somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিশ্ব হতে হারিয়ে গেছে স্বপ্নলোকের চাবি! (সুন্দর মামী ও কয়েকটি প্রিয় মুখ –স্মৃতিচারণ)

১১ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ৯:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…
(চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় - রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে সহজ , সুন্দর । রক্ত সম্পর্কীয় না হয়েও যারা হয়ে ওঠেন আমাদের আত্মার আত্মীয় - আমাদের বেড়ে ওঠায় হয়ে ওঠেন সুন্দর অনুষঙ্গ ! এমনি কয়েকজন - মমতাজ আপা , 'সুফিয়া আপার মা খালা ' ও সুন্দর মামী । মাতৃস্থানীয়া এ কয়েকজন নারীর জন্য আমাদের ছেলেবেলার নানা বাড়ির জগতটা হয়ে আছে স্বপ্নময় ! আর শুধু মাত্র আমাদের বেড়ে ওঠা নয় , নানাবাড়ির মত অজ পাড়াগাঁয় এদের সংস্পর্শে আমার মায়ের বেড়ে ওঠায়ও এদের গুরুত্ব অপরিসীম ।

মমতাজ আপা - খুব কাল ছিলেন বলে বিয়ের পর তার স্বামী তাকে ত্যাগ করেছিলেন । কিন্তু তার সপ্রতিভ আচরণ , মায়াভরা চেহারা ও কথা শুনে আমাদের বোধগম্য হত না কেন এমনটি হয়েছিল ? জীবনের অনেকটা সময় তিনি ঢাকায় ও নিজ গ্রামে সংগ্রাম করে কাটিয়েছেন । জীবনে যখন একটু থিতু হয়েছেন , ভাইবোনগুলো যখন একটু ভাল অবস্থানে দাঁড়িয়েছে , তখন মরণব্যধি কোলন ক্যান্সার তাকে নিয়ে যায় না ফেরার দেশে । নানাবাড়িতে গেলে এখন আর কেউ তার মত মায়াভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করবেন না - কি রে মনা কেমন আছিস !

'সুফিয়া আপার মা খালা '- আমার মায়ের আপন বোন না হলেও আমার মায়ের বেড়ে ওঠায় , তার লেখা পড়ার উৎসাহদাত্রী হিসেবে খালার ভূমিকা অপরিসীম । নানাবাড়ির পাশেই বাগানঘেরা সুন্দর বাড়ি খালার । খালার পাঁচ মেয়ে দুই ছেলে নিয়ে ছিল বিশাল এক যৌথ পরিবার । ছেলেবেলায় নানাবাড়ি গিয়েই আমরা মিশে যেতাম খালার ছেলে - মেয়ের সঙ্গে । সারাদিন হৈচৈ , এক সঙ্গে খাওয়া - দাওয়া ,রাতের বেলা বিশাল বিছানায় শুয়ে ফিশ ফিশ করে গল্প করা - সে ছিল অন্যরকম আনন্দের এক জগত । বিয়ের পর অজ পাড়াগাঁয় থেকে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে নিয়েও খালা ডিগ্রী পাশ করেছিলেন । যোগদান করেছিলেন বাড়ির পাশে একটি স্কুলে এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন ।তার অন্যরকম উচ্চারণে, উচ্চস্বরে কিছুটা শাসনের ভঙ্গীতে কিন্তু মায়াভরা কথা বলার ভঙ্গী এখনও কানে বাজে । জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এক সময়কার হৈ হুল্লোড় - প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা বাড়িতে এখন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন ।

আমাদের সুন্দর মামী - কখন , কিভাবে তিনি আমাদের সুন্দর মামী ওঠেন এখন আর মনে নেই । তবে , খুব ছোট বেলায় হয়তো তাকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য মাকে বলেছিলাম সুন্দর মামী ( বলাই বাহুল্য তিনি দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন ) তার পর থেকে আমৃত্যু তিনি হয়ে যান আমাদের সুন্দর মামী । আমি , আমার বড় বোন ,ছোট সবাই তাকে সুন্দর মামী বলেই ডাকতাম ।মামীকে দেখলে মনে হতো দুঃখিনী রাজকন্যা । এত সুন্দর মামীকে তার অভিজাত পরিবার এ রকম অজ পাড়াগাঁয় , এক অবাঙালি পরিবারে কেন বিয়ে দিয়েছিল সেও এক রহস্য । মামা অবাঙালি হলেও নানাবাড়ির সঙ্গে ছিল তার অন্যরকম ভাল একটা সম্পর্ক । এ দেশে আমার নানাবাড়ির লোকজন ছাড়া তার আর অন্য কোন আত্মীয়-স্বজনকে কখনও দেখিনি ।কাবুলিওয়ালার মত মামা ছিলেন বিশাল বপু , উগ্র মেজাজ কিন্তু রুচি সম্পন্ন ,মহৎ হৃদয়ের মানুষ।আমার মা ও আমাদের জন্য ছিল তার অপত্য স্নেহ ।তার এলাকায় তিনি পরিচিত ছিলেন আলম সাহেব নামে ।

সে যাক ফিরে আসি মামীর কথায় । বিশাল বাগান ও পুকুর ঘেরা বাড়িতে থাকতেন মামী । তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও রুচি সম্পন্ন মহিলা ।আমরা যখনই তার বাড়িতে যেতাম , পেতাম তার অপত্য ভালবাসা । তার হাতের বানানো বুটের হালুয়া , নাড়ু , নানা ধরণের আচার দিয়ে মামী আমাদের আপ্যায়ন করতেন - সাথে থাকত গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা নানা ধরণের ফল ।গ্রামে থেকেও তার আভিজাত্য , তার প্রমিত বাংলায় কথা বলা ,শাড়ি পড়ার স্টাইল এসব মিলে আমার ধারণা তিনি ছিলেন আমার মা - খালাদের আইকন ।

গত ১১ মার্চ ২০১৫ সকালে অফিসে বের হওয়ার সময় খেয়াল করলাম আমার খালা ফিসফিস করে আমার হাজব্যান্ডকে কারও মৃত্যুর খবর দিচ্ছেন । আমি জিজ্ঞেস করলাম - কে মারা গেছেন ? খালা বললেন , তোর সুন্দর মামী মারা গেছেন মা ! আমি অস্ফুট স্বরে বললাম - কি ? কারণ এর আগে তার কোন অসুস্থতার খবর শুনিনি । গত ডিসেম্বর -২০১৪ শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করে মোটামুটি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিলেন । মামা গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগেই , কিছু দিন আগে ছোট ছেলের আকস্মিক মৃত্যুটাও হয়তো মেনে নিতে পারেন নি । সারাটা জীবন মামার উগ্র মেজাজের প্রতাপ নিঃশব্দে সহ্য করে গেছেন । কখনও তাকে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও শুনিনি । অনেকটা নিরবে - নিঃশব্দে চলে গেলেন দুঃখিনী রাজকন্যা । আমাদের পারিবারিক সুখে -দুঃখে , আর কোন অনুষ্ঠানে তাকে আর পাব না । এর পর যখন নানাবাড়ি যাব হয়তো অজান্তেই পা বাড়াব তার বাড়ির দিকে কিন্তু দেখা মিলবে শূন্য প্রাসাদের ।তার মৃত্যুটা হঠাৎ করেই মনে একটা ভয় ঢুকিয়ে দেয় - সেদিন অফিসে যাওয়ার পুরোটা সময় ধরে এঁদের কথাই ভাবছিলাম , একে একে সবাই চলে যাচ্ছে , ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করেছে আমার পৃথিবী - কত মায়া , কত মোহ জড়িয়ে আছে এই ছোট্ট জীবনে - জীবন এত ছোট কেনে !

কি দ্রুত চলে যায় সময় ! দেখতে দেখতে আজ মামীর চলে যাওয়ার এক বৎসর পূর্ণ হলো। হয়তো আবার দেখা হবে প্রিয় মানুষগুলোর সাথে অন্য কোথাও, অন্য কোন খানে - এই প্রত্যাশা । অন্যভুবনেও ভাল থাকুক , সুন্দর থাকুক প্রিয় মানুষেরা ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ৯:৫০
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×