৭.
ড্রাইভারের নাম মোমিন। চ্যাংড়া। মনে হল সে গাড়ি নিয়ে এনএফএস খেলতে বসেছে। দু'বার খুব অল্পের জন্য অন্য গাড়ির সাথে লাগতে গিয়েও লাগেনি। আর একবার এক মটরবাইকওয়ালাকে মেরেই বসেছিল প্রায়। আমি সামনের সিটে বসে পুরো সময়টা প্রার্থনা করছিলাম যাতে সবাই অক্ষত অবস্থায় পৌঁছাতে পারি। হাইওয়েতে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। প্রায় পনের-ষোলটা মাইক্রোবাস নিয়ে এক একটা বরযাত্রী দলের বহর! সবগুলো এতো লেগে লেগে চলছিল যে, ওভারটেক করে এগোনোটা খুবই মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল।
৮.
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংগুলো মেইন গেইট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে (মনে হয়, শিওর না)। ভেতরে গিয়ে তেমন কাউকে দেখলাম না। শুধু চুয়েটের কয়েকজন ছিল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরনো কয়েকজন বন্ধুকে পেয়ে গেলাম। তিন 'স' - সুজন, সাঈদ, সজল। ওদেরকে অনেকদিন পরে দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। দুপুরের খাবার খেলাম হলের ক্যান্টিনে, তেমন কিছু ছিল না যদিও। খুব গরম পড়ছিল। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল শরীর। কিছু করার নেই, রেজিস্ট্রেশন চারটায়। লাইব্রেরি ভবনের সামনে গিয়েছি। দেখি, একটু দূরে কুল শেভিং ক্রিম কোম্পানি একটা স্টল দিয়ে সেখানে ফ্রি শেভ(!) করাচ্ছে। বাতাসে আফটার শেভের গন্ধ। কত কী যে দেখব! তো, রেজিস্ট্রেশন করে অপেক্ষায় রইলাম মক কনটেস্টের। মক-এ খু্ব দুষ্টুমি হলো, জাজদের printf("a"); ইনফিনিট লুপের ভেতর লিখে পাঠিয়ে দিলাম (এতে পিঁ পিঁ শব্দ হতে থাকে
৯.
ঢাকা ভার্সিটির দুটো টীম হোটেলে উঠেছে শুনে কত খরচ পড়ছে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা হোটেল অনুরাগে থাকছে। ওখানে ওয়েবসাইটে দেওয়া রুমগুলোর চেয়ে কমদামি রুমও আছে। একরতের জন্যে তো আর ডিলাক্স স্যুটের দরকার নেই। তাই ছুটলাম হোটেলে। তিনটা তিনশ টাকার রুমে উঠে পড়লাম। রুম 'চলে আর কি' গোছের। আমাদের বাথরুমের শাওয়ারের ট্যাপ খুলে আসে। মাশুক ভাইদের রুমটার দরজা আটকানো যায় না। যাই হোক, গোসল সেরে আমরা ছ'জন বেরিয়ে পড়লাম নির্জন হয়ে পড়া সিলেট শহরে একটা রেস্তোরা খুঁজতে।
১০.
অবসন্ন শরীরটা বিছানা স্পর্শ করতেই রাজ্যের ঘুম নেমে এলো চোখে। মাঝরাতে একবার অদ্ভুত কিছু আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। রুমের জানালা খোলা ছিল। বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল সিলেটি ভাষার দুর্বোধ্য গালাগাল আর ধুপধাপ আওয়াজ। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্তির কোন সীমা রইলো না। কোন রকমে মাথা বালিশ চাপা দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
১১.
সকালে কার ডাক শুনে ঘুম ভেঙেছিল ঠিক মনে নেই। একগুঁয়ে ঘুমটাকে বশে আনাটা খুব সহজ ছিল না। ভোরে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া। মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সবাই হালকা নীলরঙা টি-শার্ট পরে তৈরি। পিছিয়ে আছি কেবল আমি। সম্বিত ফিরল। পাঁচ মিনিটে রেডি। তখন কনটেস্ট শুরু হতে একঘন্টা বাকি। হোটেল থেকে চেকআউট করে একটা সবুজ সিএনজি ধরালাম। কষ্টমষ্ট করে ছ'জন এক সিএনজিতে। সিলেট শহরের কিছু কিছু জিনিস বড় অদ্ভুত। সিএনজি সার্ভিস দু'রকম, রিজার্ভ আর ভাড়া। রিজার্ভ একশ টাকা, মোটামুটি যে কোন দূরত্ব। আর ভাড়া সিএনজিগুলো অনেকটা ম্যাক্সি সার্ভিসের মতো। সিলেটে যান নির্বিশেষে সব চালককেই 'ড্রাইভার' সম্বোধন করতে হয়। না হলে ভাড়া পাওয়া যায় না। যাই হোক, আমাদের ড্রাইভার সাহেবের সাথে ভাষার কারণেই হোক বা অন্য যে কোন কারনেই হোক, মিস-কমিউনিকেশন হয়ে গেল। তিনি আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে না নিয়ে গিয়ে হযরত শাহজালাল (র) এর দরগায় নিয়ে গেলেন। বলে রাখি, আমি কিন্তু আগেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, ব্যাটা এ রকম কিছু করতে যাচ্ছে!
১২.
প্রবলেম সেটের খাম দেওয়া হয়েছে। আমি অন্যমনষ্কভাবে টেমপ্লেট লিখছি। আরেকটা কনটেস্ট। আমি মঙ্গলসূচক কোন আনুষ্ঠানিকতার ধার ধারি না। তাও মনে মনে ভাবছি, আর কত! জানি, যতটা ত্যাগ স্বীকার করা উচিত, ততটা করতে পারিনি এখনো। চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছি। ব্যর্থতার আশঙ্কায় প্রতিযোগিতার মাঝখানেই স্থবির হয়েছি। সাহস নিয়ে মুখোমুখি হইনি। ভীরুর মতোন পালিয়ে এসেছি। শুধুই আমার প্যাশন এর দিকে তাকিয়ে কনটেস্ট করে যাচ্ছি। একটু শক্তি মনে হয় প্রার্থনা করছিলাম পরম সত্তার কাছ থেকে।
১৩.
সবচে সহজ প্রবলেম, প্রবলেম ডি। সামির ভাই দ্রুত কোড করে পাঠিয়ে দিলেন। রং আনসার। পাঁচটা সাবমিশন এর পর মিলল। আমাদের অবস্থান একেবারে তলায়। র্যাঙ্কলিস্টে দেখলাম অনেক টীম 'ই' সলভ করে ফেলেছে। রুশাফি ভাই আইডিয়া দিলো আর আমি কোড করলাম। কোডে একটা ভুল ছিল, তাই প্রথমে অ্যাকসেপ্টেড হলো না। তো, দুটো সলভ করেও আমরা বেশ নিচে ছিলাম। 'এফ' টা দেখেই বুঝলাম বাইনারি ইনডেক্সড্ ট্রি এর প্রবলেম। রুশাফি ভাই প্রি-রিটেন কোড আনেনি শুনে কিছুটা রাগ হলো। মুখ ঘুরিয়ে কোড করে ফেললাম। ক্র্যাশ করছিল। ওটা নিয়ে বসে ছিলাম। সামির ভাই বললো 'বি' সিমুলেশন প্রবলেম। আমি ওনাকে টার্মিনাল ছেড়ে দিয়ে প্রিন্টেড কোড নিয়ে বসলাম। অনেকগুলো ভুল বের হয় এলো। সামির ভাই জানাল ওনার কিছু কিছু লজিক চেঞ্জ করতে হবে। আমি আমার কোডের ভুলগুলো ঠিক করলাম। অনেক অনেক বার টেস্ট করা হলো। পাঠিয়ে দিলাম। Judge Reponse - Yes। খুব ভালো লাগছিল তখন। প্রবলেমটার কুয়েরির অংশটা একদম নিজেদের আইডিয়া থেকে বের করেছি, আগে লেখা কোন কোড ছিল না বলে। ততক্ষণে সামির ভাইয়ের লজিকও ঠিকঠাক হয়ে গেছে। কোড শেষ হল, টেস্ট করা হল। সাবমিশন এবং রং অ্যানসার। একটা পুরো গেম সিমুলেট করা হলো। ভুল পাওয়া গেল। ঠিক করে আবার সাবমিট। এবারও জাজ নেতিবাচক। রুশাফি ভাইয়ের হঠাৎ খুব সহজ একটা কেসের কথা মনে এলো। ওটার জন্যে আমাদের প্রোগ্রাম ভুল আউটপুট দেয়। ঠিক করা হল, পাঠিয়ে দিলাম। অ্যাকসেপ্টেড হলো। তখন র্যাঙ্কলিস্ট স্থির হয়ে গিয়েছিল (যেটা শেষ হওয়ার ১ ঘন্টা আগে হয়ে যায়)। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম আমরা ছয়-সাতে উঠে গেছি। এর আগে অষ্টম স্থানের উপরে কখনও উঠতে পারিনি। এতো বাজে একটা শুরুর পরও শেষটা ততো বাজে হয় নি। খুব স্বস্তির ছিল ব্যাপারটা।
১৪.
আমার মনে হয় এটাই শুরু। চাইলেই নিজেকে অতিক্রম করা যায়। যে স্ফুলিঙ্গ আজকে দেখতে পেয়েছি, তাকে উসকে না দিলে নীরবেই নিভে যাবে। জানি না, যখন সব কিছু পাওয়া হয়ে যাবে তখন কি চাইব। লক্ষ্য আর অর্জনগুলো আসলে কিছুই না। এগুলো স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় মাত্র। আর স্বপ্ন? কোন সংজ্ঞা আমার জানা নেই, শুধুই একটা অনুভূতি। জড়বস্তু স্বপ্ন দেখে না, পশুপাখি দেখে না, শুধু মানুষ দেখে। আমার স্বপ্ন নেই, তো আমিও নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৩:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


