ভারত
দয়ালু রাজা
মোস্তফা হোসেইন
এক দেশে ছিল এক রাজা। নাম তার কর্ণ। সে ছিল অনেক দয়ালু। মানুষের দু:খে সুখে পাশে দাঁড়াতে পারলেই সে তৃপ্তি পেতো। যখন সে অসহায়কে দান করতে পারতো তখনই তার কাছে মনে হতো তার চেয়ে সুখি মানুষ যেনো দুনিয়াতে আর কেউ নেই। সে আনন্দ পেতে চাইতো প্রতিদিন। এমনকি যতণ সে দান-খয়রাত না করতে পারতো ততণ কিছু মুখেই দিত না। সেজন্যেই সে প্রতি ভোরে গরিবকে 100 স্বর্ণমুদ্রা দান করার পর নাস্তা খেতে যেত। কোনোদিন যদি দান গ্রহণ করার মতো কাউকে না পেতো তখনই তার সব হেরফের হয়ে যেতো। প্রশ্ন হচ্ছে এত সোনাদানা সে কোথায় পেতো? সে এক রহস্য।
যাই হোক কর্ণের চেয়েও অনেক বেশি দয়ালু ছিল আরেক রাজা । নাম ছিল তার বিক্রম। এমন কেউ নেই যে নাকি তার কাছে এসে খালি হাতে ফিরে গেছে। কেউ যদি তার কাছে সোনা চাইতো তিনি তাকে তাই দিয়ে দিতেন। কেউ যদি রূপা চাইতো তাতেও তার কোনো বাধা ছিল না। কেউ যদি চাইতো ঘোড়া তাও দিয়ে দিতেন। তার এত সুনাম ছিল যা কল্পনাও করা যায় না। পশুপাখিরাও তাকে অনেক ভালবাসতো। তার গুণে মুগ্দ ছিল তারা।
একদিন রাজা বিক্রম তার বাগানে হাঁটছিলেন। এমন সময় দুটি রাজহাঁস উড়ে এলো তার সামনে। তারা রাজাকে বললো-রাজা আমরা ুধার্থ। আপনি কি আমাদের কিছু খবার দিতে পারেন?
রাজা বললেন, এ কোনো বিষয় হলো নাকি। কত শষ্যকণা চাই তোমাদের। যত ইচ্ছা তোমরা খেতে পারো তোমাদের তাই দেওয়া হবে।
রাজহাঁস বললো,দুখিত রাজা, আমারা খাই শুধু হীরার টুকরা।
রাজা বললেন, ঠিক আছে তোমাদের তাই দেওয়া হবে।
সেই তো শুরু । প্রতিদিনই রাজহাঁসগুলো এসে বিক্রমের এখানে হীরার টুকরো খেয়ে যায়। ওড়ে যেতে যেতে তারা গান গায়- বিক্রম রাজার মতো এত দয়ালু রাজা আর হয় না। তিনি সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু রাজা।
একবার সেইরাজ হাঁসগুলো কর্ণ রাজার দেশ দিয়ে যাচ্ছিল। আর বিক্রম রাজার গুণকীর্তন করছিল। উড়তে উড়তে ওরা একসময় কর্ণ রাজার প্রাসাদের উপরে চলে আসে। আর মনের সুখে গান গাইতে থাকে - বিশ্বের সেরা দয়ালু রাজা বিক্রম রাজা।
কর্ণ শুনলেন সেই গান।
তিনি তো প্রচণ্ড রেগে যান এই গান শুনে। নির্দেশ দেন,যাও ধরে নিয়ে এসো হাঁস দুটিকে। আমার চেয়ে বড় দয়ালু কে হতে পারে পৃথিবীতে। আমি জানতে চাই কেন তারা এমন গান গাইছে।
পাইক পেয়াদা ঘোড়া নিয়ে ছুটলো হাঁসগুলোর পিছু। ছুটছে তো ছুটছে। ছুটতে ছুটতে অনেক দূর গিয়ে থামলো ঘোড়া। কারণ ওখানেই দেখা গেলো হাঁস দুটি মাটিতে নেমেছে।
তখনো ওরা গান গাইছে। একসময় ওদের গান গাওয়া থেমে যায়। মনে হয় ওরা কান্ত হয়ে গেছে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য ওরা একজন আরেকজনের গায়ে মাথা রেখে শুয়ে থাকে।
আর সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় রাজার পাইক-পেয়াদা।
আস্তে আস্তে হাঁসগুলোর কাছে যায় ওরা। তারপর ঘপ করে ধরে ফেলে ওদের।
কিন্তু রাজার পাইক-পেয়াদার হাতে ধরা পড়েছে হাঁস। কী আর করা। চুপ করে থাকে হাঁসগুলো। আর পাইক পেয়াদারা হাসগুলোকে সোজা নিয়ে যায় রাজার দরবারে। সেখানে এনে হাঁস দুটোকে একটি খাঁচায় পুরে নিয়ে যাওয়া হলো রাজার সামনে।
রাজা হাঁসগুলিাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা রাজা বিক্রমকে কোন কারণে বেশি দয়ালু মনে করছ? তোমরা কি জাননা আমি কত বেশি দয়ালু?
হাসীটা বললো, জানি রাজা।
তবে বিক্রম কিন্তু আপনার মতো কোনো পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে রাখে না।
রাজা হাঁসীকে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু হাঁসটা রয়ে গেল বন্দী।
হাঁসী ওড়তে লাগলো। উড়তে উড়তে গিয়ে বিক্রম রাজার কাছে পেঁৗছাল। সে কাঁদতে লাগলো বিক্রম রাজার পায়ের কাছে বসে।
কারণ জানতে চাইলেন রাজা ।
হাঁসিটা কাঁদতে কাঁদতে রাজাকে বলল, রাজা মহাশয় আমরা আপনার জয়গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলাম কর্ণ রাজার প্রাসাদের উপর দিয়ে। আমাদের গাওয়া গান শুনে রাজা কর্ণ খুব েেপ যায়। তার কথা দুনিয়াতে তার চেয়ে বড় দয়ালু নাকি কেউ নেই।
তারপর তো আমাদের ধরে নিয়ে গেল রাজার লোকজন। বন্দী করলো খাঁচায়। একসময় আমাকে ছেড়ে দিলেও আমার স্বামীকে আটকে রেখেছে খাঁচায়। এখন বলুন আমি কিভাবে আমার স্বামীকে মুক্ত করে আনবো? আপনি দয়া করে আমার স্বামীকে মুক্ত করার ব্যবস্থা নিন।
রাজা বললেন, ঠিক আছে আমি দেখবো কী করা যায়।
তিনি রওনা হলেন কর্ণরাজার প্রাসাদের দিকে। তার আগে তিনি রাজকীয় পোশাক বদল করে নিলেন। একেবারে সাধারণ পোশাক পরে নিলেন।
কর্নরাজার কাছ গিয়ে বললেন,মহারাজ আমাকে যদি আপনি একটা চাকরি দিতেন, তাহলে আমার জন্য খুবই উপকার হতো।
কর্ণরাজ বললেন, ঠিক আছে। আগামী সকাল থেকে তুমি স্বর্ণমুদ্রা বয়ে নিয়ে যাবে প্রাসাদ থেকে।
রাজা বিক্রম খুব খুশি হলেন।
এটা তো জানা কথা, বিক্রম রাজা আসলে জানতে চান এই রাজা কোথা থেকে এত স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে থাকে। হাঁসটাকে মুক্ত করা যেমন তার দায়িত্ব তেমনি কর্ণরাজা কোথা থেকে প্রতিদিন স্বর্ণমুদ্রা রোজগার করে তাও দেখতে হবে।
এক সকালে কর্ণ বের হলেন প্রাসাদ থেকে। বিক্রম ভাবলেন, এই সুযোগ। তার পিছু নিতে হবে। এটা নিশ্চিত যে, সে যাচ্ছে সোনাদানা আনতে। তেমন সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়? তাই সে পিছু নেন কর্ণরাজার।
কর্ণ হাঁটছেন তার পেছনে বিক্রমও হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে পেঁৗছালেন এক পাহাড়ের কিনারে। পাহাড়ও ডিঙ্গিয়ে গেলেন এক সময়। তারপর একটা বন। সেই বনের মাঝখানে এক কুটির।
কর্ণকে দেখা গেলো সেই কুটিরের ভিতরে ঢুকতে।
কুটিরের জানালা খোলা। জানালা দিয়ে দেখা গেল-ভিতরে বসে আছে এক সন্নাসী।
সন্নাসীর ঘরের সামনে উনুনে বসানো একটি কড়াই। সেই কড়াইয়ের নিচে জ্বলজ্বলে আগুন। কর্ন রাজা সেই কড়াইয়ের কিনার বেয়ে কড়াইয়ে গিয়ে ওঠলেন। বোঝা গেল কড়াইয়ে নিশ্চয়ই কিছু সিদ্ধ হচ্ছে। আর অবাক করা কাণ্ড হচ্ছে- সেই কড়াইয়ে কিনা ঝাপ দিলেন কর্ণ।
কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেল। কিন্তু কর্ণত্দ অবস্থা কি বোঝা যাচ্ছিল না। এমন সময় দেখা গেল সন্নাসী গেল সেই কড়াইয়ের কাছে। তারপর কড়াইয়ে হাত দিয়ে টেনে আনল একটা মানুষ। বুঝতে অসুবিধা হল না এটাই কর্ণ। চেনা যাচ্ছিল না তাকে। কারণ কর্ণ তো আর কর্ণের চেহারায় ছিল না। হয়ে গেছে যেন একটা রোস্ট। আর সেই রোস্টই খেতে শুরু করেছে সন্নাসী। এমনভাবে খাচ্ছে যে, দেখলে মনে হবে কতদিন যে সে অনাহারে আছে কে জানে। গোগ্রাসে খেতে খেতে অল্প সময়ের মধ্যেই কর্নর মাংস বলতে আর কিছুই বাকী রইল না।
মাংস খাচ্ছে আর হাড্ডিগুলো সাজিয়ে রাখছে একসঙ্গে। একসময় সে হাড্ডিগুলোকে কঙ্কালের মতো বানালো। তারপর বলল, মাংস খেতে মজা অনেক। হাড় দিয়ে কি হবে। বরং এগুলো মাংস হয়ে যাক। পরে না হয় আবার খাওয়া যাবে। চোখ বন্ধ করে আবার বলল, হাড্ডির উপর মাংস হও।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মাংস হয়ে গেলো সেইসব হাড়ের উপর। তার পর সন্নাসী বললো- প্রাণ ফিরে আসুক। প্রাণও ফিরে এল কর্ণ রাজার। এরপর কর্ণ রাজা ওঠে বসলেন । সন্নাসী একটা কোট তার গায়ে চড়িয়ে দিলেন। কর্নকে বললেন- ঝেড়ে গায়ে দাও কোট। কর্ণ তাই করলেন।
কর্ণ কোট ঝাড়তেই ঝরঝর করে পড়তে থাকে স্বর্ণমুদ্রা। সেগুলো মুঠো মুঠো ভরে নিলেন কর্ণ। পকেট ভর্তি করে কর্ণ রাজা সন্নাসীকে সালাম জানালো। তারপর অনুমতি চাইলো বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। সন্নাসী অনুমতি দিতেই বাড়ির পথে রওনা হলেন কর্ণ।
এখন তো আর তার বুঝতে অসুবিধা রইল না কোথা থেকে কর্ণ রাজা স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে থাকে। আর তার চিন্তা করতেও অসুবিধা হয় না কিভাবে সেও স্বর্ণমুদ্রার মালিক হতে পারবে।
পরেরদিন খুব ভোরে বিক্রম রাজা গেলেন সেই পাহাড়ের কিনারে। তারপর বনে গেলেন সেই সন্নাসীর কুটিরে।
সন্নাসী চোখ বুঝেই জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার আজকে এত তাড়াতাড়ি? বিক্রম বললো,সন্নাস বাবা আজকে একটু কাজ আছে।
এই কথা বলে বিক্রম কড়াই বেয়ে ওঠল যেন বহুদিন ধরেএ সে এ কাজটি করে আসছে। সে ধীরে ধীরে কড়াইয়ের কিনার বেয়ে বেয়ে উপরে ওঠে গেল। তখন তো কড়াই টগবগ করে ফুটছে। কিছুটা ভয় ভয় লাগছে তার। কিন্তু তারপরও সে মনে করল এ তেমন কিছু না কারণ এই স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে তো সে নিজের কাজ করবে না। মানুষের জন্য কিছু করতে হলে নিজের কিছু ত্যাগ করতেই হয়। সুতরাং এই কড়াইয়ে ঝাপ দিয়ে যদি তার আর বাঁচাই সম্ভব না হয় তবু তো সে বলতে পারবে যে অন্যের জন্য সে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। তাতে খুব একটা লোকসান হবে বলে মনে হয় না। যেই ভাবনা সেই কাজ। সঙ্গে সঙ্গে সে ঝাপ দিল কড়াইয়ের মধ্যে।
এমন উত্তপ্ত কড়াইয়ে কোনো মানুষ পড়লে কি আর সে মানুষ থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই একবারে কাবাব যেন। সেই আগের মতো সন্যাসীও এগিয়ে এলো। দুই হাত দিয়ে কড়াই থেকে বের করে আনে বিক্রমকে। তারপর তার শরীর থেকে মাংস আলাদা করে নিল দ্রুত।
এর পরের ঘটনা সেই আগের মতোই ঘটতে থাকলো। যেভাবে কর্ণ রাজার ঘটেছিল। বিক্রম কর্ণ রাজার মতোই অনেক স্বর্ণ মুদ্রা পেলেন। তবে কর্ণ যা পারেনি তাই করলেন বিক্রম। বিক্রম সন্যাসীকে বললেন- বাবা তোমার এই কোটটা ্আমাকে দাও না।
সন্নাসী বলল, তাহলে প্রতিদিনের নাস্তা খাওয়ার কী হৰে।
বিক্রম বললেন, এ চিন্তা,তোমার করতে হবে না।
সন্নাসী তাকে কোট দিয়ে দিল।
বিক্রম কোট এবং স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে ফিরলেন কর্ণ রাজার প্রাসাদে। কর্ন রাজা দেখে তো অবাক। কারণ কর্ন রাজা সন্যাসীর ডেরায় যাওয়ার আগেই বিক্রম সেই স্বর্ণমুদ্রা এনে দিলেন কর্ণকে। বললেন, এবার সেই হাঁসটাকে মুক্তি দিয়ে দিন।
কর্ণ রাজা ভাবতে থাকলেন, এখন থেকে তো আর স্বর্ণমুদ্রা জোগাড় করা সম্ভব হবে না। সুতরাং কী আর করা রাজী হয়ে যায় বিক্রম রাজার কথায়।
মুক্ত করে দিলেন হাঁসটাকে।
হাঁসটি মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে সে ওড়তে থাকে । দুইটি হাঁস তখন রাজ্যময় ঘুড়তে থাকে আর বলতে থাকে বিক্রম হলো মহান সম্রাট। তিনি দয়ার সাগর। আকাশে শব্দ হলে তা অনেকে শুনে। আর মানুষও হাঁসের ডাক শুনে আকাশের দিকে তাকায়। আর শুনতে থাকে-হাঁসগুলো বলছে, বিক্রম হলো মহান সম্রাট তার তুলনা নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


