somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’-এ লালনকে খুঁজে পাওয়া গেল না

১৫ ই জানুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ম্যুভি শেষে ব্যাকগ্রাউন্ডে (মিলন হবে কত দিনে, চাতক প্রায় অহর্নিশ, চেয়ে আছে কালোশশী, হবো বলে চরণদাসী, ও তা হয়না কপাল গুণে। মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে......) খুব সুন্দর।
আপনা আপনিতেই মনের অনেক ভেতরের কোথাও থেকে বাজতে থাকে -
মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে।

খুব খারাপ লাগছে উপরের এই দু’তিন লাইনের পর কিন্তু লিখতে। অপারগ হতে হলে যা হয়, কিন্তু লিখতেই হবে। এই শব্দটা মনের মানুষ ম্যুভি দেখার পর লিখতে চাইনি। চেয়েছিলাম এমন কিছু লিখতে যা পড়ে হয়তো কেউ কেউ ম্যুভিটা দেখতে উৎসাহিত হবেন, দেখবেন। লালনকে চিনবেন, জানবেন, বুঝবেন। কিন্তু মনের মানুষ দেখে খুব অবাক হয়েছি। দু:খ পেয়েছি।
খুব অল্প হলেও লালনকে যেভাবে চিনেছি, জেনেছি, মনের মানুষ এর লালন সেখানে নেই। আমি অন্তত খুঁজে পাইনি।

বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, টিভি সাক্ষাৎকার মারফত জেনে এবং শুনে এসেছি যে গৌতম ঘোষ বারবারই বলেছেন যে, মনের মানুষ লালন ফকির এর জীবনী নয়। এটি শুধুমাত্র লালনের জীবনদর্শন, জীবনাদর্শ আর সঙ্গীত জীবনের প্রতিচ্ছবি । মনের মানুষ মূলত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর উপন্যাস। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র লালন কিন্তু সেই লালন প্রকৃত লালন নয়, অনেকখানিই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর মনের কল্পনা। লালনের জীবনাদর্শকে পথ ধরে সেই উপন্যাসের পথচলা, আর তারপর সেই উপন্যাসের দর্শনকে অবলম্বন করে গৌতম ঘোষের ম্যুভি।

এ পর্যন্ত যেটুকু বললাম তাতে ব্যক্তি আমার কোন আপত্তি থাকার কথা না, আর আমার মতো সাধারণের আপত্তিতেও কিছু যাওয়া আসার কথাও না। সমস্যা অন্য জায়গায়। সেই জায়গায় লালনের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর জীবনাদর্শন এর প্রতি ন্যুনতম একটা সুক্ষ্ম দায়বোধ কাজ করে যায়।

আমি আগে একবার ছেউড়িয়া থেকে ফিরে লিখেছিলাম, লালনকে দেখতে গেলে, ক্রমাগত অনুসরণ করতে গেলে এক ধরণের বৈরাগ্য মতন আধ্যাত্মিক মনোভাব তৈরী হয়ে যায় আপনাতেই। না চেনা গাঁয়ের অচেনা মানুষ লালন ফকিরের পুরো জীবনটাই রহস্যময়, রহস্যের ঘোরটোপে ঘেরা। মানুষের প্রথাগত বিশ্বাস, ধর্মমত, প্রেম-প্রার্থনা এবং জীবনের নানান নিগুঢ় পথ পরিক্রমায় ঘুরে ঘুরে লালনের গান বয়ে যায় মানবতার ধারায়।

লালনের জীবন সবার মতো নয়। তিনি বাস করেন চেনা অচেনার মাঝামাঝি বন্দরে। লালনকে একদিক থেকে দেখে শেষ করা যায় না। তাঁকে দেখতে হয় নানান দিক থেকে। সুফিবাদ, বৈষনব সহজিয়া, তান্ত্রিকতাসহ বেশ কিছু দর্শনের সমন্বয়ে প্রবাহিত নদীতে লালন মুলত একাকী বয়ে যান। নিজের ভেতরেই বাস করেন, নিজের ভেতরেই মজে যান লালন।
এই যে বললাম লালনের জীবন সবার মতো নয়, তিনি বাস করেন চেনা অচেনার মাঝামাঝি বন্দরে। তাহলে তাঁকে কিভাবে জানা যাবে? সহজেই কোন সে মাধ্যম? সে অনেকগুলো মাধ্যমের একটি হতে পারতো গৌতম ঘোষের মনের মানুষ। হতে পারতো বলছি এ কারণে যে, কে এই লালন? কি তাঁর জাত পরিচয়? অথবা ঠিক কেমন ছিলো তাঁর ধর্ম, জীবন প্রনালী? ইত্যাদি নানা বিষয়ে মানুষের মতামতের যেমন শেষ নেই, তেমনি গবেষকরাও সব বিষয়ে একমত পোষণ করেন না। কিন্তু যারাই লালনের পথে কোন না কোন সময় দু’কদম হেটেছেন, সকলেই একমত যে, ১২০ বছর আগের দেহত্যাগী লালনের একজোড়া গুরু শিষ্যকে ধরলেই জীবিত বাউলদের দেখা মেলে। লালন বেঁচে নেই কিন্তু লালনের ভাব দর্শন গুরুশিষ্য পরম্পরায় প্রবাহিত। গুরুশিষ্যের কার্যকলাপ, তাঁদের আত্মগত বিশ্বাস, সাধন ভজন এবং লালনের পদাবলীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে লালন দর্শনের নিগুঢ় তত্ত্ব এবং বাউলিয়ানার বিষয় বৃত্তান্ত।

প্রশ্ন হল সবই বুঝলাম, কিন্তু গৌতম ঘোষকে টেনে আনা কেন?
উত্তরে বলব, টেনে আনা এজন্য যে গৌতম ঘোষ মনের মানুষ ম্যুভি বানিয়ে আমাদের যে লালনকে দেখালেন, যে লালনের লালনের জীবনদর্শন, জীবনাদর্শ আর সঙ্গীত জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখালেন তার সঙ্গে আমি একমত নই। মৃদু দ্বিমত না আমি এর তীব্র প্রতিবাদও জানাই। গৌতম ঘোষ যে কাউকে নিয়েই তার ইচ্ছেমতোন ম্যুভি বানাতে পারেন। এটা তার স্বাধীনতা। আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু যখন আমার একজন পড়শীর কথা সিনেমার ভাষায় বলবেন, আর সেই পড়শী আর দশটা ম্যুভির বানানো নায়ক নায়িকার মতোন নয়, সেই পড়শী, বাড়ির পাশের আরশী নগরের। সেই পড়শীকে নিয়ে বানানো ম্যুভির ক্যামেরার কাজ কেমন হল, টেকগুলো কেমন হল, ড্রেস সিলেকশান কেমন হল, লোকেশন কেমন হল তার আগে আমার জানার বিষয় হল লালনকে কিভাবে উপস্থাপন করা হল।

ম্যুভিটার শেষে আমি কৌতুহলে কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি মনের মানুষ নিয়ে। এদের বেশীরভাগ ভালোবাসেন লালনের গান। লালনের আখড়ায় না গেলেও শুনেছেন ছেউরিয়া সম্পর্কে। মূলত আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল মনের মানুষ দেখার পর গৌতম ঘোষের লালনকে নিয়ে। প্রশ্ন গুলোর উত্তরে যে উত্তরগুলো কমন ছিল সেগুলো অনেকটা এরকম।
জন্মসূত্রে লালন মূলত কোন ধর্মের ? উত্তর-হিন্দু।
লালনের গুরু সিরাজ সাঁই গানের ফাঁকে ফাঁকে অবসরে সিদ্ধি খেতেন কিনা ? উত্তর-হ্যাঁ খেতেন।
সিরাজ সাঁই এর পোষাকের রঙ কি? উত্তর-গেড়–য়া যা বৈষ্ণব ঘরাণার প্রচলিত।
বসন্ত হওয়ার পর লালনকে যিনি নদী থেকে উঠিয়ে মাতৃ¯েœহে লালন করেন তাঁর নাম কি? উত্তর-রাবেয়া।
সিরাজ সাঁই এর সাথে বাউল ধর্মে দিক্ষিত হয়ে লালন ঘর ছাড়েন কোন গ্রাম থেকে? উত্তর-ছেউরিয়া।
পরবর্তীতে লালন কালী গঙ্গা নদীর পাশে যেখানে আখড়া গড়েন, তার নাম কি? উত্তর-আনন্দবাজার।
লালনের বা তার অনুসারীরা ইচ্ছে করলেই যৌন স্বাধীনতা ভোগ করতে পাওে কি না ? উত্তর-হ্যাঁ পারে।
এমন আরো অনেক প্রশ্ন এবং তার সব ভুল উত্তর।

আর এখন প্রশ্ন হল এই যে মনের মানুষের লালনকে নিয়ে নতুন মানুষগুলো যে ভুল দেখল, ভুল শিখল, এই ভুল শেখানোর, ভুল জানানোর দায়ভার কে নিবে? গৌতম ঘোষ? গুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? ইমপ্রেস? আরও আশ্চর্য হল মনের মানুষ নিয়ে অনেক গুনী মানুষের প্রশংসা পড়েছি বিভিন্ন লেখায়, তাঁরা কেন এমনটা করলেন?

লালনের জন্ম আসলে কোথায় তা আজো স্থির করে বলা যায় না। অনেক গবেষক মনে করেন লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। আবার এ মতের ভিন্নতা আনেন অনেকেই। তাদের মতে ছেউরিয়া থেকে ২০ কি.মি. দুরের একটা গ্রাম থেকে ১৫/১৬ বছরের একটা ছেলে হারিয়ে যাবে, আর তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে তাঁর আত্মীয় স্বজন বা পরিচিতরা কেউ চিনতে পারে না, একথা বিস্ময়করভাবে অযৌক্তিক। আবার লালন সাই এর অন্যতম প্রবীণ ভক্ত পাঞ্জুশাহের ছেলে রফিউদ্দিন তার ভাবসঙ্গীত নামের গ্রন্থে লালন ফকিরের জন্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে যশোর জেলার হরিণাকুন্ড থানার হরিশপুর গ্রামে বলে জানান। এছাড়া ১৩৪৮ সালের মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার আষাঢ় সংখ্যায় লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের একটি মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। লালন হিন্দু না মুসলমান এনিয়ে বিস্তর মতভেদ। কারো মতে লালন কায়স্ত পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী। পরে লালন ধর্ম পরিবর্তন করেন। গবেষকদের একাংশ মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায় পরিবারের সন্তান। পিতা দরিবুল্লাহ দেওয়ান, মাতার নাম আমিনা খাতুন। মূলত লালনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে গবেষকরা নানান সময়ে হিন্দু বা মুসলমান বানানোর চেষ্টা করেছেন। লালনের জন্ম সম্পর্কে আজো পর্যন্ত কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয়নি।

লালনের জাত পরিচয় বিষয়ক গানগুলো বিশ্লেষণ করলে যে জিনিষটা ভালো ভাবে অনুমান করা যায়, সেটা হল, লালন সচেতনভাবেই তাঁর পরিচয় গোপন করে রেখেছিলেন যাতে তাঁকে কোন ধর্মে বা জাতে বেধে রাখা না যায়। লালন বারবার এটাই চেয়ে আসছিলেন যাতে তাঁর পরিচয় একজন মানুষ হিসেবে পরিচিতি পায়।
জাত জন্মের ব্যাপারে লালনের সোজাসুজি কথা ছিল -

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কিরুপ
দেখলাম না এই নজরে।
..........
জগত জুড়ে জাতের কথা
লোকে গল্প করে যথাতথা
লালন বলে জাতের ফাতা
ডুবিয়েছি সাধ বাজারে।”

আরেক জায়গায় একই বিষয়ে লালন লিখেছেন-
“সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান।
.........
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতে নাই যার সেও তো বামনী
বোঝরে ভাই দিব্যজ্ঞানী
লালন তেমনি জাত একখানা।”

আরেক জায়গায় লালন বলেন -
“সবে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে
কারে বা কী বলি আমি
দিশে না মেলে।”

অথচ গৌতম গোষ তার মনের মানুষ ম্যুভিতে অবলিলায় লালনকে হিন্দু ঘরের বলে চালিয়ে দিলেন। উপরন্তু বসন্ত হওয়ার পর কালীগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধারের পর রাবেয়া আর তার স্বামীর কথোপকথনে এটা জানিয়ে দেয়া হয় যে রাবেয়া লালনের ভেজা কাপড় বদলানোর সময় প্রমাণ পেয়েছেন যে লালন মুসলমান ধর্মের নয়। কি অদ্ভুত যুক্তি। হাস্যকর লাগল, অন্তত আমার কাছে। না জানাটা ভুল নয় কিন্তু একটা তথ্য যা আজ পর্যন্ত অসমর্থিত সেটা কে সত্য বলে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কেন গৌতম ঘোষের?

লালনের নিজের ভাষাতেই লালনের দ্বিতীয় জন্মে অর্থ্যাৎ বসন্ত রোগের পর যিনি মায়ের যতেœ, সেবা যতেœ সুস্থ্য হয়েছিলেন, মায়ের ভালোবাসায় লালনের শুরু আর পরিনতি, তার নাম মতিজান। তিনি গড়াই নদীর পাড়ে কয়া গ্রামের তন্তুবায়ী পরিবারের কণ্যা ছিলেন। অথচ গৌতম ঘোষ দেখালেন লালনের সেই মায়ের নাম রাবেয়া !! কেন ?

মতিজান লালনকে নদীর পাড়ে প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন এই তথ্য কোথাও নেই। যা গৌতম ঘোষের মনের মানুষে দেখানো হল। লালন নিজেই গানে বলেছেন,
“আমি লালন এক শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
ভুগেছিলাম পকসো জ্বরে
মলম শাহ করেন উদ্ধার।”

মলম শাহ, মতিজান এর স্বামী অর্থ্যাত লালনের পরবর্তী জীবনের পিতা। মলম শাহ এবং মতিজান পরবর্তী জীবনে লালনের প্রতি অপরিসীম ভক্তি ও অনুরাগে অনুপ্রাণিত হয়ে লালনেনর ভাবধারায় মিশে গিয়ে হয়ে যান ফকির মলম শাহ এবং মতিজান ফকিরানী। ছেউড়িয়ায় লালনের সমাধি পাশেই রযেছে মতিজান ফকিরানীর সমাধি। পরেই রয়েছে মলম শাহের। এতবড় প্রমাণ থাকার পরও তবে গৌতম ঘোষের মনের মানুষে কেন এই তথ্যবিকৃতি?

লালন, মতিজান ফকিরানী আর মলম শাহ আমৃত্যু ছেউরিয়াতে একসাথে ছিলেন। অথচ গৌতম ঘোষের মনের মানুষে সিরাজ সাঁই লালনকে রাবেয়া আর স্বামীর ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায় আর কখনও লালনের জীবনে সেই মুসলমান বাবা মায়ের উপস্থিতি দেখানো হয় না। কেন ?

আবার এখানেও একটু সমস্যা আছে। লালনের সমসাময়িক বাউল বা গবেষকরা কোথাও প্রমাণ করতে পারেননি ছেউরিয়াতে সিরাজ সাঁই এর উপস্থিতি। অথচ গৌতম ঘোষের মনের মানুষে সিরাজ সাঁইকে উপস্থাপন করা হল দুই জায়গাতেই। ছেউরিয়াতে এবং লালনের কল্পিত জন্মস্থানেও। সিরাজ সাঁই এর পরনের গেরুয়া বসন আর তার সিদ্ধি গ্রহনের দৃশ্য কাল্পনিক। তথ্য প্রমাণের কোন ভিত্তি নেই।

লালন জীবনে ফকির মানিক এবং মনিরুদ্দিন শাহ খুবই গুরুত্বপূর্ন। লালন রাতের বেলা বেশীরভাগ সময় ঘুমাতেন না। ধ্যান মগ্নের মতো থাকতেন আর হটাৎ হটাৎ পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে বলে মনিরুদ্দিন শাহকে ডাকতেন এবং গান শোনাতেন। মনিরুদ্দিন শাহ সেই গান শুনে লিখে রাখতেন। এখন পর্যন্ত লালনের যে সমস্ত গান পাওয়া গেছে তার বেশীর ভাগ কৃতিত্ব মনিরুদ্দিন শাহের। মাঝে মাঝে এই একই কাজ করতেন ফকির মানিক। তাছাড়া ফকির মানিক তখনকার সময়ে খুবই ভালো আর বিখ্যাত গায়ক ছিলেন। পরে তিনি লালনের গান ছাড়া আর কোন গান করেন নাই। লালন গান লিখা বা সুর করার ব্যাপারে ছিলেন খুবই সচেতন অথচ গৌতম ঘোষের মনের মানুষে ফকির মানিকের উপস্থিতি একেবারেই নেই। মনিরুদ্দিন শাহকে রাখা হয়েছে অন্যান্যের মতো একজন সাধারণ বাউল বেশে। সেখানে গান লিখা, সুর সাধন বা লিপিবদ্ধ করার মতো গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টা উপেক্ষিত। কেন ?

লালন ফকিরের সহধর্মিনী এবং সাধনসঙ্গী ছিলেন বিশখা ফকিরানী। বিশখা ফকিরানী সারাজীবন লালনের সাথে ছিলেন। বিশখা আর লালন পরবর্তীতে দুজন অনাথকে সন্তানসম ¯েœহে লালন পালন করেন। ছেলের নাম ছিল শীতল আর মেয়ের নাম প্যারীনেছা। পরে প্যারীনেছাকে লালনের একান্ত শিষ্য ভোলাই এর সাথে বিয়ে দেন। লালনের পারিবারিক এসমস্ত তথ্য গৌতম ঘোষের মনের মানুষে অনুপস্থিত কেন ?

লালন ভক্তরা ততকালীন সময়ে খুব পরিশ্রমী ছিলেন এবং মূলত পানের বরজ করে অর্থ্যাত পানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এছাড়া কিছু ুকছু অনুসারীরা কৃষিকাজ্ও করতেন। গৌতম ঘোষের মনের মানুষে এসবের উল্লেখ নেই উপরোন্ত কাঙাল হরিনাথের পরামর্শ মতো লালন সহ তার অনুসারীদের লাঠি নিয়ে প্রশিক্ষণ, শারিরীক কসরত বা রণপায়ের ব্যবহার হাস্যকর। এগুলো কোথায় পেলেন গৌতম ঘোষ কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ?

গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সমসাময়িক। তাঁেদর পারস্পরিক দেখা সাক্ষাৎ ও ভাব বিনিময় হতো।
কিন্তু গৌতম ঘোষের মনের মানুষে কাঙাল হরিনাথকে উপস্থাপন করা হয়েছে অসম্পূর্ণভাবে, বিকৃতভাবে। কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। সেখানে তিনি লালনের উপর প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন সময়ে লালনের গান প্রকাশ করতেন। কাঙাল হরিনাথের ফিকিরচাঁদ নামে একটা গানের দল ছিল। বিষাদ সিন্ধু রচয়িতা মীর মোশাররফ হোসেনও সেই দলে কয়েকটি গান লিখে দিয়েছিলেন। লালন এই ফিকিরচাঁদ গানের দল সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন। গৌতম ঘোষের মনের মানুষে কাঙাল হরিনাথের এই গানের দল সম্পর্কে কোন তথ্যই নেই। এছাড়া মাটির কাছের দুর্বল মানুষদের কথা, জমিদারীর অত্যাচারের কথা লিখতেন তিনি তার পত্রিকায়। একবার জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বিরুদ্ধে লিখে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর আক্রমনে পড়লে লালন তার অনুসারীদের বলেন
“তোরা একতারা ফেলে এবার লাঠি ধর
ফিকিরচাঁদকে বাচাই চল”
কিন্তু লালন বা তার অনুসারীদের লাঠি ধরার বা কারো সাথে মারমারি করার তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি। তাহলে গৌতম ঘোষ তার মনের মানুষে এসব গল্প কোথায় পেলেন ? সর্বক্ষেপী বোষ্টমী চরিত্রে বিবি রাসেলকে রাখা এবং তার ভাংগা ভাংগা ইংরেজী একসেন্ট এ বাংলা বলানোর কি খুবই প্রয়োজন ছিল গৌতম ঘোষের ?

আরও অনেক কথা বলা যায়। গৌতম ঘোষের মনের মানুষে গগন হরকরা তার তার গান “আমি কোথায় পাবো তারে , আমার মনের মানুষ যারে” জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যা দুষ্টিকটু লেগেছে।
গৌতম ঘোষের মনের মানুষে ছেউরিয়ার লালনের আখড়ার নাম “আানন্দবাজার”। হায় সেলুকাস !!

দুদ্দু শাহের এক প্রশ্নের জবাবে ইদানিংকার একটা গান ব্যবহার করা হয়েছে। গানটা এরকম “আকাশটা কাপছিল ক্যান ? জমিনটা নাচছিল ক্যান? বড়পীর ঘামছিল ক্যান, সেই দিন সেই দিন, গান গাইছিল খাজা যেই দিন।” লালনের সময়ে ১২০ বছরেরও আগে মাত্র ১৫/২০ বছর আগের লিখা এই গান কিভাবে লালনের গান হিসেবে ব্যবহার করা হয় ? এর জবাব কে দিবে ?

সিরাজ সাঁই আর লালনের কথোপথনে সিরাজ সাঁই বলেন, “নারী কেবল আনন্দ সহচরী”। কেন আর কিভাবে এই স্পর্ধা ?
গৌতম ঘোষের মনের মানুষে লালন আর তার অনুসারীদের মাধ্যমে নারী, প্রেম আর যৌনতাকে যথেচ্ছভাবে ইচ্ছামাফিক মিথ্যার আবরণে তুলে ধরা হয়েছে। কল্পিত চরিত্র কমলি, কালু আর কাশেমের মাধ্যমে লালন ভাবদর্শকে গৌতম ঘোষ বিকৃতই শুধু না কদর্যও করেছেন। গৌতম ঘোষের মনের মানুষে সিরাজ সাঁই দিক্ষার একপর্যায়ে লালনকে তুলে দেন একজন সাধনসঙ্গীনীর হাতে। সেই সাধনসঙ্গীনীর অঙ্গভঙ্গি এতটাই কামার্ত যা বারবণিতা কিংবা একালের আইটেম গার্লদের অনুরুপ। লালনের জীবনে গৌতম ঘোষ কোথায় পেলেন এসব ?

কাল্পনিক চরিত্র কমলিকে উপস্থাপন করা হয়েছে যৌনতাড়িত এক নারী হিসেবে। যে কাশেম, কালু কিংবা লালনকে কাছে ডাকে তার রিপু চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। কমলি আর লালনের একান্ত দৃশ্য চিত্রায়নে লালন যখন কমলির ডাকে মানসিক ভাবে সাড়া দেয় না, শারিরিক পরিবর্তনে তখন কমলি লালনকে বলে,“তোমার বাসনা আছে ষোলআনা, তুমি ভাবের ঘরে চুরি কর সাঁই, আমাকে শান্ত কর।” আমার প্রশ্ন হল গৌতম ঘোষ এসব মিথ্যা কল্পিত ঘটনা, সংলাপ কোথা থেকে আমদানী করে আর কোন সাহসে এগুলো সাড়ম্বরে প্রচার করে?
আমরা কি আসলেই কিছু দেখি না ? আমাদের বলার কি কিছুই নেই ? এই ধৃষ্টতার কোন শাস্তি নেই ?

সার্বজনীন মানবধর্মের সাধক লালনকে নিয়ে গৌতম ঘোষের “মনের মানুষ” ম্যুভিটা সাধারণ দর্শকদের লালন সম্পর্কে কি ধারণা দিবে ?
আন্তজার্তিক দর্শকরা কি ভাববে আমাদের লালনকে নিয়ে?
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×