somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না

০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমরা প্রায়ই বলি, অমুক এভারেস্ট জয় করেছেন, তমুক কে-টু জয় করেছেন, অমুক অন্নপূর্ণা জয় করেছেন। শব্দটি এতটাই প্রচলিত যে আমরা আর ভাবিই না—আসলে কি পাহাড়কে জয় করা যায়?

আমার মনে হয়, যায় না।

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না।

পাহাড়ের কাছে মানুষের সব পরিচয় অর্থহীন। আপনি প্রথমবারের অভিযাত্রী, নাকি বিশ্বের সেরা পর্বতারোহী—পাহাড়ের কাছে তার কোনো পার্থক্য নেই। আপনার রেকর্ড, আপনার খ্যাতি, আপনার পতাকা, আপনার সামাজিক মর্যাদা, আপনার অনুসারী—কোনোটিই তুষারধস থামাতে পারে না, ক্রেভাস বন্ধ করতে পারে না, কিংবা একটি পাথর গড়িয়ে পড়া আটকাতে পারে না।

গত ৩০ জুলাই ব্রড পিকে যে তুষারধস নামল, তা আরও একবার সেই নির্মম সত্যটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নির্মল পুর্জা—বিশ্ব যাঁকে চেনে "নিমসদাই" নামে। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে পৃথিবীর চৌদ্দটি আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি; নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র তাঁকে করে তুলেছিল বিশ্বখ্যাত। অথচ ক্যাম্প টু আর ক্যাম্প থ্রি-র মাঝামাঝি এক তুষারধস তাঁকে আর ফিরতে দিল না—তাঁর সঙ্গে হারিয়ে গেলেন আরও নয়জন সহযাত্রী, যাঁদের নাম হয়তো কখনো খবরের শিরোনাম হবে না। রেকর্ড, খ্যাতি, ডকুমেন্টারি—তুষারের স্তূপের নিচে কোনোটিই কোনো পার্থক্য গড়ে দেয়নি। অথচ ভারী তুষারপাতের ঝুঁকি দেখে অন্য অভিযাত্রী দলগুলো তার আগেই পাহাড় ছেড়ে নেমে এসেছিল। তারা থেমেছিল, ফিরে এসেছিল—আর সেটাই তাদের বাঁচিয়ে দিল। পাহাড়ে সাহসের চেয়েও বড় গুণ বোধহয় সময়মতো থেমে যাওয়ার বিনয়।

পাহাড়ে মৃত্যু কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং সেটিই সেই ঝুঁকি, যা জেনেশুনেই প্রতিটি পর্বতারোহী অভিযানে বের হন। আট হাজার মিটারের ওপরে কোনো নিশ্চয়তা নেই। শিখরে ওঠা ঐচ্ছিক, কিন্তু ফিরে আসা কখনোই নিশ্চিত নয়।

এই শিক্ষাটি ইতিহাস বহুবার দিয়েছে।

১৯৫০ সালে মরিস হারজগ ও লুই লাশেনাল প্রথমবারের মতো অন্নপূর্ণা আরোহণ করে মানব ইতিহাসে প্রথম আট-হাজারি শৃঙ্গ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন। বিশ্ব তাঁদের বীরের সম্মান দেয়। কিন্তু সেই "বিজয়"-এর মূল্য ছিল আজীবনের। ঠান্ডায় হারজগ তাঁর হাত ও পায়ের আঙুল হারান। পাহাড় তাঁকে শিখরে দাঁড়াতে দিয়েছিল, কিন্তু বিনা মূল্যে নয়।

রেইনহোল্ড মেসনারকে অনেকেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী মনে করেন। কিন্তু তাঁর জীবনও পাহাড়ের কাছে ঋণী। নাঙ্গা পার্বতে তিনি তাঁর ভাই গুন্থারকে হারিয়েছেন। পরবর্তী জীবনে হারিয়েছেন বহু বন্ধু ও সহযাত্রীকে। তবু মেসনার কখনো পাহাড় "জয়" করার ভাষা ব্যবহার করেননি। তিনি জানতেন, মানুষ কেবল অল্প সময়ের জন্য পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে।

জেরজি কুকুজকা মাত্র আট বছরেরও কম সময়ে পৃথিবীর চৌদ্দটি আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণ করেন। নতুন রুট, শীতকালীন আরোহণ—অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি। অনেকেই তাঁকে মেসনারের প্রতিদ্বন্দ্বী বলতেন। অথচ মেসনার নিজেই লিখেছিলেন, "তুমি দ্বিতীয় নও, তুমি মহান।" সেই কুকুজকাই লোৎসের দক্ষিণ প্রাচীরে একটি দড়ি ছিঁড়ে মৃত্যুবরণ করেন। পৃথিবীর অন্যতম সেরা পর্বতারোহীর জন্যও পাহাড়ের নিয়ম আলাদা ছিল না।

জর্জ ম্যালরি এভারেস্টে হারিয়ে গেছেন।

হারমান বুল চোগোলিসায় মারা গেছেন।

অ্যালেক্স লো, ডেভিড লামা, হান্সইয়র্গ আউয়ার, তোমাজ হুমার — ইতিহাসের তালিকা দীর্ঘ। পাহাড় কারও নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না।

এই নির্মম সত্যটিকে আমি খুব কাছ থেকেও দেখেছি।

ভারতের কাশ্মীরে আমি শেরপা পেম্বার সঙ্গে একসঙ্গে আরোহণ করেছি। অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং অসাধারণ শান্ত একজন মানুষ। বছরদুয়েক পর আরেক অভিযানে সফলভাবে শিখর আরোহণের পর ক্যাম্প গুটিয়ে ফেরার সময় তিনি একটি ক্রেভাসে পড়ে যান। তাঁকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি শিখরে উঠেছিলেন, কিন্তু পাহাড় তাঁকে ঘরে ফিরতে দেয়নি।

বাংলাদেশের সজল খালেদ। ঢাকায় তিনি ছিলেন একজন শারীরিক প্রশিক্ষক, অসংখ্য তরুণের অনুপ্রেরণা। এভারেস্ট থেকে তিনিও আর ফিরে আসেননি। পাহাড় জানত না তিনি কে। জানার প্রয়োজনও ছিল না।

তাহলে মানুষ কেন পাহাড়ে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো জর্জ ম্যালরি দিয়েছিলেন—"Because it's there."

কিন্তু আমি মনে করি, আমরা পাহাড়ে যাই নিজেকে বড় প্রমাণ করতে নয়; বরং নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করতে। পাহাড় শেখায় বিনয়। শেখায় ধৈর্য। শেখায় সঠিক সময়ে ফিরে আসার সাহস। অনেক সময় শিখরে পৌঁছানোর চেয়েও ফিরে আসার সিদ্ধান্তটাই বড় অর্জন।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত দৌড়াচ্ছি—প্রথম হওয়ার জন্য, রেকর্ড গড়ার জন্য, অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পাহাড়ে সেই প্রতিযোগিতার কোনো মূল্য নেই। সেখানে অহংকারের শাস্তি অনেক সময় চূড়ান্ত।

হয়তো এ কারণেই প্রকৃত পর্বতারোহীরা পাহাড় নিয়ে বড়াই করেন না। তাঁরা জানেন, প্রতিটি সফল অভিযান কোনো বিজয় নয়; বরং আরেকটি সুযোগ।

আমরা পাহাড়ে পতাকা গেড়ে ফিরে আসি। পাহাড় ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।

সে অপরিবর্তিত।

অপরাজিত।

পাহাড় কাউকে জয়ী হতে দেয় না। কেউ কেউ কেবল ফিরে আসার সৌভাগ্য পায়। একটা কথা আছে - In a showdown, mountain always wins.

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৩৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বুনো মহিষের পাল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:২৯



ঘনিয়ে এসেছে প্রস্থানকাল; অনেককিছুর মতো আমিও
হারিয়ে যাবো কালের গর্ভে বা কৃষ্ণচুড়ার লালে লালে।
মূলত হারিয়ে যাওয়ার জন্যই আবির্ভূত হয়ে,
মাঝখানে সবার সাথে খেলে গেলাম বনভোজন বনভোজন।

অনেকদিন ধরেই মগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ ভ্রমনঃ মেহেন্দীগঞ্জ উলানিয়া_জমিদার বাড়ি

লিখেছেন মৌন পাঠক, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭

আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে কোনো এক বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় চলে যান সদরঘাটে। সেখান থেকে উলানিয়াগামী কোনো একটি লঞ্চে উঠে পড়ুন। লঞ্চের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে এক পাশের একটি কেবিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

I Have a plan / মুচলেকা দিয়ে যাওয়া এবং মুচলেকা দিয়ে ফেরত আসা সরকারের রাষ্ট্র ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৫:৪৬





ওয়াশিংটন – যদিও তিনি এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন যার বৈধতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে, এবং শক্তিশালী মহলের প্ররোচনায় যাদের হস্তক্ষেপ কখনোই সন্দেহের বাইরে ছিল না, তারেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবার ও শরীরে ঢুকছে?

লিখেছেন কাবিল, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৪


মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastic) হলো খুব ছোট প্লাস্টিকের কণা। সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর থেকেও অনেক ক্ষুদ্র কণা আছে—সেগুলোকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এনসিপিকে মারছে কেন? (অথবা) এনসিপি মার খাচ্ছে কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০


(ইহা নাকি এনসিপিকে পিষিয়ে মারবে!)

এনসিপিকে মারছে কেন (?) অথবা এনসিপি মার খাচ্ছে কেন? প্রশ্ন দুটো হলেও আদতে প্রশ্ন একটাই উত্তরও একটাই। বিগত ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ খুনি হাসিনার আমলে যাহারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×