মাত্র ৯ মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন নজিরবিহীন, তেমনি স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র চার বছর পর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের কাছে ক্ষমতা বিসর্জন দেওয়ার ঘটনাও বিস্ময়কর। দূর অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার জন্য প্রলম্বিত যুদ্ধ করেছে বিলেতের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পর প্রায় সাত দশক ধরে অন্তর্ঘাতমূলক সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে, যার পরিসমাপ্তি ঘটেছে আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর যুক্তরাষ্ট্রকে আর বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়নি। নিকট-অতীতে ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। যুদ্ধোত্তর সাময়িক বিশৃঙ্খলার পর ভিয়েতনামকে আর বিপর্যয়ের শিকার হতে হয়নি। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকে মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে যুদ্ধোত্তর প্রতিবিপ্লব সংঘটিত হতো না। এটি একটি ধারণা মাত্র। এর সঙ্গে একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেকেই একমত নন। কারণ পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকার তথা পাকিস্তানি সেনারা যে ধরনের নৃশংস বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, তাতে মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে তারা পশুত্বের কোন পর্যায়ে চলে যেত, তা ধারণা করাও কঠিন। পাকিস্তানি সেনারা তো ঘোষণাই করেছিল, 'হামলোগ স্রেফ মিট্টি মাংগতা, আদম নেহি।' অর্থাৎ আমরা শুধু মাটি চাই, মানুষ চাই না। কারণ মানুষরা সব 'মুক্তি'। এই যাদের মানসিকতা, তাদের এক দিন সময় দেওয়াও দুঃসহ ক্ষতির কারণ হতে পারত, হয়েছেও। ১৩ ডিসেম্বর নরপশুদের আত্মসমর্পণ করাতে পারলে ১৪ ডিসেম্বর হারিয়ে যাওয়া বিশিষ্ট নাগরিকদের জীবন রক্ষা পেত। স্বাধীনতাবিরোধী বাংলাদেশিরা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও পরবর্তী সময়ে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং পাকিস্তানিরা আজও নিজ দেশে প্রতিদিন যে নরহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে পাকিস্তানি-রাজাকার প্রজাতিটিকে নরপশু বলে আখ্যায়িত করাই সংগত। অনেক রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে হলেও নরপশুদের বিতাড়ন করতে পারা বাঙালির সৌভাগ্য এবং আল্লাহর মেহেরবানির অশেষ নিয়ামত।
বাঙালির অর্জনের দীর্ঘ পথপরিক্রমার প্রথম মন্জিল ছিল ভৌগোলিক স্বাধীনতা, যা আমরা একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম। এ ছিল অর্জনের শুরু। অর্জনের দীর্ঘ পথপরিক্রমার অনেক বাকি। বলা যায়, পথ ধরেছি, কিন্তু পথ অতিক্রম করিনি, এমনকি পথচলাও স্বচ্ছন্দ ছিল না। দুই পা এগিয়েছি তো এক পা পিছিয়েছি। ভৌগোলিক স্বাধীনতার অর্জন-পূর্ব গর্বিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে অর্জন-পরবর্তী কলঙ্কিত অভিজ্ঞতার এমন দিন-রাত পার্থক্যের কারণ কী?
অর্জন-পূর্ব অভিজ্ঞতা এক কথায় চমকপ্রদ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন, সত্তরের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আন্দোলন এবং সব শেষে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ_এর প্রতিটি পর্বই ছিল অনন্য। প্রতিটি পর্বে আঘাত এসেছিল এবং পরবর্র্তী পর্বকে শক্তিশালী করেছিল। আন্দোলনে অভূতপূর্ব একতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব ছিল লক্ষ করার মতো। শত্রু চিহ্নিত ছিল। শত্রুর স্থানীয় দালাল চিহ্নিত ছিল। নেতৃত্ব অপ্রতিরোধ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সুতায় সেদিনের সাড়ে সাত কোটি বাঙালি যেন একটি মালায় গাঁথা ছিল। একবারের জন্যও সুতা ছেড়েনি। গণঐক্যের মালা ছিল অটুট। এমনকি কিসিঞ্জার সরকার (মার্কিন জনগণ নয়) এবং চীনের মতো শক্তিধরদের বিরোধিতা ও হুমকি-ধমকিতে বিজয়ের অগ্রযাত্রা এতটুকু টোল খায়নি। জাতীয় সংহতির মুখে ছিটকে পড়েছিল অপশক্তির আস্ফালন। সপ্তম নৌবহরের হুমকি নস্যাৎ করে দিয়ে অর্জিত হলো ভৌগোলিক স্বাধীনতা।
এখন পর্যালোচনা করা যাক স্বাধীনতা অর্জন-পরবর্তী অবস্থা। স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত শত্রু দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। বাঙালি বিস্মৃত হলো যে পাকিস্তানি সেনারা অপসৃত হলেও তাদের এ দেশীয় অনুচররা রয়েই গেছে। মিশে গেছে সাধারণ্যে। কিন্তু মিলে যায়নি মনমানসিকতায়। সেই সঙ্গে নতুন স্বাধীন সরকার অনভিজ্ঞ, অনভ্যস্ত। তাদের নির্ভরতা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের আমলা কাঠামো ও নির্বাহীদের ওপর। রাজনীতিতে ঘটেছিল বিপ্লব। আর আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনে রক্ষিত হলো ধারাবাহিকতা। পূর্ব পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবকে ধারণ করবে, বহন করবে, এগিয়ে নেবে_এর চেয়ে অবাস্তব চিন্তা আর কী হতে পারে? অবশ্য এর কোনো সহজ বিকল্প ছিল না। এমনকি কঠিন বিকল্প ও তত্ত্বকথায় থাকলেও বাস্তবে রূপায়ণ কষ্টকল্প। যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসন পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সময় এবং সুযোগ সুপরিসর না থাকায় সিভিল ব্যুরোক্রেসির ব্যাপারে বড় কিছু করার ছিল না। যদিও আরো একটু সাবধানতা, আরো একটু যাচাই-বাছাই অতি প্রয়োজনীয় ছিল। সম্ভবও ছিল। অথচ করা হয়নি। এ জন্যই প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানিপ্রেমীরা পঁচাত্তরের পর আবার স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রান্ত আরো বেশি জোরালো হয়েছিল সামরিক ছাউনিতে। নতুন বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল পাকিস্তান-ফেরত বাংলাদেশি সেনাদলকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া। পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক বাঙালি সেনা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন বা সমর্থন করছিলেন_এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি এ কথাও সত্য যে তাদের অনেকেই পাকিস্তানপ্রেমে অন্ধ ছিলেন। পাকিস্তান ভাঙার জন্য তারা শেখ মুজিবকে দায়ী করত। ঠিক যেমনটা ছিল বেসামরিক অঙ্গনে। জামায়াতী, মুসলিম লীগার, রাজাকার_এরা সবাই তো বাঙালি। তবু তাদের হৃদয় ছিল পাকিস্তানি। সেনাদল ও সিভিল সার্ভিসে দীর্ঘদিন পাকিস্তানকে সেবা করার কারণে এ দুটি অঙ্গনে এর প্রতিফলন অবশ্যই ছিল। চীন, ভিয়েতনামসহ সশস্ত্র যুদ্ধে জয়ী দেশে সাবেক সেনা-আমলাদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা সবারই জানা।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কথা একটু বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে যাচাই করা হতো প্রার্থীর ভারতবিদ্বেষ এবং পরধর্মবিদ্বেষ, বিশেষ করে হিন্দুবিদ্বেষ। মনস্তাত্তি্বক পরীক্ষা, গ্রুপ আলোচনা এবং মৌখিক পরীক্ষা_এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত না হলে কোনো বাঙালি প্রার্থী চাকরি পেত না, এমনকি বেনিফিট অব ডাউটও তাদের ভাগ্যে জুটত না। বাঙালি রাজনৈতিক দল বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সামান্য সম্পর্কিত হলেও পত্রপাঠ বিদায়। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি বা বাম সংযোগ থাকলে তাদের বলা হতো 'ফিফথ কলামিস্ট', যারা পাকিস্তানি জান্তার চোখে দেশদ্রোহী। পাকিস্তানপ্রেমী সেনাবাহিনীতে তাদের নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পঁয়ষট্টির পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কিছু বাঙালির স্থান হয়েছিল আগের কড়াকড়িকে একটু শিথিল করে। উদ্দেশ্য ছিল, বাঙালিদের কিছুটা 'কনসেশন' দেওয়া, যাতে তারা বিদ্রোহী হয়ে না ওঠে।
এ প্রক্রিয়ায় চাকরিপ্রাপ্ত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি সেনাদের মধ্যে যাঁরা পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন একাত্তরে, তাঁদের মন-মানসিকতা সহজেই অনুমেয়। তদুপরি ৯ মাসে ভুল তথ্য দিয়ে তাদের মস্তক ধোলাইও করা হয়েছিল। তাদের জানানো হয়েছিল, 'বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করছে না। ভারতীয়রা 'মুক্তি' সেজে স্যাবোটাজ করছে। সাহায্য করছে বাঙালি হিন্দুরা। এপার-ওপার উভয় অংশের 'হিন্দুরা'। ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের পর তারা বাঙালি সেনাদের জানিয়েছিল, 'পূর্ব পাকিস্তান এখন ভারতীয় সেনাদের দখলে। মসজিদ-মাদ্রাসা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ইসলাম বিপদে পড়েছে।' পাকিস্তান থেকে বাঙালি সেনারা দেশে ফিরেছিলেন এ ধারণা নিয়ে।
ফারুক-রশীদ-ডালিম খুনি চক্রকে পাকিস্তান অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। বিজয়ের স্বল্পকাল আগে তারা পাকিস্তান থেকে ভারতে এল কেমন করে? তারা তো পাকিস্তানি ছাউনিতে কড়া নজরদারিতে থাকার কথা। ফারুক বাংলা ভালো জানে না। ভাঙা ভাঙা বাংলা উর্দু জবান মিশ্রণে প্রকাশ করে। এরা ছিল মদ্যপ প্রতিক্রিয়াশীল। হৃদয়ে পাকিস্তানি। আইএসআই (পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা) এদের রিক্রুট করে পরিকল্পনামাফিক অগ্রিম দল হিসেবে ভারতে প্রেরণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য। তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে আত্মস্থ হয়েছিল সুপরিকল্পিতভাবেই। তখন থেকেই তাদের মাধ্যমে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের শুরু ও অগ্রযাত্রা। তাদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে যোগ দিয়েছিল পাকিস্তান-ফেরত বাঙালি সেনাদের কেউ কেউ।
মোশতাককে সামনে রেখে অঘটন ঘটানো হলেও নেপথ্যের মূল নায়ক ছিল সেনা ছাউনিতে। সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ধারায় ছোট এবং সুসংহত একটি সেনাদল পাকিস্তানি এজেন্ট হিসেবে কাজটি করেছিল। এটি এখন আর ধারণামাত্র নয়, তথ্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অবমুক্ত করা কিছু গোপন দলিল থেকে এসব বোঝা গেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তাতে বাংলাদেশকে উল্লেখ করা হয়েছিল 'ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ' নামে। অথচ কুচক্রীরা তখনো তা করে উঠতে পারেনি। বোঝা যায়, এটিই ছিল পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট। লক্ষ্য ছিল ইসলামিক রিপাবলিকের বন্ধনে কনফেডারেশন গঠন করা। ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম অন্তর্ভুক্ত করেছিল। জামায়াতকে ক্ষমতায় আরোহণ করিয়েছিল।
বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র করিডর হিসেবে ব্যবহারের সব রকম প্রচেষ্টাই পাকিস্তান নিয়েছিল। বাংলাদেশকে প্রায় 'পূর্ব পাকিস্তান'-এর মতো ব্যবহার করাই ছিল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে উলফা নেতা আটক, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের পটভূমি_এসব পর্যালোচনা করলে এ রকম সিদ্ধান্তেই পেঁৗছাতে হয়। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি নিরীহ বাঙালি হত্যা করেছিল, এটা সবারই জানা। পঁচাত্তরের পর জন্ম নেওয়া বিএনপি সম্পর্কে সন্দেহ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এখন ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে যে তারাও স্বাধীনতাবিরোধী মঞ্চ। জামায়াতের সহযোগী। লক্ষ করলে বোঝা যায়, বিএনপির আক্রমণের লক্ষ্য হলো ভারত, যে দেশটি একাত্তরে আমাদের সহযোদ্ধা ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সমালোচনা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে বিএনপি বাহ্যত উদাসীন হলেও কার্যত বিরোধী। মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পাকিস্তানের প্রতি বিএনপি বন্ধুভাবাপন্ন। আর মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ভারতের প্রতি বিষোদ্গার ছাড়া তাদের একটি দিনও কাটে না।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ভুলিয়ে দিয়ে কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তুতি হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কখনো কনফেডারেশনে যাবে না। তাই গোয়েবলসীয় এক অদ্ভুত প্রচারণার ধারায় প্রচুর অর্থ ব্যয়ে, পাকিস্তান-মধ্যপ্রাচ্য সার্বিক সহায়তায় ও প্ররোচনায় তারা 'নতুন বাংলাদেশ' গড়তে চাইল, যে দেশের মূল নেতা জিয়াউর রহমান, বন্ধুদেশ পাকিস্তান, শত্রুদেশ ভারত, মস্তিষ্ক ধোলাই করতে ধর্মের ব্যবহার এবং রাষ্ট্রযন্ত্র করায়ত্ত রাখত জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে পঁচাত্তর-পূর্ব এবং পঁচাত্তর-উত্তর রাজনৈতিক শক্তিদ্বয়ের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব নয়। পাঁচত্তর-পূর্ব শক্তি মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি। পঁচাত্তর-উত্তর নব সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি ছদ্মাবরণে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, পাকিস্তানি মদদপুষ্ট স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এই দুইয়ের সমঝোতা সম্ভব হলে তো মুক্তিযুদ্ধেরই প্রয়োজন হতো না। যারা 'নিরপেক্ষতার' ভণিতায় 'গণতন্ত্রের' জন্য সমঝোতার কথা বলেন, তাঁরা পঁচাত্তর-উত্তর শক্তিবলয়ের নিকটতর। বেনিফিশিয়ারিও বটে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন নেই। সে অধিকারও নেই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের। প্রয়োজন হলো, নিজেদের স্খলন, পতন ও ত্রুটি উপলব্ধি করা এবং শোধরানোর কঠোর পথে অগ্রসর হওয়া। এ উদ্দেশ্যে আত্মসমালোচনায় ব্রতী হওয়া প্রয়োজন। আত্মসমালোচনার পথেই আত্মসংশোধন সম্ভব। দেশীয় মীরজাফরি, বিদেশি চক্রান্ত ও মদদ_এসব কিছু স্বীকার করেও বলতে হয়, স্বাধীনতার পক্ষশক্তির স্খলন, পতন ও শক্তিক্ষয়ের মূল কারণ হলো, আত্মসমালোচনায় তীব্র অনীহা। সর্বসমক্ষে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন নেই। মুক্ত মন নিয়ে আত্মসমালোচনা করুন অভ্যন্তরীণভাবে। প্রয়োজনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। আত্মসংশোধন এমনই এক প্রক্রিয়া, যা দিবালোকের মতো স্পষ্ট দৃশ্যমান।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


