somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত সৈয়দ মুজতবা আলী ।

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ আমাদের সবার প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের এদিনে তিনি ইহলোক-পরলোক দুইলোকের অতীত হয়ে যান।
আমরা সবাই তাঁকে গল্পকার, প্রাবন্ধিক হিসেবে জানি কিন্তু ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার কথা কয়জনে জানি?

ভারতবিভাগের মাত্র কিছুদিন পরে ১৯৪৭ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান। রক্ষণশীল সিলটীরা তাঁকে দমাতে পারেনি, তিনঘন্টা ধরে বক্তৃতা দিয়ে তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন।

রাজনীতিও এরজন্যে দায়ী, ততকালীন আসামের অন্তর্ভূক্ত সিলেটীরা পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে চেয়েও পারেনি, কিছু অংশ (করিমগন্জ )ভারতে চলে যায়। যাদের পরিবার ভাগ হয়েছে তারা খুবই ক্ষুব্ধ ছিল, ঐরকম পরিবেশে মুজতবা বাংলাকে একমাত্র ভাষা করার কথা বলেছেন। তিনি এও বলেছেন উর্দূ আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলে শুধু ভাষার কারণেই ওরা আমাদের শোষণ করবে।

বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রীধারী, বিশ্বপর্যটক মুজতবা তুলে ধরেছেন দুনিয়ার সব জায়গায় মায়ের ভাষাতেই মানুষ সবচেয়ে ভালভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। তিনি আরবদের উদাহরণ দেখিয়েছেন, তুরষ্ক এবং ইরান জয় করেও তারা তাদের উপর আরবী চাপিয়ে দিতে পারেনি, তেমনি মুঘলরা আমাদের উপর ফারসী চাপিয়ে দিতে পারেনি। শেষে তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করেন উর্দূ যদি চাপিয়ে দেয়াও হয় তাহলে আমাদের জন গণ সেটা মেনে নিবে না এবং পাকিস্তান ভেঙে যাবে।

সেই সভার পরে তিনি কলকাতা চলে যান এবং চতুরঙ্গ পত্রিকায় তার বক্তৃতার পুরোভাষ্য ছাপান। কিন্তু গল্প সেখানে শেষ হয় নাই, সিলেটে যেটা শুরু হয়েছে , তার শেষ হয়েছে বগুড়ায়। '৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর তাঁকে বগুড়ার সাহিত্য সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়, এতে তিনি দুটো বক্তৃতা দেন, এতে আজীজুল হক কলেজের ছাত্র এবং কিছু শিক্ষক তাঁর জ্ঞানমুগ্ধ হয়ে তাঁকে কলজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানান।

মুজতবা কলকাতার সাহিত্য সঙ্গ ছেড়ে ছোট্ট শহর বগুড়ায় আসতে চাননি।
কিন্তু কিছু ছাত্র এবং শিক্ষক কলকাতা গিয়ে তাঁকে বগুড়ায় আনতে রাজী করান। ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে তিনি কলেজের দায়িত্ব নেন । সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাময় , স্হানীয় ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনের জড়াচ্ছিল। বগুড়ার রক্ষণশীল সমাজ কিন্তু তাঁকে ভালভাবে নেয়নি এবং তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

এর কিছুদিন পরে কলেজের বাতসরিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হল, কিছু ছাত্র এতে ঢাকায় পুলিশের নিপীড়ণের বিরুদ্ধে লিখেছিল। ম্যাগাজিনের সবকিছুই মুজতবা দায়িত্ব নেয়ার আগেই স্হির হয়েছিল, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে 'পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের উস্কানি'র অভিযোগ আনা হল। ম্যাগাজিনের সব কপি ধ্বংস এবং বাজেয়াপ্ত করা হল। ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু তাকেই নয় তার ভাইকেও এর সাথে জড়াতে চাইল, গ্রেফতার এড়াতে তিনি কলেজে যোগদানের মাত্র সাতমাস পরে কলকাতা ফিরে যান ।

ভাষা আন্দোলনের পরে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃরতি দেয়া হলে মুজতবা তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা ছাপানোর অনুমতি পান।প্রথমে আল-ইসলাহ পত্রিকায় পরে ' পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' নামে পুস্তিকা বের করেন।
(একুশে পাবলিকেশান্স ২০০২ সালে এটি পূনঃপ্রকাশ করে)

ছোটবেলা থেকেই মুজতবা বিদ্রোহী ছিলেন। ১৯২১ সালে সিলেটের ইংরেজ কমিশনারের বাগান থেকে স্বরস্বতী পূজার জন্যে ফুল চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়েন। এতে তাকে বেতিয়ে শাস্তি দেয়া হয়, ঠিক তখুনি আবার খেলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয় মুজতবা স্কুলে ধর্মঘট ডাকেন।

পরিস্হিতি সামলাতে ব্রিটিশ সরকার অভিভাবকদের উপর চাপ প্রয়োগ করেন, স্পেশালি মুজতবার পরিবার, কারণ তার বাবা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার। অত্যাচারী ইংরেজের স্কুলে যেতে মুজতবা অস্বীকার করেন। এর কিছুদিন আগে মুরারীচাঁদ কলেজে কবিগুরু তাঁর 'আকাঙ্খা' বিষয়ক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে গেছেন । মুজতবা জানত তিনি একটা স্কুল খুলছেন তাই তাঁর কাছে চিঠি লিখলেন, কবিগুরু তাঁকে সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন, মুজতবা গেল শান্তিনিকেতন।

বিশ্বভারতী থেকে পাঠ সমাপন করে মুজতবা জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্যে বৃত্তি খুঁজতে লাগলেন এবং পিএইচডির জন্যে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। তাঁকে এরজন্যে জার্মান শিখতে হল, ইচ্ছা করেল তিনি ইংলন্ড যেতে পারতেন কিন্তু কখনও তিনি সেখানে পড়তে যেতে চাননি।


আমাদের কালে মুজতবার মত মানুষ আসলেই ক্ষণজন্মা। আজীবন বাঙালি মুজতবা বেহেশতের বর্ণনায় সর্ষে ইলিশ না থাকায় কখনও ওখানে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেননি। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে তিনিও আমাদের ভাষার স্বর্গে বেঁচে থাকবেন।

Click This Link

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ৩:১০
৭টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×