


প্রাচীন বাংলার নারী সমাজঃ ৬৫০-১২০০ খ্রিঃ পাল ও সেন যুগ
প্রাচীন বাংলার নারীকে বুঝতে হলে ২টা স্তর ভাবতে হবে।
১) আদিম কৌমগত /অনার্য সমাজ
২) আর্য -ব্রাম্ভন্ন সমাজ
দুটোই পাশাপাশি চলত ,দ্বন্দ্বও হত ।
আদিম কৌমগত সমাজের নারী স্বাধীন ,শক্তিশালী ।
পাল যুগের আগে বাংলা ছিল অস্ট্রিক -দ্রাবিড় -মঙ্গল গোষ্ঠীর, এখানে নারীই ছিল কেন্দ্রে। প্রমাণ পাই চর্যাপদ ,লোকগান আর নৃতত্ত্ব থেকে ।
উদাহরন দেই
অর্থনীতিঃ
তাদের অবস্থাঃ স্বাধীন ভাবে উপার্জন করতো হাটে
যেতো ,মদ বেচত , তাঁত বুনত,নৌকা বাইত । এমনকি শিকার আর কৃষি কাজও করতো ।আবার স্বামী পুত্র কন্যা পরিজনদের সেবাও করত ।
কবি শরণের শ্লোকে দেখা যায়
"হাটের কাজ শেষ করে দ্রুত হেঁটে গৃহে ফিরছে রমণী,দ্রুত হাঁটার জন্য আঁচল সরে যাচ্ছে আবার তা দ্রুত টেনে নিয়ে আসছে । আর কেনা বেচার হিসেব গুনছে আঙ্গুলে" ।
উদাহরন চর্যা পদ থেকেঃ
"টালে টালে মোর ঘর ,হাঁড়িতে ভাত নাহি "
ভুসুক পাদ,
ঘর সামলানো কাজ না ,সেও সাধিকা। "হাঁট বিকায় ডোম্বি" - ডোমনী মেয়ে হাটে মদ বেচে ।
সামাজিক অবস্থানঃ
মাতৃ তান্ত্রিক ,গোষ্ঠীর নাম, সম্পত্তি মায়র দিক থেকে এবং মেয়ে বিয়ের পরে স্বামীর বাড়ি যাবে - এই নিয়ম ছিল না।
"শবর পাদের পদঃ "উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই শবরী বালী " । শবরী মেয়ে পাহাড়ে একা থাকে,শিকার করে, পুরুষের অধীন নয় ।
যৌন স্বাধীনতাঃ
বিয়ের আগে -পরে প্রেম স্বাভাবিক ছিল। "সতীত্ব" নিয়ে আজকের মতো গোঁড়ামি ছিল না। সহজিয়া সাধনায় নারী- পুরুষ এক সাথে সাধনা করত।
উদাহরনঃ "ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ" অর্থাৎ ডোমনীকে ডেকে বলছে 'তোমার ঘরেই যাব" । কাহ্নপাদ ডোমেনীর সাথে প্রেম-সাধনা করে।
ধর্মঃ
দেবী প্রধান । চন্ডী ,মনসা,শীতলা _সব মেয়ে দেবতা । তন্ত্র সাধনায় নারী গুরু হত । এটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিরাট ব্যাপার ।
"ছিন মস্তা" - ছিন্নমস্তা দেবী নিজের মাথা কেটে রক্ত খাওয়ানর দৃশ্য । নারী শক্তির ভয়ঙ্কর রূপ ।
শিক্ষাঃ
অনেক নারী সিদ্ধা/যোগিনী ছিল। গান বাঁধত এবং শাস্ত্র জানত ।
চর্যার ২৩ জন সিদ্ধার মধ্যে কয়েকজন নারী ছিল বলে মত আছে ।
অপরদিকে দেখা যায় আর্য -ব্রাম্ভন্য সমাজের নারীর অবস্থা নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ ।
গুপ্ত -সেন যুগে উত্তর ভারত থেকে ব্রাম্ভন্য সংস্কৃতি আসে মনু স্মৃতি পুরাণ চালু হয় ।
"লক্ষ্মীর মতো কল্যাণী, বসুধার মতো সর্বং সহা,
স্বামীব্রত নিরতা" ।
পুরুষরা এক জন নারীর কাছ থেকে এই রকম নারীত্ব আশা করতো । যা আজও চলমান। পুরুষের এই চাওয়া ক্রমাগত ভাবে বিভন্ন স্থানে বারে বারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।
নারীকে শেখানো হত অল্প বয়স থেকে , কি ভাবে শ্বশুর বাড়ি তে সব কিছু মেনে চলতে হবে এবং যতো অত্যাচার করা হোক তা মাথা নত করে মেনে নিতে হবে । কারন সেটাই তার আশ্রয় ।
যেহেতু ভালো নারীর উদাহরণ "সর্ব সহা" তাই ভালো নারী প্রমাণ করার জন্য বা সবার কাছে ভালো নারী বা কূল বধূ প্রমাণ করতে একজন নারী ব্রাম্ভন্য সংস্কৃতি অনুযায়ী সব অত্যাচার মেনে চলতো।
অন্যায় কে অন্যায় বলার অধিকার ছিলনা। মুখ ফুটে তার বলার স্থানও ছিলনা।
সব কিছু চেপে দিন পার করতো উদ্দেশ্য স্বামী কে খুশি রাখা কারন সে দেবতা। এবং সংসার টিকিয়ে রাখা। তা ছাড়া বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার অধিকার ছিলনা ।
"মৃদুভাষীণহনুরাগবত্ত্যে মুদ্ধেঙ্গেশচগৌড়" এই উক্তিটি পাওয়া যায় তৃতীয় চতুর্থ শতকের বাৎস্যায়নের কামসূত্রে ।
অর্থাৎ সেই নারীই উত্তম যে কিনা
"মৃদু ভাষিণী,অনুরাগবতী এবং কোমলাঙ্গি" ।নারীর কাছ থেকে, পুরুষের এই সব আদর্শ কামনা বাসনা বার বার ব্যাক্ত করা হয়েছে লিপির পর লিপিতে । বীর আর গুনি পুত্র প্রসবিনী নারী প্রকৃত নারী। সেবা পরায়না, দেবী তুল্য, গুণাবলীর অধিকারী নারী আদর্শ নারী।
দেখা যাক তাদের কোন বিষয়ে কেমন অবস্থা ছিল ।
অর্থনীতিঃ
পরনির্ভর ।সম্পত্তির অধিকার নাই। 'পিতা রক্ষতি কৌমারে" । একজন নারী সারা জীবন একজন পুরুষের আন্ডারে থাকবে এবং পুরুষ নারীকে পালবে । শিশু বয়সে বাবা, তারপরে স্বামী এবং বৃদ্ধ বয়সে পুত্র ।
প্রমাণঃ সেন যুগের দলিলে মেয়ের জমি নাই।
বিবাহঃ
বাল্য বিবাহ শুরু । ৮ বছরে "গৌরিদান" পুণ্য । বহু বিবাহ, কুলীন প্রথা চালু। স্বামী কে দেবতা মানতে হবে।
১১ শ শতকে 'বল্লাল চরিতে" কুলীন প্রথার উল্লেখ ।
সতীত্ব ও পর্দাঃ
সতীত্বই সব । বিধবা হলে সাদা থান,মাছ,মাংস বন্ধ । সতীদাহ প্রথা শুরু হয় ।
প্রমাণঃ ১২শ শতকের শিলালিপি তে সতীদাহের প্রথম উল্লেখ বাংলায় ।
শিক্ষাঃ
মেয়েদের লেখাপড়া নিষেধ । 'নারী নরকের দ্বার ' - শাস্ত্রে লেখা হল ।
প্রমাণঃ জয়দেবের গীতগোবিন্দে "রাধা প্রেমিকা ,কিন্তু পণ্ডিত না" ।
ধর্মঃ
দেবী থাকলেও পুরুষ দেবতা বড় । লক্ষ্মী সরস্বতী হল "বিষ্ণুর স্ত্রী" ,"ব্রম্ভার" মেয়ে । নিজের ক্ষমতা কম।
প্রমাণঃ মঙ্গল কাব্যে দেখা যায় -বেহুলা স্বামী বাঁচায় ,কিন্তু স্বামীর পায়ে পড়ে ।
পারিবারিক জীবনঃ
পারিবারিক জীবনে নারীকে যৌথ পরিবারে থাকতে হত ।সেখানে পুরুষ- ই ছিল প্রধান। মাতার গুরুত্ব বেশি কিন্তু পুরুষের ক্ষমতা বেশি ছিল ।
অর্থাৎ পারিবারিক জীবনে পুরুষকে মুল্যয়ান করা হত বেশি । তার মতামতের দাম নারীর চেয়ে গুরুত্তপুর্ন ছিল বেশি ।পুরুষের সিদ্ধান্তে সংসার চলতো । নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না।
নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির সম্পর্ক "পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার" সঙ্গেঃ
পুত্র সন্তান হীন নারীর মর্যাদা ছিল না। তাই একটা পুত্রের জন্য একজন নারী কে বারে বারে গর্ভধারন করতে হত । যত দিন একটি নারী একটি পুত্র জন্ম দিতে না পারতো ততদিন সেই মেয়েটি গর্ভধারণ করার হাত থেকে নিস্তার পেত না।
এই ভাবে দেখা যেত এক জন নারী আট /নয় টি মেয়ে সন্তানের মা হয়ে গেছে শুধু মাত্র একটি ছেলের আশায় । এই ছিল মেয়ে হয়ে জন্মানর পরিণাম।
সমাজে বন্ধ্যা নারী, স্বামী ছাড়া নারী, অবিবাহিত নারী, তালাক প্রাপ্ত নারী এবং বিধবা নারীর কোনো সন্মান ছিল না।
উদাহরণ
বিয়ে বা অনেক অনুষ্ঠানে শুধু মাত্র সধবা নারী উপস্থিত থাকতে পারবে । বিধবা বা তালাক প্রাপ্ত নারীর উপস্থিতি অমঙ্গল ভাবে ধরা হত ।
যৌথ পরিবার এবং নারীর জটিল সম্পর্কঃ
যৌথ পরিবারে বিবাহিত নারীকে পরিবারের জটিল সম্পর্কের ভিতরে নিজের জীবন কে অতিবাহিত করতে
হত । নানা রকমের জটিল সম্পর্ক অর্থাৎ কোনো সময় শাশুড়ি ছেলের বৌ কে শারীরিক বা মানসিক ভাবে অত্যাচার করত আবার কোনো সময় ছেলের বৌ শাশুড়িকে মানসিক ভাবে অত্যাচার করত । এক জন পুরুষকে এই সম্পর্কের মধ্যে পড়তে হত না যা ছিল শুধু মাত্র নারীর জীবনে।
স্ত্রী গ্রহণঃ
এক স্ত্রী থাকা সুখি পরিবারের আদর্শ । এটাই ছিল স্বীকৃত । যা লেখা আছে ৩য় বিগ্রহ পালের আমগাছি লিপিতে । তবে অভিজাত সমাজ,ধনী ব্রাম্ভন,রাজা রাজড়া এবং সামন্ত মহা সামন্ত দের মধ্যে বহু বিবাহ প্রচলন ছিল ।
সম্পদে নারীর অধিকারঃ
একজন নারী স্বামীর মৃত্যু হলে সে স্বামীর সম্পত্তির অধিকার হত বটে কিন্তু তা বিক্রি করতে বা বন্ধক দিতে পারত না।
তাকে আ-মৃত্যু সেই পরিবারেই থাকতে হবে । চলে যেতে চাইলে সম্পত্তি নিয়ে যেতে পারতো না।
এই ভাবে দেখা যায় একজন নারী সারা জীবন পুরুষের নিয়ন্ত্রণেই জীবন অতিবাহিত করত এবং তাদের করা আইন দ্বারা নারীকে চলতে বাধ্য হতো ।
নারী পিতার সম্পত্তিরও কোনো অংশী দার হতো না অর্থাৎ সম্পদে নারীর অধিকার ছিল সীমিত ।
বিভিন্ন সামাজিক প্রথাঃ
নানা রকমের প্রথা চালু ছিল প্রাচীন বাংলায় । সেসব প্রথা দিয়ে নারীর জীবন ছিল জর্জরিত ।সেগুলো থেকে বের হওয়া সহজ ছিল না।
যেমন
কঠোর পর্দা প্রথাঃ
এক জন নারীকে সারা জীবন চার দেয়ালের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হতো । যাকে বলা হয় "অসূর্যস্পর্সা" । জরুরী কারনে বের হতে হলে ঘোমটা বা আবরণ দিয়ে ঢেকে তাকে বের হতে হবে। যেন কোনো পুরুষ তার মুখ দেখতে না পারে ।
এই পর্দাপ্রথা মেনে চলা নারীকে "কুলীন বা ভদ্র পরিবারের মেয়ে" বলে আখ্যা দেওয়া হতো। গাড়ি বা পালকি বা যে কোনো বাহনে নারী কে বহন করা হতো সম্পুর্ন ভাবে কাপড় দিয়ে ঢেকে পর্দা করে। এই প্রথা মানা হতো শহরের বিত্তবান আর মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে ।
গ্রামীণ সমাজ এই সব প্রথার ধার ধারতো না। এবং তা মানতও না বা গুরুত্ব দিত না ।
বৈবাহিক ক্ষেত্রে নারীঃ
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। পরিবারের সিদ্ধান্তই তাকে মেনে চলতে হতো ।
অর্থাৎ বিয়ের ব্যাপারে মহিলাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। প্রতিবাদের ক্ষমতাও ছিল না।
কন্যাদের বিয়ের সময়ে বড় অংকের যৌতুক দিতে হত। যৌতুক দিতে না পারলে কন্যাকে নানা ভাবে অত্যাচার করা হতো । এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদ হতো যৌতুক না দিতে পারলে।
বিধবা বিবাহের প্রচলন ছিল নাঃ
এক জন পুরুষ বিপত্নীক হলে পুনরায় বিয়ে করতে
পারতো ।যতই তার বয়স হক না কেন ।
কিন্তু একজন নারী অল্প বয়সে বিধবা হলেও সারা জীবন কঠোর বৈধব্যের আইন মেনে তাকে জীবন পাড়ি দিতে হতো ।
বিলাসিতা বর্জন করে সাদা থান কাপড় পরে দিন কাটাতে হতো ,হাতের চুড়ি, গায়ের গয়না সব খুলে নেওয়া হতো। মাছ মাংস বর্জন করে নিরামিষ খেয়ে কঠোর সংযমের মধ্যে দিয়ে দিন পার করতে হতো।
বাল্য বিয়ের ছড়াছড়িঃ
মেয়ে শিশুর বাল্যকাল খুবই সংক্ষেপ ছিল। তার খেলার বয়স পার হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হতো ।
৯,১০ বছর বয়সে ছোটো শিশু কে জোর পূর্বক বিয়ের মত বিরাট দায়িত্ব পুর্ন একটা ব্যাপারে কিছু বোঝার আগেই প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হতো ।
যা তার নিজের ইচ্ছাই হতো না । পরিবার আর সমাজের করা প্রচলিত নিয়মের জন্য একটা মেয়ে শিশু কে এই কঠিন জীবনে প্রবেশ করতে হতো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ে শিশুটির বয়সের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের পুরুষকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হতো । অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারন একটা সাধারণ বিষয় ছিল। প্রসব জনিত জটিল ব্যাপারে শিশু মায়ের মৃত্যু হার উচ্চ ছিল ।
সব কিছুর পেছনে উদ্দেশ্য মেয়েকে গৃহপালিত করাঃ
পিতার গৃহ থেকেই শিক্ষা দেওয়া শুরু হতো 'বিয়েই একটি মেয়ের জীবনের আসল উদ্দেশ্য ,লেখাপড়া নয়' । স্বামীকে মেনে চলতে হবে ইত্যাদি । যেহেতু স্বামী দেবতা তাই তার সেবা করা মানে দেবতাকে পাওয়া ।
সহমরণ (সতীদাহ প্রথাঃ)
স্বামী বিয়োগ ছিল সবচেয়ে দুঃখ জনক অবস্থা মেয়েদের জন্য। কারন একটা মেয়েকে জোর করে আগুনের চিতায় ঠেলে দেওয়া হতো । ধর্মের দোহায় দিয়ে বলা হতো পরকালে সহমরণে স্বর্গ পাওয়া যায় এবং সেই স্বামীর সাথেই জীবন কাটা যাবে মৃত্যু বরন করলে। উদ্দেশ্য সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া।
মেয়েদের দুঃখ কষ্ট শুনার কেউ ছিলনা। স্বামীর ঘরে অত্যাচার থাকলেও মুখ বুজে তা মেনে নিতে হতো। কারন তার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিলনা। এথেকে বের হওয়ার পথ ছিল না।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




