somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নারীদের স্বাতন্ত্র ও অনুকরণীয় পরিচিতি প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি মুসলিম নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া। বর্তমান আধুনিক নারী সমাজ সৃষ্টিতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবদান অসামান্য। একবিংশ শতাব্দীর দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্যের শেকড় উপড়ে ফেলে সমতা, উন্নয়ন এবং শান্তি অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী যে যুগের দাবি আমরা শুনতে পাই তা বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল বেগম রোকেয়ার লেখনীতে। তিনি সবসময় বালিকা বা কন্যাশিশুর অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি নারী শিক্ষাকে কখনো পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের মাঝে দেখতে চাননি। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন রাতারাতি কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নারী সমাজ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। তিনি বলেন, "মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে তাহারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ জননী এবং আদর্শ নারীরূপে পরিচিত হইতে পারে।" এজন্য প্রয়োজন শিক্ষা। তিনি তার সাহসী লেখনীর মাধ্যমে নারী সমাজকে সংগঠিত করে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ডাকই দেননি, প্রস্তুত করার দায়িত্বও নিয়েছেন। বেগম রোকেয়া শুধু একজন সমাজ সংস্কারক বা কর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন অসাধারন সাহিত্যিক। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি সাহিত্যপত্রে তাঁর বঙ্গগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও রসরচনা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সব ধরনের লেখাতেই ফুটে উঠেছে নারীদের সমস্যার কথা। মাত্র ৫২ বছরের ব্যবধানে ১৮৮০ সালের এই দিনে তার জন্ম এবং ১৯৩২ সালের একই দিনে তার মৃত্যু হয়। আজ তার ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী এবং ৮৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ক্ষন জন্মা এই মহিয়সী বাঙ্গালি সাহিত্যিক, নারী আন্দোলনের অগ্রদূত ও সমাজ সংস্করক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম-মৃত্যুবাষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা, আর তিন ভাই যাদের একজন শৈশবে মারা যায়। তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তাঁর বোনদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়নি, তাদেরকে ঘরে আরবী ও উর্দু শেখানো হয়। তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিকমনস্ক ছিলেন। তিনি রোকেয়া ও করিমুননেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান। ১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট উর্দুভাষী ও বিপত্মীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বেগম রোকেয়া। বিয়ের পর তিনি 'বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন' নামে পরিচিত হন। তাঁর স্বামী মুক্তমনা মানুষ ছিলেন, রোকেয়াকে তিনি লেখালেখি করতে উৎসাহ দেন। স্বামীর উৎসাহ ও প্রেরণায় বাংলা ও ইংরেজী উত্তমরুপে আয়ত্ত করেন এবং একটি স্কুল তৈরির জন্য অর্থ আলাদা করে রাখেন। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। অল্প বয়সেই স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় বেগম রোকেয়া সম্পূর্ণ একা হয়ে হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সমাজসেবা ও সমাজে নারীশিক্ষা বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। সৈয়দ সাখাওয়াত হেসেনের মৃত্যুর পাঁচ মাস পর স্বামীর জন্মস্থান ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার ফলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং ১৯১১ সালের ১৫ই মার্চ তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল পুণরায় চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় এখানে ছাত্রী ছিল মাত্র ৮ জন। চার বছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালের মাঝে এটি হাই স্কুলে পরিণত হয়। স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রোকেয়া নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যস্ত রাখেন। ১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।


১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে পদার্পণ করেন বেগম রোকেয়া। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা Sultana’s Dream। যার অনূদিত রূপের নাম সুলতানার স্বপ্ন। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলি হলঃ পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর। তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর রচনা দিয়ে তিনি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না - তা বলেছেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণে বাংলাদেশ সরকার একটি গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে পৈতৃক ভিটায় ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। এতে অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, ৪ তলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়


২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ৭ম বিভাগ হিসেবে রংপুর বিভাগের একমাত্র পুর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে 'রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ২০০৯ সালে 'নারী জাগরণের অগ্রদূত' হিসেবে তাঁর নামকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়। এছাড়াও, মহিয়সী বাঙালি নারী হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদানকে চীরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসনের জন্য "রোকেয়া হল" নামকরণ করা হয়। ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। সেসময় তিনি ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক, বাঙ্গালী নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের ১৩৭তম জন্ম ও ৮৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসম্বের তার জন্ম এবং ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। বাঙ্গালি সাহিত্যিক, নারী আন্দোলনের অগ্রদূত ও সমাজ সংস্করক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম-মৃত্যুবাষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।-
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সকাল ১১:২৮
৯টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামু একটি ছোট নৌকা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫



একটা ছোট নৌকা, পাল তুলে, পাড়ি দিচ্ছে -
অন্তহীন তারার রাস্তা পেরিয়ে।
পেরোচ্ছে গ্রহ, ধূমকেতু, ছুটন্ত আগুনের টুকরো,
দূরে কোথাও ধাক্কা লাগে, তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায়।
ধীরে, খুব ধীরে এগোয় নৌকা;
তবু এগোয়।

নৌকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবির কথা আমার মুভি উতল অপেক্ষা

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৫




আজ একটা নতুন খবর ভাগ করে নেই সবার সাথে। অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম, নিজের গল্প দিয়ে যদি নাটক বা সিনেমা করা যেত। ভাবনা এক সময় সত্যি হয়ে গেলো।
দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×