কমরেড হাসান মোরশেদের একটা মন্তব্যে মনটা ভরে গেল। আমারই এক প্রিয় সহকর্মীর উদ্ধৃতি। 'সবাই নবকুমার হয় না, কেউ কেউ হয়। বাঘের ভয় ভুলে কাউকে না কাউকে সবার জন্য কাঠ কুড়োতে বনে যেতে হয়।' বেশ উদ্দীপনাময়। আরো র' একটা ভার্সন শুনেছি। এইসব করতে গেলে পুরাপুরি তারছিড়া হতে হয়। গতকাল সন্ধ্যার আড্ডায় চোরাবালি যেমন বলছিল : কী হবে ভেবে কিছু করা যায় না। করতে করতে বরং ভাবা যায় করণীয় নিয়ে। ভূত-ভবিষ্যত উপেক্ষা করেই।
হক কথা। আমি ভীষণ সহমত। জন্মযুদ্ধের মতো ব্যাপারগুলান পুরাপুরি বনের মোষ তাড়ানোর মতো, ঘরের খেয়ে। অর্থকরী তো নয়ই, উল্টো জোগান দাও। থাকুক না থাকুক। ব্যাঙ্কের শেষ ১০ হাজার তুলে ২ হাজার টাকার বই আর ৩ হাজারে স্ক্যানার কিনে একটু কী মন খারাপ হয়! হয় না। সহযোদ্ধাদের ফোন করি। নাগরিক যাপনের ব্যস্ততায় বিভেদটুকু ঘোচেনা। তবু মন জানে কেউ তো আছে! আসলেই কী আছে? রাত্তিরে ইমার রাগী স্বর ভেসে আসে : তুমি একটু অপেক্ষা করতে পারলা না! আমি তো টাকা নিয়াই রাখছি। অবরোধটা শেষ হলেই কিনতাম।' স্ক্যানার আমার দরকার, ইমার না। তারপরও সে বাসায় ভুঙ্গভাঙ্গ দিয়ে টাকা নেয়, বন্ধুর স্বপ্নের প্রতি অগাধ মমতায়।
মাঝেমাঝে দিশেহারা লাগে। মাসুদ রানার মতো একলা কর্মকাণ্ডেই বিশ্বাস। সঙ্গী মানে বোঝা, বাড়তি দায়িত্ববোধ। তারপরও দিশেহারা লাগে। 'সহকারী চাই' পোস্টের পর অনেকেরই ভীষণ আগ্রহ। কিন্তু আসলে যে তাদের কী করতে বলি তা নিয়ে আমিও দ্বিধায়। যাদের দেয়া হলো তারা কেউ না কেউ সমস্যায়। এদিকে আবার কনফুসিয়াস পারিবারিক ঝামেলায় দৌড়াদৌড়িতে, তৌহিদ ব্যস্ত কাছাকাছি কারণে। ইমার পরীক্ষা চলে। ট্যাকনিকালি অজ্ঞ আমি কলা চুষি, 'শালার স্ক্যান ক্যামনে করে তাও তো জানিনা, আপলোড- পরেও!'
একজন প্রতিরাতে ম্যাসেঞ্জারে আসেন। 'কী করলা আজকে? নতুন কী লিখলা।...' 'তুমি কী জানো?...' 'একটা মেইল পাঠালাম, দ্যাখো।...' 'তোমার লেখাটা পড়লাম, এই প্রসঙ্গে ...বইয়ে ...অধ্যায়ে বিস্তারিত আছে।' একজন মুক্তিযোদ্ধা উত্তর প্রজন্মে তার বিবৃতির জানান দ্যান। চেতনার আগুনে ঝিমুনি এলেই ফু দিয়ে দ্যান, শিখা ফের জ্বলে লকলকিয়ে। 'জালাল ভাই, দিশেহারা লাগে। এতকিছু একলা ক্যামনে করি?' 'তাড়া কিসের? আস্তে আস্তে কর। হাঁটা শুরু করো। একটা সময় দেখবে তুমি আর একলা নেই। মিছিল রূপ নেবে কাফেলায়। কাম'ন ইয়াং ম্যান। ইটস আ ওয়ার গোয়িং অন। এসময় যোদ্ধাদের হতাশায় ভোগা চলে না।'
!@@!372185 !@@!372186 !@@!372187 লোকে তারে চেনে। আমি চিনি আমার কমান্ডার হিসেবে। এই একটা লোকের প্রশ্রয়ে আমি আমার বাবার ছায়া খুঁজে পাই। সেই মোটিভেশন, সেই রকম এনকারেজম্যান্ট। সামহোয়ারে এমন কোনো মুক্তিযুদ্ধের পোস্ট আমার নাই যেখানে জালাল ভাই'র অংশীদারী নাই। অথচ মানুষটা স্রেফ নিজের তাগিদে উত্তরসূরীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌছানোকে দায়িত্ব মানেন। মোষ তাড়ান নিজের খেয়ে। সংসার-পরিবার নাওয়া-খাওয়া ভুলে আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের মশালটায় জ্বালানি জোগান। দূর আমেরিকায় একাই গড়ে দেন '৭১ নিয়ে এনওয়াই টাইমসের লাইব্রেরি। জন্মযুদ্ধের কাজ শুরুর অনেক আগে থেকেই আমার সঙ্গে তার পরিচয়। নিজে থেকেই খোঁজ নেন, তাগিদ দেন। আমার মাঝে কী উনি আরেকজন মশালবাহককে পান! জিজ্ঞেস করিনি কখনোই। তবে নিজে নিজে নিজেকে তাই ভাবি। সেভাবেই প্রস্তুত করি। প্রস্তুত হই। এ যুদ্ধ হার না মানার যুদ্ধ। কভু হারবার নয়।
তাকে দেখি। উদ্দীপ্ত হই। হতাশা ঝেড়ে ফেলে শুরু করি নতুন উদ্যমে। নিজেকে কখনোই একা লাগে না। অন্যভাবে বললে, এইবার এইসব একাকীত্ব আমি দারুণ উপভোগ করি।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৫:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


