somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা গানের কিংবদন্তী পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী শ্যামল মিত্রের ৮৯তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলা গানের কিংবদন্তী, পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী শ্যামল মিত্র। বাবা সাধন কুমার মিত্র চেয়েছিলেন ছেলে হোক তাঁর মতো এক আদর্শ স্বনামধন্য চিকিৎসক | বাবার চাওয়ার আগেই সুরের সরগম ছুঁয়েছিল তার মন। তাই আর মানা হয়নি পিতৃ আদেশ। পিতা-পুত্রের সম্পর্কে পড়েছিল অসম ভাঁজ। তবুও গানেই ভুবন ভরিয়েছিল সে। সিনেমার মতো্ই অতীতের ছোট ছেলেটি একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলা আধুনিক সঙ্গীতের অন্যতম সুরকার গায়ক শ্যামল মিত্র। আধুনিক আর সিনেমার গান বাদেও অতুলপ্রসাদী, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুল গীতিতেও শ্যামল মিত্রের কীর্তি স্মরণীয়। তবে ঠিক সিনেমার মতো জীবন নয় শ্যামল মিত্রের। তার সাফল্য নিয়ে কোন সংশয় না থাকলেও সংসয় রয়েছে শিল্পী হিসেবে তার মূল্যায়ন নিয়ে। তার জন্মদিন, মৃত্যুদিন এখনও সেভাবে পালন হয় না বঙ্গসংস্কৃতিমহলে। পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত এই সঙ্গীত শিল্পী ১৯২৯ সালের আজকের দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ৮৯তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা গানেরকিংবদন্তী বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আদৃত এই গায়কের জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।


শ্যামল মিত্র ১৯২৯ সালের ১৪ জানুয়ারি অধুনা ভারতের কলিকাতার কাছাকাছি উত্তর ২৪ পরগনার শহর নৈহাটিতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা, ডঃ সাধন কুমার মিত্র ছিলেন সেখানকার নামকরা ডাক্তার। পিতা চেয়েছিলেন তার পাদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্যামল একজন ডাক্তার হবে কিন্তু পুত্র ছিল সঙ্গীত সম্পর্কে ক্ষুরধার এবং তার মা এবং স্থানীয় গায়ক মৃণাল কান্তি ঘোষ সঙ্গীতের ব্যাপারে তাকে অনুপ্রাণিত করতো ফলশ্রুতিতে গান তাকে বেধে রাখে আষ্টেপৃষ্ঠে। ভারতের I.P.T.A. আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত লোকেদের মাধ্যমে শ্যামল মিত্র সলিল চৌধুরীর সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান। সে সময় তরুন শ্যামল মিত্র এবং তার কনিষ্ঠ বোন রেবার কণ্ঠে গাওয়া হে আলোর পথের যাত্রী IPTA আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তদের উৎসাহ যোগাতো। রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে প্রথমে গানের জগতে প্রবেশ শ্যামল মিত্রের । তিনি বিভিন্ন স্টেজে ছায়াছবির গান গেয়ে খ্যাতি কুড়ান। স্নাতক পরীক্ষার সময় হুগলির মহসিন কলেজে শ্যামল মিত্রের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর অনুপ্রেরণায় এলেন কলকাতা। সেখানে বিখ্যাত আধুনিক গানের শিল্পী সুধীরলাল চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে ঘুরে গেল ভাগ্যের চাকা। সুধীর লাল চক্রবর্তী তাকে আকাশ বাণী কলকাতায় গান গাওয়ার ব্যাপারে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে এইচএমভিতে-বন্ধুগো জানি-এই গানটি প্রথম রেকর্ড করেন। জয় মা কালী বোর্ডিং ছবিতে শ্যামল মিত্র প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৪৯ সালে সুপ্রীতি ঘোষের কথায় 'সুনন্দের বিয়ে' সিনেমায় প্রথম প্লে ব্যাক করলেন শ্যামল মিত্র। সুধীরলাল চক্রবর্তীর ব্যবস্থাপনায় এটাই এইচ এম ভি থেকে রেকর্ড করা শ্যামল মিত্রের প্রথম আধুনিক গান।ক্রমে বাংলা গানের আধুনিক মানচিত্রে হেমন্ত মান্নার পাশে উঠে এল আর একটা নাম, শ্যামল মিত্র। ১৯৫৬ সাল থেকে অধিকাংশ বাংলা ছবির গান সুরে মৌলিকত্ব হারিয়ে ফেলে এবং পাশ্চত্য সংগীতের প্রভাব পড়তে শুরু করে। শ্যামল মিত্র কিন্তু সে পথ অনুসরণ করেননি। বরং তার গাওয়া প্রতিটি রেকর্ডকৃত আধুনিক গানে সুরের বৈচিত্র এবং পূর্ব ঐতিহ্য অক্ষুন্ন থাকে ।


শ্যামল মিত্র ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাঙ্গালী সঙ্গীত শিল্পের সুবর্ণ যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রযোজক, সুরকার এবং গায়ক। এক সময় হেমন্তের মতো শ্যামল মিত্র ছাড়া বাংলা ছবির গান ভাবাই যেতোনা। তাঁর শ্রুতিমধুর কন্ঠস্বরের আবেগ প্রতিফলিত হয় তাঁর গাওয়া প্রতিটি গানে। জনপ্রিয় অনেক মৌলিক বাংলা গান বিপুল সংখ্যা রেকর্ড ছাড়াও, তিনি নেপথ্য গায়ক হিসাবে শতধিক বাংলা গান ও অর্ধাশতাধিক বাংলা ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। ১৯৬৩ সালে তার প্রযোজিত ছবিটি ছিল তার ক্যারিয়ার আরেকটি মাইলফলক। এই সময়কালে তিনি অনেক বাংলা ছায়াছবি নেপথ্য গায়ক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৬৬ সালে শ্যামল মিত্রের প্রযোজিত ও সুরারোপিত ছবি 'দেওয়া নেওয়া'-য় 'গানে ভুবন ভরিয়ে দেব' সঙ্গীত জগতের অনন্য উপহার। এ ছাড়াও তাঁর সুর করা আরো দু'টি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হল অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম। অভিনেতা হিসেবে, শ্যামল মিত্র বাংলা সিনেমা সাড়ে চুয়াত্তর এবং সাপ মোচন ছবিতে কাজ করেন। তিনি বাংলা ভাষা ছাড়াও ভারতীয় হিন্দি, তামিল, তেলেগু, পাঞ্চাবী, মারাঠি, ওড়িয়া এবং অসমিয়া ভাষায় গান গেয়েছ্নে। আধুনিক বাংলা গান এবং ফিল্ম গান ছাড়াও, শ্যামল মিত্র অন্যান্য অনেক বাঙ্গালী সঙ্গীত চর্চায় রবীন্দ্র, নজরুল গীতি, ছোটদের গান, এবং অতুল প্রসাদীসহ বিভিন্ন গান গেয়েছেন। শ্যামল মিত্র ভারতীয় রেডিওর সঙ্গে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে, শ্যামল মিত্র হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায, তরুন বন্দ্যোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ইলা বসু, সুপ্রীতি ঘোষ, গায়ত্রী বসু, তালাদ মাহমুদসহ প্রায় সকল প্রখ্যাত ও প্রধান শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।


বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ঢাকায় এসে দুটি ছবিতে কণ্ঠ দেন। আলমগীর কবির পরিচালিত-সূর্যকন্যা ছবিতে-১। চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা.. ২। ভালোবাসো যদি কাছে এসোনা-গান দুখানি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। এ গান সংগীত প্রেমিকদের অন্তরে এখনো ঝংকার তোলে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়কদের অন্যতম শ্যমল মিত্রের গাওয়াঃ
১। আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, ২। ওই আঁকা বাঁকা যে পথ, ৩। কেন তুমি ফিরে এলে, ৪। দূর নয় বেশী দূর ওই, ৫। ধরো কোন এক শ্বেত পাথরের প্রাসাদে, ৫। নাম রেখেছি বনলতা ইত্যাদি গান যুগ যুগ ধরে বাংলা গান বোদ্ধাদের বাংলা গানের স্বর্ণযুগকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সুপার ডুপার হিট এই শিল্পীর কণ্ঠে গীত গানগুলো্ শুনতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে পারেন


বাংলা গানের কিংবদন্তি শ্যামল মিত্র ১৯৮৭ সালের ১৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যকালে তিনি তাঁর স্ত্রী প্রতিমা মিত্র, পুত্র শৈবাল মিত্র এবং সৈকত মিত্র, কন্যা মনোবিনা এবং কোটি কোটি ভক্ত রেখে যান। ৩২ বছর আগে শ্যামল মিত্রের শারীরিক মৃত্যুহলেও জীবন খাতার প্রতি পাতায় অমরত্বের অনন্ত আলোয় তিনি চির আলোকিত, চির উজ্জ্বল।বাংলা গানের কিংবদন্তী বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আদৃত এই গায়কের ৮৯তমজন্মবার্ষিকী আজ। কিংবদন্তি গায়ক শ্যামল মি্ত্রের জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:০৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বৃষ্টি বিলাস!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮



বৃষ্টির জন্য খুব বেশি হাহাকার জমেছিল বলেই কিনা,
জমিয়ে বৃষ্টি এসে রীতিমতো আমাদের জমিয়ে রেখেছে-
এখন গৃহ কারাবাস!
বৃষ্টি তুমি কিনা জমিয়ে রেখেছিলে এতটা ক্রোধ!
থামছেই না তোমার চোখ রাঙানি!
অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

প্রিয়,
মেঘ বালিকা
(আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম ) ।



আজ তোমাকে আমার মনের একটি গোপন ইচ্ছার কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
এই বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত,এখানে সবকিছুর একটা শেষ থাকে।
কিন্তু যখনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×