somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

খড়ের প্রতিমা পূজিস্‌ রে তোরা, মাকে ত’ তোরা পূজিস্‌নে!

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৩:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ (শনি বার) শুভ বিজয়া। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটবে আজ। শাস্ত্র অনুযায়ী শাপলা, শালুক আর বলিদানের মাধ্যমে দেবীর পূজা হবে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও কল্যাণ এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি ও সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আজ সমাপন ঘটবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচে’ বড় উতৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। ভক্তের ডাকে প্রতি বছর মর্তে আসেন মা দুর্গা। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেবী দুর্গার বাহন সিংহ হলেও কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি মর্তলোকে আগমনের সময়ে তিনি চারটি আলাদা বাহন ব্যবহার করেন। ফিরেও যান আলাদা বাহনে। দেবীর এই গমনাগমনে ধরাতলে শুভাশুভ ফল নির্ধারিত হয়।
হিন্দু শাস্ত্র মতে দেবী দুর্গা এবার পিতৃগৃহে এসেছিলেন নৌকায়। সনাতন বিশ্বাসে ‘শস্যবৃদ্ধিস্থাজলম’, অর্থ—অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে একদিকে প্লাবন হবে, অন্যদিকে শস্য বাড়বে। আর তার প্রস্থান হবে ঘোটকে করে। ঘোটকে আগমন ও গমনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। যেমন- রাজনৈতিক উত্থান, পতন, সামাজিক স্তরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু ইত্যাদির প্রভাব বাড়বে।
মা দেবীদুর্গার আশীর্বাদে শ্রীরামচন্দ্র রাক্ষসরাজ রাবণকে পরাজিত করার পর সীতাকে উদ্ধার করলেন, সেই থেকে শরৎকালে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। দুর্গা হচ্ছেন তিনি, যিনি জীবের তথা দেবতাদের দুর্গতি নাশ করেন, আবার দুর্গম অসুরকে বধ করেন। শরৎকালে অর্থাৎ দক্ষিণায়নে সব দেব-দেবীর মতো দেবীদুর্গা বিষ্ণুমায়া নিদ্রিত থাকেন। শারদীয় দুর্গাপূজায় বোধন হচ্ছে নিদ্রিত দেবীকে জাগ্রত করা। শরৎকালে অকাল বোধনের দ্বারা দেবীকে জাগ্রত করা হয় বলে দুর্গার অপর নাম শারদীয়া। শরৎকালে এই দুর্গাপূজা হয়, তাই তাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয়।
দূর্গা পূজা বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। হিন্দু শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা নিম্নোক্তরূপে প্রদত্ত হয়েছেঃ
“ দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।”

‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে, “দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা” – অর্থাৎ, দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা। আবার শ্রীচণ্ডী অনুসারে এই দেবীই ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ’ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি।

এবার শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হচ্ছে এমন এক ক্রান্তিকালে যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়ে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা নারী-বৃদ্ধ-শিশুদের পদপিষ্ট করছে, গুলি করে হত্যা করছে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি। নারীদের ধর্ষণ করে গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে রাখছে। রক্তের বন্যায় ভাসছে রোহিঙ্গা জনপদ। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশা বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের মুখ চেয়ে বসে আছেন।
সনাতন ধর্মে উল্লেখ আছে স্ববংশবৃদ্ধিকামঃ পুত্রমেকমাসাদ্য..”। আবার সন্তান লাভের পর নারী তাঁর রমণীমূর্তি পরিত্যাগ করে মহীয়সী মাতৃরূপে সংসারের অধ্যক্ষতা করবেন। তাই মনু সন্তান প্রসবিনী মাকে গৃহলক্ষ্মী সম্মানে অভিহিত করেছেন। তিনি মাতৃ গৌরবের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন এভাবে- উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য্য আচায্যাণাং শতং পিতা। সহস্রন্তু পিতৃন্মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে” [ (মনু,২/১৪৫) অর্থাৎ “দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন আচার্য্যরে গৌরব অধিক, একশত আচার্য্যরে গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর; সর্বোপরি, সহস্য পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মানার্হ।”
আমাদের প্রতি ঘরেই আছেন মমতাময়ী মা। আমরা বুকে হাত দিয়ে কি বলতে পারি আমরা সেই মা'কে কতটুকু পূজি ! আমরা কি তাঁর যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করতে পেরেছি। খড়ের প্রতিমাকে যত জাকজমকের সাথে স্বাগত ও বিদায় জানাই তার শিকি ভাগও কি আমরা করি আমাদের জন্ম দাত্রী মা'য়ের প্রতি? আমাদের অন্তরের সেই জীর্ণতা দেখেই আমাদের জাতীয় কবি নজরুল লিখেছেনঃ

খড়ের প্রতিমা পূজিস্‌ রে তোরা, মাকে ত’ তোরা পূজিস্‌নে!
প্রতি মা’র মাঝে প্রতিমা বিরাজে (ঘরে ঘরে ওরে)
হায় রে অন্ধ, বুঝিস্‌নে।।

বছর বছর মাতৃ পূজার ক’রে যাস্‌ অভিনয়
ভীরু সন্তানে হেরি লজ্জায় মাও যে পাষাণময়,
মাকে চিনিতে সাধন-সমরে সাধক ত’কেহ বুঝিস্‌নে।
মাটির প্রতিমা গ’লে যায় জলে, বিজয়ায় ভেসে যায়,
আকাশে-বাতাসে মা’র স্নেহ জাগে অতন্দ্র করুণায়।
তোরই আশে-পাশে তাঁর কৃপা হাসে –
কেন সেই পথে তাঁরে খুঁজিস্‌নে।


আল কুরআনে বলা হয়েছে আমি মানুষকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে। একটি হাদীসে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, মাতার পদতলে সন্তানের বেহেশত (স্বর্গ)।তাছাড়া একটি হাদীসে আছে তা হল মা তিন বার সেবা করার পর বাবাকে এক বার। সেবা করা।

আসুন আমরা আমাদের নিজ নিজ মা'কে পূজি যিনি আমাদের জঠর জ্বালা সয়ে পৃথিবীর রূপ, স্বাদ ও গন্ধ উপভোগ করার অনাবিল আনন্দ দিয়েছেন। এ শুভদিনে আমরা খড়ের প্রতিমাকে জৌলুসের সাথে বিসর্জনের পরিবর্তে নিজের মা'কে পূজি পরম যত্নের সাথে এবং রোহিঙ্গ মা'বোনদের পাশে দাড়াই যার যার সাধ্য মতো। রোহিঙ্গাদের যারা অসুরের নির্দয়তায় নির্যাতন করছে, সেই মানবরূপী অসুরের বিনাশ চান তারা। প্রার্থনা করেন, পৃথিবীতে যত মানবরূপী অসুর আছে তাদের বিনাশ হোক।

সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং সামুর সকল সকল পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ২:৫৪
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানুষের অহংকার ও বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন শেরজা তপন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২


উৎসর্গঃ ব্লগার রাজীব নুর( ঈশ্বর বিশ্বাসের কোল ঘেঁষে যাওয়া কোন লেখা এলেই যিনি লেখককে ভীষন সন্দেহের চোখে দেখেন- ভাবেন; কি অদ্ভুত কথা- ইনি দেখি ঈশ্বর বিশ্বাসী!!))
ধর্ম ও বিজ্ঞান: সংঘর্ষ না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার মত তারেক জিয়াও কি ভারতে ইলিশ পাচার করছে?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৬



চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম কিন্তু বাজারে কোন ইলিশ নেই.... ইলিশ নেই বললে ভুল হবে ইলিশ আছে কিন্তু উহা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামীলীগ আমলের ১৭ টি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

~~~সংশয়~~~

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৩

♦أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشِّيْطَانِ الرَّجِيْمِ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্'র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
♦بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্'র নামে)
♦ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)


(ছবি নেট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×