---------------------------------------------------------
আজাদের সাথে আমার পরিচয় কলেজ থেকে। দারুন ফূর্তিবাজ একটা ছেলে, আবার পড়ালেখাতেও যথেষ্ট ভাল। ও ছিল এমন এক ছেলে যে, কি ক্লাস, কি খেলার মাঠ, কি এক্সট্রা- কারিকুলার কর্মকান্ড, সবকিছুতেই অবাধ চলাফেরাতে ছিল অভ্যস্ত। সবখানেই যে ভাল করছে তা নয় কিন্তু যেকোন ভাবেই হোক অংশগ্রহন যেন তাকে করতেই হবে, এ যেন অনেকটা স্ব-আরোপিত নির্দেশ। আর ভলান্টারি কাজে ওর আগ্রহতো ছিল সীমাহীন। কলেজ থেকে দেখলেও আজকের মত এরকম ঘনিষ্টতা কিন্তু তখন হয়নি। এই একটু, আধটু কথাবার্তা, বেশিরভাগই গা-বাঁচানো, আন্তরিক নয়। সবখানেতেই আছে বলে, ওর সবার সাথে কিছু না কিছু পরিচয় আছে। তাকে আমারা বরাবরই ঈর্ষা করতাম। এর মূল কারণ ছিল ওর সাবলীলতা, সহজ আচরণ আর সত্যি বলার সহজাত ইচ্ছা। কোনকিছু গোপন করা ওর সইতোনা। যাকে যেটা বলতে হবে সেটাই বলতো। তবে তার আচরণকে উদ্ধত কিন্তু কোনভাবেই বলা যাবে না; কথা বলার তার একটা নিজের ভঙ্গি ছিল, বেশ চমৎকার একটা ধরণ, মেকিত্বহীন, সহজ-সরল। আমাদের নিজেদের নিজেদের বন্ধু নিয়ে দলের মত থাকলেও, ও যেন সবারই বন্ধু হতে চাইতো। এমন উদ্যমী ছেলেদের যা হয়, ওর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না অর্থাৎ স্যারদের সুনজরে ও সবসময়ই ছিল। তাই আমরা ওকে ঈর্ষাই করতাম। ওর সহজ আচরণ আমাদের কাছে ছিল একধরণের তোষামুদি, পা-চাটা স্বভাবের সমার্থক। কিন্তু এটা ভেবেও যে শান্তি পাব তারও কোনো উপায় ছিল না- কেননা ভিতরের সত্যটা জানা থাকায় যতই মিথ্যার ফুলঝুড়ি ছোটানো হোক না কেন- সবসময় একটা অস্বস্তিকর ঈর্ষা বয়ে বেড়াতে হয়েছে। তাই ও সবাইকে বন্ধু ভাবলেও আসলে ওর কোনো প্রকৃত বন্ধু ছিলনা, সবাই সবার কাজের সময়টুকুতেই খালি বন্ধু, বাকি সময় ওকে যেন পাত্তাই দিতে চাইতোনা।
ওকে যে এভাবে পাশ কাটানো হতো- সেটা বোধহয় ওর বোঝার সাধ্যের বাইরে ছিল, নতুবা কিভাবে ও সবার সাথে এমন ব্যবহার কিভাবে করতো? পরে অবশ্য ওর প্রখর চিন্তাশক্তি আর পর্যবেক্ষন ক্ষমতার পরিচয় পেয়েছিলাম। জেনেছিলাম ওর জীবনবোধ আর বুঝেছিলাম- ও সবই বুঝতো, কিন্তু ওর বিশ্বাস ছিল অন্য জায়গায়। ও বলতো, যত ঘৃণা আর ঈর্ষাই থাকুক না কেন, শুধু একবুক নিখাঁদ ভালবাসাই পারে তার চাদরের তলে মিষ্টি কুসুম উষ্ণতায় এসবকে এক নদী নতুন ভালবাসাই পরিণত করতে।
আজাদ ছিল মনে-প্রানে এক চরম আশাবাদী ছেলে। আমরা যারা অল্পতেই হতাশ হয়ে যাই, দমে যাই, বিফল হয়ে উদ্যমী হতে ভুলে যাই, তাদের ঠিক উলটো। যত যা কিছুই হোক না কেন, সে মনে-প্রানে যা বিশ্বাস করতো, তাকে শক্ত ভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকতো, কখনো ত্যাগ করতো না। তার কত বিশ্বাস যে কতবার যে ধুলোয় মিশে গেছে, ভেঙ্গে-চুড়ে গেছে, কিন্তু আজাদ; হতাশ হয়নি, ভেঙ্গে পড়ে তার বিশ্বাস ত্যাগ করেনি। বরং যদি প্রয়োজন হয়েছে তখন বিশ্বাসের পালে নিজে থেকে হাওয়া দিয়েছে, এর পরিবর্ধন-পরিমার্জন করেছে, কিন্তু ত্যাগ করেনি। কোন নতুন কিছু জানা আর তা বোঝার আগ্রহ ও ক্ষমতা ছিল একেবারে অসাধারণ। অপরিসীম ভালবাসাতেই সে সবাইকে ঢেকে রাখতো- নিজের অন্তরের খাঁটি পরশপাথরটুকু শুধু আপন ব্যবহারের জন্য লুকিয়ে না রেখে, বিলিয়ে দিতে চাইত সবার মাঝে। এই খ্যাপাটে অতি ভালোমানুষ আজাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয় ভার্সিটিতে।
তখন সবে আমাদের ডানা গজিয়েছে- একটা উড়ু-উড়ু ভাব। সবকিছুকেই একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করি। একটা ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকি সবসময়। আড়ে আড়ে মেয়েদের দিকে তাকাই আর দু’একটাকে টোপে ধরার ইচ্ছাটাও বেশ প্রবল। তাই যখনি সুযোগ পাই, খালি ছোঁকছোঁক করতে থাকি। প্রকৃত বন্ধুত্বের চাইতে বুঝিবা কখনো কখনো এরকম বোধহীন প্রেম-প্রেম খেলাটাই প্রধান হয়ে উঠে। নতুন নতুন অনেক মুখ, এর মাঝে চেনা-জানা বলতে আমি, আজাদ আর কয়েকজন। আড্ডা দেয়াটা এখন নেশা না পেশা তা বলা মুশকিল। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দেয়া- এ যেন এক নতুন পৃথিবী- কারো কিছু বলার নাই, এ যেন এক লাগামহীন অপরূপ নতুন জগৎ।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




