
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজ যেভাবে করেছেন এবং উম্মতকে করার আদেশ দিয়েছেন তাকেই ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সুন্নত। রাসুল (সঃ) তার প্রিয় সাহাবিদের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ—প্রত্যেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তার প্রতিটি কর্ম ও পদক্ষেপ মানবতার অনুসরণযোগ্য। সফলতা ও কামিয়াবির মাধ্যম। জীবনপথের পাথেয়। তার কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করলে মুমিনের জীবনে বয়ে যাবে প্রশান্তির ফল্গুধারা। জীবনে চলতে-ফিরতে আমরা কত কি-ই না বলে থাকি। ভালোমন্দ সব কিছুই উচ্চারিত হয় আমাদের মুখে। অথচ একটু লক্ষ্য করলেই লাভ করতে পারি হাজারও সওয়াব। স্থান-কাল বুঝে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণেই অর্জিত হয় পরকালের অমূল্য সম্পদ। নিচে এমন কিছু সুন্নতের কথা আলোচনা করা হলো যা কিছু কাজ ও কয়েকটি শব্দ বলেই আদায় করা যায়।

১। ভালো কিছু খাওয়া বা পান করার সময়, কোনো কিছু লেখা বা পড়ার সময়, কোনো কাজ শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করা সুন্নত। বুখারি : ৫৩৭৬)
২। খাবার সময় বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে বলতে হবে‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওআখিরাহ বলা সুন্নত। (তিরমিজি, হাদিস নং: ১৮৫৮)
৩। খাবার গ্রহণের আগে ও পরে হাত ধোয়া সুন্নত। রাসুল (সা.) খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার আদেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) পানাহারের আগে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ)
৪। দস্তরখান বিছিয়ে খাওয়া সুন্নত। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়াবিশিষ্ট বড় পাত্রে খাবার খেতেন না। কাতাদা (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে কীসের ওপর খানা খেতেন? তিনি বললেন, ‘চামড়ার দস্তরখানের ওপর। ’ (বোখারি : ৫৩৮৬)
৫। ডান হাত দিয়ে খাওয়া সুন্নতঃ রাসুল (সা.) আজীবন ডান হাত দিয়ে খাবার খেতেন। বাম হাত দিয়ে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন তিনি। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে। ’ (বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৭৬; মুসলিম, হাদিস নং: ২০২২)
৬। হাত চেটে খাওয়া সুন্নত। রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে (ধোয়া) না। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫২৪৫)
৭। আঙুল চেটে খাওয়া সুন্নত। আঙুল চেটে খাওয়ার ফলে বরকত লাভের অধিক সম্ভাবনা থাকে। কারণ খাবারের বরকত কোথায় রয়েছে মানুষ তা জানে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ১৯১৪)
৮। খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা। শত চেষ্টা সত্ত্বেও খাবারে দোষ-ত্রুটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করা নিতান্ত বেমানান। রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না। (বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৩৮২)
৯। খাবারে ফুঁ না দেওয়া। খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে। রাসুল (সা.) খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৪১৩)
১০। পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া সুন্নত। খাবার গ্রহণের সময় কখনো কখনো থালা-বাসন থেকে এক-দুইটি ভাত, রুটির টুকরো কিংবা অন্য কোনো খাবার পড়ে যায়। সম্ভব হলে এগুলো তুলে পরিচ্ছন্ন করে খাওয়া চাই। রাসুল (সা.)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না। ’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৯১৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৪০৩)
১১। খাবারের শেষে দোয়া পড়া সুন্নত। আল্লাহ তাআলা খাবারের মাধ্যমে আমাদের প্রতি অনেক বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেন। এ দয়ার কৃতজ্ঞতা আদায় করা সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। খাবার গ্রহণ শেষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য।
১২। ভালো কিছু খাওয়া বা পান করা শেষে, কোনো শুভ সংবাদ শোনা হলে, কেউ ‘কেমন আছো’ জিজ্ঞেস করলে তার জবাবে খাবার শেষে রাসুল (সা.) আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতেন ও দোয়া পড়তেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা। ’ তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন: ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫৪৫৮) ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা সুন্নত। (ইবনে মাজাহ : ৩৮০৫)
১৩। কারও হাঁচি আসলে ‘আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল’ বলা সুন্নত। (তিরমিজি : ২৭৪১)
১৪। কোনো হাঁচি দাতা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে শুনলে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৬২২৪)
১৫। আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ব বা বড়ত্বের কোনো কৃতিত্ব দেখলে কিংবা শুনলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৬২১৮)
১৬। স্বাভাবিকের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম দেখলে কিংবা আশ্চর্য ধরনের কোনো কথা শুনলে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৬২১৮)
১৭। ভালো যে কোনো কিছু বেশি বা ব্যতিক্রম দেখলে ‘মাশাআল্লাহ’ বলা সুন্নত। (মুসলিম : ৩৫০৮)
১৮। ভবিষ্যতে কোনো কিছু করার ইচ্ছা করলে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা সুন্নত। (সুরা কাহাফ : ২৩-২৪)
১৯। কোনো বাজে কথা শুনলে ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৬৩৬২)
২০। কোনো বিপদের কথা শুনলে কিংবা কোনো খারাপ বা অশুভ সংবাদ শুনলে, কোনো কিছু হারিয়ে গেলে, কোনো কিছু চুরি হয়ে গেলে, কোনো কষ্ট পেলে ‘ইন্নালিল্লাহ’ বলা সুন্নত। (মুসলিম : ২১২৬)
২১। কথা প্রসঙ্গে কোনো গুনাহের কথা বলে ফেললে, সঙ্গে সঙ্গে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা সুন্নত। (সুরা মুহাম্মদ : ১৯)
২২। ওপরে ওঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলা এবং নিচে নামার সময় ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ২৯৯৩)
২৩। নিশ্চিতভাবে না জেনে কোনো বিষয়ে কিছু বললে, কথা শেষে ‘ওয়াল্লাহু আ-লাম’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৫৫৭০)
২৪। কেউ কিছু দিলে কিংবা কারও মাধ্যমে কোনো কাজ হলে তার বদলে ‘জাযাকাল্লাহু খাইরান’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৩৩৬)
২৫। কোনো বিজয় লাভ করলে কিংবা বিজয় লাভের আশায় শ্লোগান দিলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলা সুন্নত। (বুখারি : ৬১০)
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এটি একটি ধর্মী বিষয়ক পোস্ট। আমার নিজস্ব কোন মনগড়া বক্তব্য নয় হাদিসের আলোকেই বলা হয়েছে। তবে কিছুটা সম্পাদনা করা হয়েছে। এ লেখায় কারো কোন ওজর আপত্তি বা দ্বিমহ থাকলে তার জন্য আমাকে ব্যক্তি আক্রমন করবেন না। কাউকে জোর করে মহানবীর এ সন্নত মানতে বাধ্য করা হচ্ছেনা। তবে রাসুল (সাঃ)-এর সুন্নতগুলো জীবনে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে, জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



