- আমার মেয়ে আনেমারি আপানাকে হোটেল থেকে আনতে যেতে পারে কি? ...বিভিন্ন কিছু কারণে এটা ভাল হয় সবচেয়ে।...আপনি তো আপনার হোটেলেই খাওয়াদাওয়া সারবেন, তাইনা?
- অবশ্যই, আমি খুবই খুশী হবো তাতে। এতো আমার জন্যে আনন্দের ব্যাপার।
বললাম আমি।
সত্যিসত্যিই এক ঘন্টা পর, হোটেলের রেষ্টুরেন্টে দুপুরের খাবার শেষ করা মাত্রই, সাধারণ পোষাকে একটু বুড়িয়ে যাওয়া একটি মেয়ে এসে সন্ধানী দৃষ্টিতে প্রবেশ করল। এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে সাথে সাথেই তার সাথে রওয়ানা হতে চাইলাম। কিন্তু মেয়েটি হঠাৎ কোন এক লজ্জায় লাল হয়ে, তার মায়ের মতো একই রকম অস্বস্তিতে, ওখানে যাবার আগে তার কয়েকটি কথা শোনার জন্যে অনুরোধ জানালো। প্রতিবারই যখন সে কথা শুরু করতে চাইল, ততবারই মুখ থেকে শুরু করে কপাল অবধি লাল হয়ে গেলো ওর। পোষাকে বারবার হাত ঘসতে ঘসতে অবশেষে বলতে শুরু করলেও, প্রতিবারই একটু বলে স্তব্ধ হয়ে আবার নতুন কোন জড়তায় থমকে গেল বারবার।
- মা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। ..আমাকে সব বলেছেন।...আমাদের একটি বিশেষ অনুরোধ আছে আপনার কাছে।...বাবার কাছে যাবার আগেই তা আপনাকে জানাতে চাইছি।...বাবা আপনাকে অবশ্যই তার সংগ্রহ দেখাতে চাইছেন... এবং এই সংগ্রহ...এই সংগ্রহ... সম্পূর্ন নয়। এর অনেকগুলোই এখন আর নেই... এবং দু:খজনকভাবে বেশীরভাগই নেই। ...
আবার তাকে নি:শ্বাস নিতে হলো। তারপর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে দ্রুত বললো,
- আপনার কাছে আমাকে পুরোপুরি সৎ হতে চাইছি।... বর্তমান সময়টি কেমন জানেন, আশা করি আমাকে বুঝতে পারবেন সেজন্যেই।... যুদ্ধ যখন শুরু তখন বাবা পুরোপরি অন্ধ। এর আগেই চোখে সমস্যা হচ্ছিল প্রায়ই, অবশেষে যুদ্ধের উত্তেজনা তাঁর দৃষ্টিশক্তির পুরোটাই নষ্ট করেছে। সাতাত্তর বছর বয়েস হওয়া সত্বেও ওনি ফ্রান্সে যুদ্ধে যোগ দেবেন বলে পণ করেছিলেন। আমাদের সৈন্যরা যখন ১৮৭০ সালের মতোই সামনে এগুতে ব্যার্থ হচ্ছিল বারবার, অস্বাভাবিক ক্ষিপ্ত হন তিনি। তার পরপরই তাঁর দৃষ্টিশক্তি খুব দ্রুত কমতে শুরু করে। শারিরীক দিক থেকে তিনি এখনও পুরোপুরি শক্ত। অল্প ক্থদিন আগেও তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে পারতেন, এমনকি শিকারেও যেতেন। কিন্তু অন্ধত্বের কারণে এখন তিনি আর হাঁটতেও যেতে পারেন না ও তাই তাঁর আনন্দের একমাত্র উপকরণ হচ্ছে তার সংগ্রহ। .. এগুলো তিনি প্রতিদিন দেখেন ... আসলে দেখেন না ... দেখতে পারেন না। কিন্তু প্রতিদিন বিকেলে এলবামগুলো বের করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন... একটার পর একটা ... একই ক্রমানুসারে ... যা তাঁর গত দশ বছর ধরে মুখস্ত। অন্য কোন কিছুই এখন আর তাকে আকর্ষন করে না। ...প্রতিদিন পত্রিকা থেকে সব নীলামের খবরগুলো আমাকে পড়ে শোনাতে হয়। ... প্রতিবারই যতো বেশী মূল্যের খবর শোনেন, ততো বেশী উল্লসিত হন তিনি।...কারণ ... এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাবার এখন আর সময় ও মূল্য সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। ... ওনি জানেনই না ... সব হারিয়েছি আমরা ও তাঁর পেনশনের টাকায় মাসে দু্থদিনের বেশী চলা যায় না। ... তারপর আরো সমস্যা হয়েছে। আমার বোনের স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন। বোনকে চারটি সন্তান সহ রেখে গিয়েছেন একা। .. কিন্তু আমাদের এতবড় আর্থিক সমস্যার কথা বাবা কিছুই জানেন না। প্রথম আমরা মিতব্যায়ি হবার চেষ্টা করেছি, আগের চেয়ে অনেক বেশী, কিন্তু তাতেও সমস্যা মেটেনি। তারপর এটা সেটা বেচা শুরু করলাম, বাবার প্রিয় সংগ্রহগুলো ছোঁওয়ার কথা প্রথমে একেবারেই ভাবিনি। প্রথম দিকে একটা দু্থটো গহনা, যা ছিল। কিন্তু গহনাই বা কতটা ছিল! বাবা গত ষাট বছরে প্রতিটি পয়সা, যা বাঁচাতে পেরেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁর সংগ্রহের পেছনেই ব্যায় করেছেন। একসময় বিক্রি করার মতো কিছুই রইল না। ... আমরা কি করবো, কোন উপায় খুজে পাচ্ছিলাম না। ... তখন মা একটা আর আমি একটা ছবি বিক্রি করলাম। বাবা কখনোই সে অনুমতি দিতেন না, কিন্তু উনি জানতেন না, অবস্থা কতোটা শোচনীয়। উনি জানতেন না, কালোবাজারে খাদ্যদ্রব্য কেনা কতোটা কঠিন। উনি এটাও জানেন না যে আমরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। এলসাস ও লোথরিংগেন আমাদের ছেড়ে আসতে হয়েছে। পত্রিকা থেকে এসব খবরাখবর আমরা আর তাকে পড়ে শোনাই নি, তাঁকে উত্তেজিত করতে পারে ভেবে।
রেমব্রান্টের একটি মুল্যবান অংকন আমরা বিক্রি করেছি। যে কিনেছে, বেশ কয়েক হাজার টাকার বিনিময়েই। আমরা ভেবেছি কয়েক বছর এতেই চলে যাবে। কিন্তু আপনি তো জানেন, টাকাপয়সা কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ..... যতটুকু দরকার ততটাকুই রেখে, বাকী পুরোটা ব্যাঙ্কে রেখেছিলাম, কিন্তু দু্থমাসের মাঝেই শেষ। তারপর আরেকটি বিক্রি করতে বাধ্য হলাম ও পরে আরেকটি। কিন্তু মূল্য এতো দেরীতে পেলাম, যে ততক্ষনে টাকারই অবমূল্যায়ন ঘটেছে। তারপর চেষ্টা নীলামে বিক্রি করার। যদিও মিলিয়নের ঘরে দাম, ঠকানো হলো আমাদেরকে। ... মিলিয়ন যখন হাতে এলো, তখন তার মূল্য সাদা কাগজের মতোই। একটা দুটো ভালো সংগ্রহ বাদে যা সব মূল্যবান ছিল, সব এভাবেই হাতছাড়া হয়ে গেল, শুধুমাত্র প্রতিদিনের নগ্ন চাহিদা, বিবর্ণ জীবনকে আরো ক'দিন টিকিয়ে রাখার জন্যে আর বাবা এসবের কিছুই জানলেন না।
সেজন্যেই আপনার আসাতে এতোটা আতঙ্কিত হয়েছিলেন মা। .... এলবামগুলো খুললেই তো সব সত্য বেরিয়ে পড়তো। ... প্রতিটি পাতায়, যেখানে বাবা স্পর্শ করেই বুঝতে পারেন, একই ধরণের কাগজ ও নকল ছবি রেখেছি, যাতে টের না পান। কোন ছবির পর কোনটি আসবে, তা তাঁর মুখস্ত। ছবিগুলো ছুঁয়ে ও গুনে বাবা আগে চোখে দেখে যতটুকু আনন্দ পেতেন, এখনও ততটুকুই পান। এছাড়া এ ছোট্ট শহরে এমন কেউ নেই, যাকে বাবা এই সম্পদ দেখানোর যোগ্য মনে করেন। প্রতিটি পাতার প্রতিই তাঁর উন্মাদ ভালোবাসা. .. ও আমি নিশ্চিত, .. উনি যদি টের পান তার অগোচরে সবই উধাও, বুক ভেঙ্গে যাবে তার। ড্রেসডেন থেকে তামার উপর ছাপ যিনি পাঠাতেন, তার মৃত্যুর পর, এত বছর শেষে আপনিই প্রথম, যাকে বাবা তাঁর সংগ্রহ দেখাতে চাইছেন। সেজন্যেই আপনাকে অনুরোধ করছি.......,
এবং হঠাৎ হাত দুটো উপরের দিকে তুললো মেয়েটি। তার চোখ ভেজা।
- ... আপনাকে অনুরোধ করছি, দয়া করে আমাদের এত বড় ক্ষতি করবেন না। ... আমাদেরকে কষ্ট দেবেন না। তাঁর সর্বশেষ কল্পনাজগৎকে ধ্বংস করবেন না। সাহায্য করুন আমাদেরকে। প্রতিটি পাতা উনি আপনাকে দেখাবেন। দয়া করে বাবাকে বিশ্বাস করান যে, সবই আগের মতোই রয়েছে। সামান্য সন্দেহ দেখা দিলেই বাঁচবেন না বাবা আর। হয়তো তার উপর অবিচার করেছি আমরা, কিন্তু কোন উপায় ছিল না বলেই। তাছাড়া আমাদেরকে তো বেঁচে থাকতে হবে। আমার বোনের চার শিশুর জীবনের মুল্য কতগুলো ছাপা কাগজের মূল্যের চেয়ে নিশ্চয়ই বেশী। ... এ পর্যন্ত তার কোন আনন্দকেই ধ্বংস করিনি আমরা। প্রতি বিকেলে তিন ঘন্টা পাতার পর পাতা উল্টিয়ে, প্রতিটি ছবিকে মানুষ ভেবে কথা বলে উনি তো আনন্দেই আছেন। আর আজ ... আজ হয়তো তাঁর সবচেয়ে আনন্দের দিন হতে পারতো। বহু বছরের অপেক্ষা তাঁর, সত্যিকারের এক বিশারদকে তার সংগ্রহ দেখানোর। ..আপনাকে হাত জোড় করে অনুরোধ জানাচ্ছি, তাঁর এই আনন্দ ধ্বংস করবেন না।
মেয়েটির কথা আমার ভেতরে এমন অলোড়ন তুললো, তা আপনাকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। ব্যাবসায়ী হিসেবে এ ধরণের বিধ্বংসী ঠকবাজীর ঘটনা আমরা যথেষ্ট দেখেছি, যেখানে এই অর্থনৈতিক মন্দায় অনেককেই সর্বশান্ত হতে হয়েছ, তাদের সারা জীবনের মূল্যবান সম্পদ পেটেভাতের বিনিময়ে বিকিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভাগ্যের এই নিদারুন পরিহাস আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করলো। স্বাভাবিকভাবেই আমি বিষয়টি গোপন ও আমার সাধ্যমতো যা করার করবো বলে কথা দিলাম।
দু'জনে একসাথেই বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। পথে আরো বিশদ জেনে আরো তিক্ত হলো মন। জানলাম কি সামান্য পয়সার বিনিময়ে এই সহজ সরল মহিলাদের এতোটা নিদারুণভাবে ঠকানো হয়েছে। তাতে তাদেরকে আমার সব ক্ষমতা দিয়ে সাহায়্য করার সিদ্ধান্ত আরো দৃঢ় হলো। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে দরজার কাছে যেতেই আমরা সেই খনখনে কিন্তু আনন্দমাখা গলায় শুনতে পেলাম,
- আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন।
একজন অন্ধের সুক্ষ শ্রবনশক্তির প্রভাবে উনি আমাদের পায়ের শব্দ শিড়িতেই শুনে থাকবেন।
- আপনাকে তার সংগ্রহ দেখাতে হেরাওয়ার্থ আজ এতোটা অধৈর্য যে, দুপুরে ঘুমোতেই পারে নি।
বললেন বৃদ্ধা একগাল হেসে। এরই মাঝে মেয়ের সাথে একবার দৃঘ্টিবিনিময়েই আমার সম্মতির কথা জেনে নিয়েছেন। টেবিলে উপর এলবামগুলো প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। অন্ধ ভদ্রলোকের হাতটি ধরতেই নতুন কোন সম্ভাষন না জানিয়ে চেপে আমাকে একটি সোফায় বসিয়ে দিলেন।
- ঠিক আছে, আমদেরকে এক্ষুনিই শুরু করতে হবে। অনেক দেখার আছে, বার্লিনের ভদ্রলোকদের তো আবার সময় খুবই কম। এই যে প্রথম এলবামটি দেখতে পাচ্ছেন, এটি ড়্যুরারের। এ সংগ্রহ যে প্রায় সম্পূর্ন, তা দেখার পরই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। প্রতিটি ছাপই একটি আরেকটি চেয়ে সুন্দর। আপনি নিজেই দেখুন,
বলেই প্রথম পাতাটি খুললেন তিনি। শিরোনাম 'বড় ঘোড়া'।
চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


