে আশমান-জমিন তফাৎ নাই। কোন কোন দোকানে মনে হয়েছে — মালিক দুপুরের খাওয়া বা বাজার-হাট করতে গেছে, কাউন্টারে বসিয়ে রেখে গেছে, গ্রাম থেকে আসা চাচা অথবা মামাকে... দোকানের মেনুর জন্য তার হাতড়ানো দেখলে মায়াই লাগে।
অথচ আপাত এই সাধারন মানের ফুডকোর্টের প্রত্যেকটা ধাপে উন্নতি করার এত এত সুযোগ আছে... শুনেছি চট্টগ্রাম বেশ এক্সপেন্সিভ শহর, তাহলে চট্টগ্রামবাসী তাদের এই অতিরিক্ত টাকা খরচের বিনিময়ে আরও একটু ভাল সার্ভিস তো আশা করতেই পারে। ফুড কোর্টে যিনি খাবার হ্যান্ডল করবেন, তার পরনে একটা পরিস্কার এ্যাপ্রন আর মাথায় একটা চুল ঢাকা দেওয়া টুপি, আশা করাটা কি খুব বেশি কিছু চাওয়া...? খাবারের দোকানের কর্মচারীর পোষাক নিশ্চয়ই গুদামে কাজ করা লেবারদের পোষাকের চাইতে একটু বেশি পরিস্কার থাকা উচিত...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

