অ্যাডিক্ট! কথাটা শূনলেই অনেকের যেন গাগুলিয়ে ওঠে। ট্যারা চোখের চাহনি তো আছেই- পারলে পালিয়ে বাঁচে। যেন কুষ্ঠরোগীর দেখা পেলাম। মানতেই হচ্ছে, এটাই বাস্তবতা। তবে আশির দশকের শুরুতে মাত্র শ'খানেক নেশাখোরের এই বিবশতা এখন রীতিমতো মহামারীতে রূপ নিয়েছে।
গড়ে প্রতি তিনটি পরিবার দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ঘরে একজন অ্যাডিক্ট থাকায়। বোনের বিয়ে হচ্ছেনা, বাবা-মা-ভাই বোনরা সমাজে মাথা নিচু করে থাকতে হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে এমন সব অভিযোগ আসছে যার মধ্যে চুরি ছিনতাইও পড়ে। আমার নিজের কথাই বলি। খোদার অশেষ রহমতে আমাকে চুরি ছ্যাচরামি করে খেতে হয়নি। পরিবারের সবচেয়ে আদরের বলেই কখনো টাকা পয়সার ব্যাপারে না শুনতে হয়নি। সে টাকায় আমার সঙ্গে আমার বন্ধুদেরও গতি হয়েছে। চাকুরি জীবনেও তাই। কিন্তু এই সৌভাগ্য প্রতি লক্ষ অ্যাডিক্টে একজনের জোটে- সেই অর্থে আমি ভাগ্যবান।
সত্যিই কী তাই! আমার মা-বাবা গত 15 বছর কোনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাননি। সযত্নে এড়িয়ে গেছেন কোনো আমন্ত্রণ। গেলে যদি শুনতে হয়, 'তোমার ছেলেটা পড়াশোনায় এত ভালো ছিল। ডাবল স্টার, মেডিকেলে পড়ে, সে কেন এসব করে!' বাবা মাথা নিচু করে চেম্বারে যেতেন। পাড়ার রুুগিদের কেউই হয়তো ফিসটা হাতে গুজে দেওয়ার সময় হয়তো বলত, 'ডাক্তার সাব, আপনার এত ভালো পোলাটা ওগো লগে চলে, কিছু কন না!'
কিন্তু আমি মুক্তি পেয়েছি। মাদকাসক্তির যে নীল ছোবলটা আমাকে সারাটা দিন মোহাবিষ্ঠ রাখত, তা থেকে ঝাড়া দিয়ে উঠতে পেরেছি আমি। এখন আমার ঘূম ভেঙেই নেশার টাকা জোগাড়ের চিন্তা করতে হয় না। অফিস ফাঁকি দিয়ে বস্তি এলাকায় গিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয় না মাদক সংগ্রহের জন্য। দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না কখন শেষ হবে পুলিশ রেইড।
একজন মাদকাসক্ত নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তার মনোদৈহিক পরিবর্তন তো আছে। আর আছে সামাজিকভাবে একঘরে ও অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়া যা তাকে নানা অসামাজিক কাজ করতে বাধ্য করে। স্বজনদের থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। কেউ হারায় প্রেমিকা এমনকি বিয়ে করা বউকেও। বহু কোটিপতির ছেলেকে দেখেছি ঘরের জিনিস বিক্রি করতে, কিংবা ছিনতাই করতে।
কিন্তু এর শেষটা কোথায়। মাদকব্যবসায়ীরা যে কত উচু পর্যায়ে যোগাযোগ রাখে তা কল্পনাও করতে পারবেন না! এদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করাটাও কঠিন। পুলিশ পর্যন্ত এদের কেনা গোলাম- চোখে দেখা।
আপনার পরিচিত কেউ আসক্ত আছেন? চলুন চেষ্টা করি তাকে সাহায্য করা যায় কীনা। প্রথমত তার শুভানুধ্যায়ী বন্ধুরা এবং পরিবারকে একটা কথা মনে রাখতে হবে অ্যাডিকশন কখনোই পুরোপুরি সারে না। এটা ঠিক ডায়াবেটিসের মতো- নিয়ন্ত্রনে রাখতে হয়। তার প্রতি সহমর্মী হন তাকে বোঝান। তাকে নয়, তার আসক্তিকে ঘৃনা করুন।
দুধরণের চিকিৎসা এদেশে প্রচলিত। একটি ডিটক্সিফিকেশন-বিকল্প ড্রাগ দিয়ে চিকিৎসা। একধরণের কিনিক খোলা হয়েছে স্রেফ ব্যবসার খাতিরে যার ফলাফল লবডংকা। কারণ 15 দিন আপনি একজন অ্যাডিক্টকে ঘূমের ঘোরে রেখে কোনো উপকারই করতে পারবেন না। আমি নিজেই এমন এক ক্লিনিক থেকে বের হয়ে সোজা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে মালের আখড়ায় গিয়েছি।
আর এখানেই ত্রাতা হয়ে এসেছে এনএ (নারকোটিক্স অ্যানোনিমাস) প্রোগ্রাম। আশির দশকের মাঝামাঝি এদেশে আগমন এই ধারাটির, যাতে ওষুধ ব্যবহার করা হয় না- পুরো চিকিৎসাটা আধ্যাত্মিক ধরণের। আবার তাবিজ কবজ ভাববেন না। একজন অ্যাডিক্ট কী কারণে নেশা ধরল, কী ধরণের অপকর্ম সে করেছে, তার কী কী সমস্যা আছে- এগুলো জেনে তাকে সাহায্য করেন কাউন্সিলররা। সে মতেই তাকে মানসিক উদ্দীপনা দেওয়া হয়। সে প্রার্থনা করে তার ও তার মতো বাকিদের সুস্থতার জন্য। তাকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট রুটিনে চলতে হয়। রুটি বানানো থেকে, ঘর ঝাড়ু, বাসন মাজা ইত্যাদি কাজ নিজ হাতে করে সে বাস্তব জীবনটার সঙ্গে পরিচিত হয়, একটা শৃংখলাতায় আসে। প্রতিদিন চলে তার আত্ম বিশ্লেষন, অনুতাপ ও আত্মশুদ্ধি । বিদেশে কোর্সটা পাক্কা দেড় বছর, বাংলাদেশে তা 4 মাসের।
আবার অনেক চাকুরিজীবি যারা মোটা বেতনের চাকুরি হারাবেন এই ভয়ে ঝুঁকি নিতে চান না তাদের জন্য কোথাও কোথাও রয়েছে তিন মাসের কোর্সও- তবে ফি বেশি। এন এ প্রোগ্রাম সারা বিশ্বে কোটি কোটি অ্যাডিক্টকে সুস্থতার পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও তাই এর আবেদন বাড়ছে। তারপরও ব্যাপারটা গোপন, কারণ এর ভিত্তিটাই যে তাই- আমাদের বলা হয় তুমি তোমার সুস্থতা দিয়ে আরেকজন অ্যাডিক্টকে আকৃষ্ঠ করবে, যাতে সে তোমার মতোই মুক্তির পথ খোঁজে। যাই হোক এ নিয়ে লিখলে হয়তো মহাকাব্য হয়ে যে পারে। তাই প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য দিয়ে শেষ করছি। মোহাম্মদপুর স্যার সৈয়দ রোডে পরপর কয়েকটি গলিতেই রয়েছে বেশ কিছু মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের হেড অফিস। সাফল্যের বিচারে এদের কয়েকটির ঠিকানা দেয়া হলো।
1. জয়, 5/1 স্যার সৈয়দ রোড। আলাপন : 9110504 কাউন্সিলর জন বালা (0176118044) চার মাসের কোর্স 16 হাজার টাকা। সঙ্গে 1 মাস ফলোআপ অপশনাল
2. ক্রীয়া, কাউন্সিলর তরুুন দা, কোর্স 3 মাস 24 হাজার টাকা (চাকুরিজীবিরা অবৈতনিক ছূটি নিয়ে এখানে ভর্তি হতে পারেন)
3. বারাকা, কাউন্সিলর বকুল দা (0171339513), চার মাস, ফি -16 হাজার থেকে 18 হাজার
4. আপন : কোর্স 6 মাস 18 হাজার টাকা এর বাইরে আরো অনেক রয়েছে যে গুলো আসলে সুস্থতার চেয়ে ব্যবসাকেই প্রাধান্য দেয় বেশি। আরো যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে ফোন করতে পারেন আমাকে, আর সেটা একান্ত জরুরি হলেই- 0178128236।
যারা আসলেই ভাবছেন সুস্থ হবেন, কিন্তু উপায় খুজে পাচ্ছেন না- তাদের জন্যই এন এ প্রোগ্রাম, একবার চেষ্টা করে দেখুন না। চারটা মাস যদি আপনাকে আরো চলি্লশটা বছর সুস্থতার নির্দেশনা দেয় ও মাথা উচুকরে কাটাতে সাহায্য করে- ঝুঁকি একটু নিলেনই না হয়। তবে সবার আগে আপনার মধ্যে জন্ম নিতে হবে একটি মূলমন্ত্র- আমি সুস্থ হতে চাই। ধরে বেধে এ ধরণের চিকিৎসা হয় না, লাভ ও নেই।
পাদটীকা ঃ অনেকেই হয়তো ভাবেন মদ-গাঁজা ক্ষতিকর মাদকের আওতায় পড়ে না! তারা বোকার স্বর্গেআছেন। আর উলি্ল্লখিত কেন্দ্রেহেরোইন, ফেনসিডিল, ইনজেকশনের চিকিৎসাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমি নিজে চিকিৎস া নিয়েছি জয় থেকে। আমার সমস্যা ছিল পলি ড্রাগ। এহেন কোনো ড্রাগ নেই আমি নিইনি। এখন বছর তিনেক চলছে আমি রিকোভারি। বন্ধুরা প্রার্থনা করবেন যেন এই সুস্থতা মৃতু্যর আগ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারি। আমার সামনেই এখন মদের আসর, ধোয়ার আসর বসে। আমি সযত্নে তা এড়িয়ে চলি। একজন রিকোভারির সৌর্য্য তো এটাই- নিজের ওপর বিশ্বাস। অনেক তো খেলাম, আর কতো! দেখি এবার সুস্থ জীবনের মজা। আর সতীর্থ রিকোভারিদের উদ্দেশ্যে গাই অর্নবের সেই গানটির কিছু চরন: এসো আবার চড়াই উৎরোই আরো একটু দূরে যেতে হবে/ কতটা পথ এসেছি বাধা ভেঙে, বাকিটা পথ আর কিছু নয় তবে... ।।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ১২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



