আমার দেশ, ১০ মে ২০১০।
সীমান্তে বিএসএফের বাংলাদেশী হত্যা নিয়ে ভারতের পক্ষে সাফাই গাইলেন বিডিআরের বিদায়ী মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হাতে তিন-চার বাংলাদেশী মারা গেছেন। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, মানবাধিকার সংগঠন ও পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শতাধিক বাংলাদেশী বিএসএফের হত্যার শিকার হয়েছেন। জবাবে তিনি বলেন, মানবাধিকার সংগঠন ও পত্রপত্রিকার রিপোর্টের ব্যাপারে আমি কিছুই বলব না। তবে যে তিন-চার বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে, সেজন্য বিএসএফের কঠোর বিচার হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিদ্রোহের নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করা যায়নি। সিআইডির তদন্তে হয়তো তাদের নাম বেরিয়ে আসতে পারে।
বিডিআর মহাপরিচালক বলেন, দীর্ঘদিনের কু-অভ্যাসবশত আমরা মিথ্যা কথা বলি। বিডিআর বিদ্রোহের বিচারেও মিথ্যার ওপর আমার আদালত পরিচালনা করতে হয়েছে। বিদ্রোহে জড়িতরা সত্য প্রকাশ করতে চাইছে না। তথ্য প্রকাশ করানোর মতো কোনো শক্ত ভিত্তিও আমাদের (বিডিআরের) আইনি কাঠামোতে নেই। তিনি বলেন, আমাদের গোয়েন্দা তত্পরতা দুর্বল। এজন্য চোরাচালানের মূল হোতাদের ধরতে পারিনি। তিনি বলেন, মোবাইল ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভারতে এখনও এই অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি বলে তিনি জানান। বিডিআর থেকে বিদায় নেয়ার আগে গতকাল সকালে বিডিআর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম এসব কথা বলেন। এসময় বিডিআরের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওবায়দুল হকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
গতবছরের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা বিদ্রোহে সৈনিকরা বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এরপর গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী থেকে মেজর জেনারেল মইনুলকে বিডিআর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। গতকাল তিনি পিলখানায় শেষ অফিস করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ফিরে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তার স্থলে বিডিআরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলামকে।
বিডিআরের বিদায়ী মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, কিছু অতিউত্সাহী ব্যক্তি পিলখানায় গুজব ছড়িয়ে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটিয়েছে। মানুষও আগ্রহভরে গুজবটি শুনেছে এবং একতরফাভাবে গ্রহণ করেছে। ওই গুজবের কারণেই বিডিআরের এত বড় একটা সর্বনাশ হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো কোনো মহল চায় ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে সব সময় উত্তেজনা থাক। ওই মহল সীমান্ত উত্তেজনা বাড়িয়ে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করছে। এটা করা হচ্ছে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। বিডিআরের বিদায়ী মহাপরিচালক আরও বলেন, সীমান্ত উত্তেজনা বাড়লে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হয়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সীমান্ত উত্তেজনা যারা ঘটাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বিদ্রোহের সময় দরবার হলে বিডিআর সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু একজন বিডিআর সৈনিক এক সেনা কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে পরিকল্পনাকারী সৈনিকরা বলেছিল, গুলি করার তো কথা ছিল না।
বিদায়ী মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল সাড়ে ১৪ মাসের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে বিডিআর বিদ্রোহী সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া, বিডিআর পুনর্গঠন, বিদ্রোহে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য প্রদান ও বিডিআরকে আরও গতিশীল করতে কি কি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদ্রোহের পর মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে বিডিআরকে তিনি যেভাবে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন তার সবটাই করতে পেরেছেন। কিছু বিষয় আছে যেগুলোর সঙ্গে মন্ত্রণালয় জড়িত সেগুলো আস্তে আস্তে হবে।
বিভাগীয় বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে মইনুল ইসলাম বলেন, গত ৪ নভেম্বর থেকে রাজনগর ১২ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের বিদ্রোহের বিচার বিশেষ আদালত-৪-এর মাধ্যমে শুরু হয়। ঢাকায় ৪টি ব্যাটালিয়ন, ২টি সেক্টর, বিচার প্রক্রিয়ায় ২টি ইউনিটের এ পর্যন্ত ২ হাজার ৯১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে ৩১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এ বছরের মধ্যেই ঢাকার বাইরের সব স্থাপনায় বিদ্রোহের বিচার কাজ রায় ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। ঢাকায় শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে। নিউমার্কেট থানায় দায়েরকৃত মামলার চার্জশিট এ মাসের মধ্যেই সিআইডি দাখিল করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিষয়টি মাথায় রেখেই ঢাকার বিদ্রোহের বিচারের জন্য দীর্ঘ বিরতি দেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিডিআর ডিজি বলেন, বিদ্রোহের পর বিডিআরকে নবগঠিত না পুনর্গঠিত করা হবে তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। পরে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অনেকের ধারণা ছিল কেবল নাম বা পোশাক পরিবর্তন করে বাহিনীর পুনর্গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু পুনর্গঠনের সার্বিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বাহিনীর চিন্তাধারা ও কার্যক্রমের যে সংস্কৃতি তারও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রধান পরিবর্তন দুটি। এর একটি আইনের এবং অন্যটি সাংগঠনিক। তিনি জানান, বিডিআরে কর্মরত অফিসার ও জওয়ানদের মধ্যে যোগাযোগ ঘাটতি কমাতে অফিসারের প্রাধিকার বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বর্ডার গার্ড সদস্যদের সৈনিক থেকে জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) পর্যন্ত ব্যক্তিবর্গের জন্য তিনটি উপায়ে অফিসার হওয়ার সুযোগ থাকবে। তিনি জানান, বাহিনীতে তিন স্তরবিশিষ্ট গোয়েন্দা কার্যক্রম বিন্যস্ত করা হয়েছে। বাহিনী পর্যায়ে বর্ডার সিকিউরিটি ব্যুরো (বিএসবি), রিজিয়ন ও সেক্টর পর্যায়ে রিজিয়ন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আরআইবি) এবং ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে ব্যাটালিয়ন ইন্টেলিজেন্স প্লাটুন (বিআইপি)। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার বর্ডার সেন্ট্রি পোস্টগুলো ছনের তৈরি। তার পরিবর্তে এগুলো পাকা করা হচ্ছে। এ জন্য বিডিআরের নিজস্ব তহবিল থেকে ২ কোটি ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া বিওপিগুলোর ঘনত্ব ২৫ কিলোমিটারের পরিবর্তে ৫ কিলোমিটারে নিয়ে আসা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিওপিগুলোতে সৌরবিদ্যুতায়ন প্রকল্প চালু করা হয়েছে। নাম, পোশাক, গোয়েন্দা ইউনিটের কার্যক্রম, বিডিআর সৈনিকদের পদোন্নতি, ৪টি ফ্রন্টিয়ার গঠনসহ আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নাধীন। বিডিআর সদর দফতর থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্রের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত বিডিআরের ৬৪টি পিস্তল, ৫টি রাইফেল, একটি এসএমজিসহ ৭০টি এবং ৮টি ব্যক্তিগত অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।
বিডিআরের বিদায়ী মহাপরিচালক মইনুল ইসলাম বলেন, বিডিআর শপ নামে যে দোকানগুলো ছিল, তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে বিডিআর সদস্যরা জনসাধারণের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে না। কেউ যদি এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাহলে তাকে পুলিশে সোপর্দ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রাইফেলস এন্টারপ্রাইজ এবং বিডিআর কল্যাণ ট্রাস্ট এসবই ভুয়া। এসব নাম ব্যবহার করে একটি মহল বিডিআরের নাম ভাঙিয়ে খাচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


