------------------------------------------------------
আক্রমনটা কোন দিক থেকে আসবে বুঝতে পারছিনা, বেশ ভয় ভয় লাগছে। রাত এখন তিনটা। এমন নিশুতি রাতে, সব চুপচাপ, কেবল শোনা যাচ্ছে আমার ঘড়ির একটানা টিক্ টিক্ শব্দ। সমস্ত স্নায়ু উত্তেজিত, বুঝতে পারছি খুব তাড়াতাড়িই আক্রমনটা হবে, কিন্তু কোন দিক থেকে? অন্ধকারে নিজেকে ঢেকে এগুতে থাকি, সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ। একটা ঠক্ ঠক্ আওয়াজ শোনা গেলো না? হাঁ, তারা আসছে, এইদিকেই আসছে। রক্তজল করা তীক্ষ্ণ চিৎকার দূর থেকে ভেসে আসলো, তারা এসে গেছে। নিশ্চিত তারা এইদিকেই আসছে। সমস্ত জগৎ ভুলে আমি মনোনিবেশ করলাম আমার পরবর্তী স্ট্রাটেজি ঠিক করতে। এই আক্রমনটা প্রতিহত করতেই হবে, নইলে...। নাহ্, আর ভাবতে চাইনা। যেকোন মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে চূড়ান্ত ঘটনাটা, আমাকে প্রস্তুত থাকতেই হবে...।আমার হাতের আঙ্গুলগুলো শক্ত হয়ে এসেছে উত্তেজনায় আর বিন্দু বিন্দু ঘাম হয়তোবা দেখা দিয়েছে কপালে।আমার মস্তিস্কের সমস্ত যোগাযোগ এখন আঙ্গুলের ডগার সাথে। এইটাই ঠিক সময়, দেহের প্রতিটি কোষে অনুভব করছি আসন্ন আক্রমনের বিপদ। আর, দেরি করা ঠিক হবে না, ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এখুনি, নইলে ঝাঁঝরা হয়ে যাব শত্রুর তাক্ করা অসংখ্য গুলির আঘাতে। নিজেকে শেষবারের মত প্রস্তুত করে নিই আমি, মানসিকভাবে তৈরি শত্রুদের গুঁড়িয়ে দিতে। মাউসের ডান বাটনে শুধুমাত্র একটা চাপ আর...।হঠাৎ বিশ্রী তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজে আমার সব মনোযোগ যেন কেন্দ্র থেকে সরে গেল। অসংখ্য বুলেট নির্বুদ্ধিতার সুযোগে আমাকে মেরে রেখে দিল কয়েক হাজারবার।
শালার মাউসটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছা হল।
নাহ্ , এখনো বেজে যাচ্ছে ঐ তীক্ষ্ণ সাইরেনটা, অসহ্য, একটা আছাড় দিয়ে মোবাইলটা ভেঙ্গে দিতে চাইলাম। কিন্তু ভাঙলাম না, আরেকটা যে কিনবো সেই টাকাই বা কোথায় আমার? ঘুরে ফিরে তো সেই বাপের কাছ থেকেই নিতে হবে। হেল, আশেপাশের সবকিছু যেনো জাহান্নামের আগুনে...।কবে যে আর পাশ করে বের হব? ধুস্ , শালা এইসব চিন্তা এখন কেন মাথায় আসছে! শালার লেভেলটাই পার করতে দিলো না, আর সময় পায় নাই মেসেজ পাঠাবার। ব্যাটা গন্ডমূর্খ...।যাহ্ , মেসেজটাই আর পড়বোনা। পড়ে থাক্, পড়ে থেকে মর্ তুই...।
চেয়ার থেকে উঠে জগ থেকে একগ্লাস পানি খেলাম; টেবিলের উপর বই-পত্র ছড়ানো ছিটানো। হাসি পেলো নিজেরই অজান্তে, এর নামই তাহলে পড়ালেখা! এতোক্ষন ধরে বসে থেকে বাথরুমের বেগটাও ধরতে পারি নাই ঠিকমত। এখন মনে হচ্ছে ব্লাডার ফেটে মারা যাবো। ওহ্ , অসহ্য! বাথরুমে বসে ছর্ছর্ করে একগাদা মূত্র ত্যাগ করতে করতে মাথাটা একটু ঠান্ডা হল। উঠে গিয়ে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপ্টা দিতে দিতে মেসেজটা পড়বো বলে ঠিক করলাম। ঘরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। বাইরে একফোঁটা বাতাস নাই, অসস্তিকর ভ্যাপসা ধরনের একটা গরম। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফ্যানের একদম নিচে এসে বসলাম। দুইটা নতুন মেসেজ এসেছে। প্রথমটা পড়ে হঠাৎ সবকিছু কেমন যেনো অন্ধকার হয়ে আসলো। নিজেকে খুব নিকৃষ্ট কোন জানোয়ার বলে মনে হল। মনে হয় নর্দমার কীটও আমার থেকে ভাল।
আবার মেসেজটা দেখি, বিশ্বাস হতে চাই না যা দেখলাম-
“দোস্ত, মেসেজটা পড়ে ভেঙ্গে পড়বিনা কিন্তু। অস্থির হবি না। তোকেই সবার প্রথমে দিচ্ছি। আমি বোধহয় আর বাঁচবো না রে...।এইডস আমার শরীরে।আমি মারা যাচ্ছি রে, তোদের সাথে আর থাকবোনা ভাবতেই মনটা যেনো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যথা মরে যাবার থেকেও তীব্র ব্যথা। তোদের দেখবো না, হাসবো না, খেলবো না-কিভাবে পারবো আমি-বল্ তুই! কিভাবে পারবো আমি মরে যেতে তোদেরকে একা রেখে”।
শরীরের ভিতরে কি যেনো হয়ে গেল। অসহ্য, দুঃসহ একটা ব্যথা দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে আঁটকে থেকে গেল। কাঁদবো, কিন্তু কিভাবে? দুর্বিষহ যন্ত্রনাটা যেনো হৃদয়টাকে ধরে ইচ্ছেমত পাঁক দিচ্ছে, কিন্তু কাঁদবার ঠিক আগপর্যন্ত। একটা শূন্যতা যেন ঘিরে ধরেছে আমার চারপাশ। চোখের সামনে সিনেমার রিলের মত ভেসে চলে যাচ্ছে অসংখ্য স্মৃতি, আমার, আজাদের...আমাদের। ভিতর থেকে কান্নার জোয়ার উঠে এসেও যেন হারিয়ে যাচ্ছে, এক মহাতোলপাড়ে অসহ্য যন্ত্রনাটা যেন ফুঁলে-ফেঁপে আরও বিশাল হয়ে দমটাই আঁটকে দিতে চাচ্ছে। কোনোমতে কাঁপা হাতে ২য় মেসেজটা খুললাম। চোখের দু’কোণ দিয়ে অশ্রু নেমে আসলো আর কোনো কারণ ছাড়াই। এত অসহায়, এত ঠুনকো মনে হলো নিজেকে যে ঘৃনা করেতেও ভুলে গেলাম।
মেসেজটা চোখের সামনে ধরে বারবার পরলাম আমি,
“দোস্ত, বড় বাঁচতে ইচ্ছা করে যে! এতদিন বুঝিনি বাঁচা কাকে বলে? জীবনের স্বাদ কি? এখন যে বুঝি, শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে বুঝি যে, আমি জীবনকে কতটা ভালোবাসি!স্বার্থপরেরমত শোনালো, নাহ্ রে! কিন্তু আমি কি আর জানতাম নিজেকে এতটাই ভালোবাসি! জানতাম বাবা-মা, ভাই-বোন, তোদেরকে এত ভালোবাসি আর মুন্নিকে...।দোস্ত, কিভাবে বলবো ওকে, তুই আমাকে বলে দে। আমি যে ওকে ছেড়ে কোনদিনিই বাঁচতে চাইনিরে।আমি বাঁচতে চাইরে, পৃথিবীটাতেই বাঁচতে চাই। দোস্তরে, আমি চলে যাচ্ছি দূরে...। আমি বাঁচবো, কিন্তু কিভাবে”?
আর পারছিনা, এ শূন্যতা ঢাকার কোন শক্তিই আমার নাই। কিভাবে এটা হল, কেনইবা হল? ওহ্ , খোদা! এতটা দয়াহীন না হলে কি তোমার চলতো না! কেন তুমি কেড়ে নিবে আজাদকে, আমাদের আজাদকে। উফ্, কেউ আমার চারপাশটা অন্ধকার করে দাও। আমি আর আলোতে থাকতে চাইনা। অসহ্য, এই আলো অসহ্য, মেকি আর ভন্ডামিতে ভরা। যাদের চলে যাওয়া উচিত, তারাতো দিব্যি বেচেঁই আছে, আর কিনা আজাদকে চলে যেতে হবে-এ কেমন অন্যায় বিচার। আঁধারের চাদরে আমি মুড়ে রাখতে চাই নিজেকে, আমার কান্নাটুকুও তোমার প্রাপ্য নয়...কোনকিছুই না।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






