অনুবাদ আগেও করেছি। মাঝখানে বাদ দিয়েছিলাম অনেক ক'টি বছর। মৌলিক কিছু লেখায় প্রয়াসী হলাম। ছোটগল্প লিখলাম, কবিতা লিখলাম, এমনকি প্রবন্ধও। এরপর নতুন করেই সে সখ মাথায় ভর করলো ষ্টেফান সোয়াইগের একটি গল্প পড়ার পর। মনে হল, নিজে যা লিখি, সেরকম লেখার মতো সাহিত্যিক তো রয়েছেন ভুরি ভুরি। আমি না লিখলেও কারোই কিছু আসবে যাবে না। কিন্তু এসব লেখকরা যা রচণা করে গেছেন, তার সামান্যও যদি আমাদের দেশের পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে পারি, সেটাই হবে কাজের মতো কাজ। দু'টো ভাষাই ভাল জানার সুবিধা আমার রয়েছে। সে সুবিধা ব্যাবহার করে অন্যকে রসাস্বাদন সুযোগ করে দেয়া অনেকটা কর্তব্য হিসেবেইে দেখি।
ষ্টেফান সোয়াইগের গল্প পড়ে নতুন করে আবার অনুবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে কেন 'কাফকা' শুরু করলাম, তা বলতে পারবো না। কিন্তু অনুবাদ শুরুর আগে এখানকার সবচে বড় বইএর দোকান 'হুগেন ডুবেল'এ সময় কাটিয়েছি বেশ ক'টি দিন। বেশ মজার জায়গা এই 'হুগেন ডুবেল'। আপনি যত খুশী বই নিয়ে সারাদিন সেখানে বসে বসে পড়তে পারেন। কারো কিছুই বলার থাকবে না। সেখানে অনেক বই নিয়ে অনেক সময় কাটিয়ে কাফকা শুরু করবো বলেই স্থির করলাম।
শুরু করলাম কাফকা। এমনভাবে কাহিনীর গতি, চরিত্র ও চরিত্রের বিমর্ষতার মাঝে নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম যে, নিজের অস্তিত্বই ভুলে গেলাম প্রায়। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা এমনকি গভীর রাত কেটেছে কাফকা আর গ্রেগরকে ভেবে ভেবে। এটা একধরণের জ্বরের ঘোর বলা যেতে পারে, যে ঘোরে শুধুমাত্র নিরেট যন্ত্রনাই নয়, এক ধরণের যন্ত্রনাহত তৃপ্তি নেশার মতো আগ্রাসী বিস্তারে ঢেকে দেয় সব। এর মাঝে অনুবাদ ব্লগে পোষ্ট করার লোভ সামলাতে পারলাম না। এতদিন লিখে লিখে নিজেকেও এই পরিবারের একটি অংশ হিসেবেই ভাবি। অনেক সময়েই সময়ের অভাবে নানা আলোচনায় অংশ নিতে না পরলেও ভাল মন্দ লিখেছি প্রচুর। সুতরাং প্রথম অংশটি পোষ্ট করে বসলাম। ভালো সাড়া পাওয়া গেল। সঙ্গীও পাওয়া গেল বেশ ক'জন।
কিন্তু খুব দ্রুতই স্তিমিত হয়ে গেলো সব। কমেন্ট আসা বন্ধ হয়ে গেল। মনে হলোনা কারো কোন আগ্রহ রয়েছে। অবাক হবার কিছুই নেই। এ ধরণের ফোরামের চরিত্র এমনই হবার কথা। হালকা বিনোদন আর তুমুল বাক্যালাপই এখানকার প্রধান আকর্ষন। জীবনের প্রতিটি পদেই কঠিন, বিশাল বিশাল পাথর সরিয়ে পথ করে নিতে হয় আমাদের। সেখানে এ ধরনের ফোরাম একবুক খোলা নি:শ্বাসের বিরল পকৃতির মতো। কিন্তু কমেন্ট একধরণের প্রাতিধ্বণির মতো। একজন গায়ক যখন স্টেজে বসে গান করেন, নিজের গলার আওয়াজ শুনতে হয় তার। কমেন্টও আমার কাছে তেমনি জরুরী অনুপ্রেরনা। দেখলাম কমেন্ট ছাড়া্ও হিট বাড়ছে, যদিও হিটের প্রতি কোন আগ্রহ নেই আমার। একবার ভাবলাম বন্ধ করে দিই এখানে পোষ্ট করা। কিন্তু তাহলে যে একজন বা দু'জন আগ্রহী তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। কিছুতেই তা করতে আমার মন চাইলো না, তাই দাঁতে দাঁত চেপে লিখে গেলাম। তাছাড়া 'কাফকা জ্বর' থেকে নিজেকে মুক্ত করাও নিজের জন্যে খুব জরুরী হয়ে পড়েছিল। 24শে ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটিতে দাওয়াত ছিল বিভিন্ন জায়গায়। সব বাতিল করে গ্রেগর আর কাফকাকে নিয়েই পড়লাম। গ্রেগরের মৃত্যুর অংশটির অনুবাদ হলো সে রাতেই। নিজে কাহিনীর ভেতরে এতটাই প্রবিষ্ট যে, বিমর্ষ, চুপচাপ হয়ে থাকলাম অনেকটা সময়। তারপর সারারাত জেগে শেষ করলাম বাকীটুকো। 'কাফকা জ্বর'এর উপশম ঘটলো অবশেষে। আপাতত: কিছুটা সময় অনুবাদটি এভাবেই রেখে পরে আরো অনেক ভুল, ভ্রান্তি দুর করায় হাত দেবো।
এখন অনুবাদ করছি ষ্টেফান সোয়াইগের 'অদৃশ্য শিল্পকর্ম'। অতুলনীয় রচণা। ভাল লাগছে খুব। 'কাফকা জ্বর'এর মতো তেমন কোন ঘোর না থাকলেও বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে ভাবতে হয় অনেক। শব্দ খুঁজে খুঁজে এক একটি লাইন পছন্দমতো সাজাতে পারলে অনেকটাই বিশ্বজয়ের কাছাকাছি এগিয়ে যাই। এ এক অন্য ধরণের আনন্দ, অন্য রকম তৃপ্তি। তবে ব্লগে প্রকাশ করছি না আর। সামনের বই মেলায় আরো কিছু অনুবাদকে সঙ্গী করে বই হয়ে পাঠকমহলে স্থান খোঁজায় প্রয়াসী হবে। আপনারা সময়মতোই জানবেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


