
জীবনের গতিপথ সর্বদাই চলমান। শত বাধা বিপত্তিতে সে থেমে থাকে না। চাইলেও থামানো যায় না।চলছে তো চলছেই ভালো আর মন্দে।
সে সব কত বছর আগের কথা.. সময়ে সবকিছু কত বদলে যায়। চির চেনা পাড়া আজ সম্পূর্ণ অচেনা।একসময়ের সহপাঠী, খেলার সাথীরা জীবন জীবিকার টানে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে বিদেশে।কোথাও কেউ নেই । সঙ্গী বিহীন জীবন অসহ্য। এখন এই বয়সে এসে ঢাকা শহরের উঁচু উঁচু দালান, বিচিত্র্য মানুষ আর দোকানপাট দেখে দেখে কি সময় কাটে?
অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে অর্নব। ওর বাবার শরীর আজ অনেকটা ভালো।দীর্ঘ পনেরো দিন হাসপাতালে লোকটা। যমে মানুষে টানাটানি। আগামীকাল অথবা পরশু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবেন রেজা সাহেব।তারপর অর্নবের দায়িত্ব শেষ।বাকী টুকু তার সৎ মা আর ভাই বোন মিলে ঠিক সামলাতে পারবে। আজ রাতেই সে নিজ শহরে ফিরে যাবে বলে ঠিক করেছে।সুমি আর অর্ক একা একা রয়েছে। চিন্তা তো একটু হয়ই। অর্নব নিজের মনে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল।
হঠাৎই ডোরবেল বাজলো।অর্নবের বোন সুমাইয়া গেট খুলতেই কে একজন অর্নব আছে কিনা জানতে চাইলো। কথাবার্তা অর্নবের কানে গিয়েছিল।
সে এগিয়ে এসে বলল
- আমিই অর্নব। বলুন?
- আনিসের আম্মুকে চেনেন তো? সামনের বাসার আনিস!
- হু।
- উনি আপনাকে দেখা করতে বলেছেন। আর্জেন্ট।
আনিস অর্নবের ছোটবেলার বন্ধু। এখন অস্ট্রেলিয়ায়। ওর বড় ভাই কল্লোল রোড এ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে গত বছর। আনিসের ছোট বোন রজনীর সাথে অর্নবের একটা অন্য রকম সম্পর্ক ছিল একসময়। সেও এখন আমেরিকা প্রবাসী। অর্নব জানে রজনী এখন দেশে। সংগত কারণে ইচ্ছে থাকা স্বত্তেও দেখা করবার তাগিদ অনুভব করেনি।
যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতে অবশেষে সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে সে রজনীদের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বয়স্ক মানুষের ডাক উপেক্ষা করতে নেই। আজ আছে তো কাল নেই।
অর্নবকে পেয়ে যথারীতি গল্পে ঝুড়ি খুলে বসলেন জামিলা খাতুন। ছেলের সাফল্য, মেয়ের প্রবাস জীবন। ঢাকায় কেনা প্লট ফ্ল্যাট এর গল্প শুনতে শুনতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। অর্নবের বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। সে ফেরবার বাহানা খুঁজছিল। এমন সময় রজনী ঘরে ঢুকলো।সাথে জলখাবার।
দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল অর্নব। হাজার হলেও পুরনো প্রেম। রজনীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত আভিজাত্যের ছোঁয়া। অর্নব বোকা নয় সে জানে খালাম্মা তাকে কেন ডেকেছেন।এখানে এক ধরনের সূক্ষ্ম অপমান করার চেষ্টা বিদ্যমান সেটাও সে বোঝে। তাদের সম্পর্কটা এই মহিলার কারণেই পরিপূর্ণতা পায়নি। জামিলা খাতুন টাকা ছাড়া কিছু চেনেন না।
অর্নব একটা দীর্ঘশ্বাস লুকালো।
তবে জামিলা খালাম্মা টাকার জন্য রজনীকে তার থেকে বছর বিশ বড় পাত্রর হাতে মেয়েকে পাত্রস্থ না করলেও পারতেন। দেশে কি পাত্রের আকাল পড়েছিল না-কি।
টাকা সম্পত্তি সব সময় সুখের বা ভালো থাকার সংজ্ঞা হয় না।
তারপরও এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে। যারা নিজের বিত্ত বৈভব শান শওকত দেখিয়ে অন্য রকম তৃপ্তি পায়। এ সব ব্যপার নিয়ে অর্নবের কোন হীনমন্যতা নেই। সে যা সে তাই। তার জীবন নিয়ে কোন কমপ্লেইন নেই । ঘরে প্রিয়তমা স্ত্রী, ছেলে অর্ককে নিয়ে সে দারুণ সুখী। তার টাকা পয়সার কমতি থাকতে পারে কিন্তু মনটা সমুদ্রের মত বিশাল।
চলে আসবার সময় রজনী দ্রুত পিছু নিলো।ফাঁকা স্পেসে এসে সে হঠাৎ হাত জড়িয়ে ধরে বলল
- কেমন আছো অর্নব? সত্যি করে বলবে।বলো?
আবেগ যখন পাথর চাপা পড়ে তখন তা স্থির থাকে কিন্তু পাথর যখন নড়ে ওঠে তখন দুলে ওঠে পৃথিবী।
অর্নব একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কত কথা আজ মনে পড়ে। এ শহর ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ রজনী। সে কথা সে ভুলবে কি করে। আচ্ছা রজনী কি তার বুকের হৃদস্পন টের পাচ্ছে?
- কথা বলছো না কেন? আমার সাথে কথা বলবে না তুমি? আমার উপরে কি এখনও রাগ করে আছো? আমি কিন্তু ভালো নেই। আমি কিন্তু এই সম্পর্কে রাজি ছিলাম না।বিশ্বাস কর.. মা আর আব্বা মিলে আমার জীবনটা... তুমি কি আমায় সত্যি ভুলে গেছো? আমাদের অতীত কি মিথ্যা ছিল?
সব প্রশ্নের উওর সবসময় দেওয়া যায় না।দিতেও নেই।
অর্নব তার গন্তব্যে ফিরে চলে।
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






