আমার অবস্থা অনেকটা রিপ ফন উইন্কলের মতো! ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি 18টি বছর পেরিয়ে গেছে- অর্থহীন! আবার এই আমিই যেন ফিনিক্স পাখি- ধ্বংসস্তুপ থেকে জেগে উঠি নতুন জীবন নিয়ে। ড্রাগস আমার তারুণ্য-যৌবনের অনেকখানিই কেড়ে নিয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন বুঝছি সুস্থতার মজাই আলাদা। ষোলআনা না পারি জীবনের বাকি বারো আনা উপভোগ করছি ও করে যেতে চাই তারিয়ে তারিয়ে।
আগের পোস্টটিতেই লিখেছিলাম ড্রাগস থেকে বেরিয়ে আসার ঠিকুজি। কিন্তু সুস্থ্য হওয়াটা যত সোজা, সুস্থ্য থাকাটা অনেক অনেক বেশি কঠিন। একটা কথা বেশ চালু আছে নতুন রিকোভারিদের (আগে যারা অ্যাডিক্ট ছিলেন, এখন সুস্থ্য) মধ্যে, 'চার মাস একটা জায়গায় আটকা ছিলাম। ওখানে মালের সরবরাহ ছিল না বলেই হয়তো খাই নি। এখন যে বাইরের দুনিয়ায় যাব, ওখানে যদি না খেয়ে থাকতে পারি, তাহলে বোঝা যাবে প্রোগ্রাম কতটা সফলভাবে করতে পারলাম।'
এনএ প্রোগ্রামে একে বলা হয় 'ফেসিং দ্য রিয়েলিটি' বা বাসতবের মুখোমুখি হওয়া। অনেক রিকোভারি এ সময়টাতেই আবার রিলাপ্সের শিকার হন, ফিরে যান পুরনো জীবনে। তবে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে সেন্টারগুলোতে পুনঃচিকিৎসা বা রিভিউ (চার মার্সের কোর্স করা থাকলে এক মাসের) করাতে যারা আসের এদের বেশিরভাগই হয় ব্রোকেন ফ্যামিলি (বাবা-মায়ের সমপর্ক ভালো না বা বিচেছদ হয়ে গেছে) নয়তো বিবাহিত (ড্রাগস একটা পর্যায়ে যৌনজীবনকে এতখানি প্রভাবিত করে যে অনেক সময় সত্রীর চাপেই অনেকে স্লিপ করেন)। আরেক দল আছে যারা সারা বছর ড্রাগস নিয়েই থাকবে, যখন দেখা যাবে পুলিশি ঝামেলা বেড়েছে, দাম বেড়েছে, বা পারিবারিক সমস্যা গুরুতর, তখনই তারা সেন্টারগুলোতে যায়। এদের আমরা বলি প্যাটার্ন স্লিপ।
নিজের কথা বলি। সুস্থ হয়ে তো বের হলাম, কিন্তু পদে পদে প্রলোভন। 15 বছরের ওপর নানা ধরণের নেশা করেছি- আমার সার্কেলটাই তো অ্যাডিক্টদের নিয়ে। তারওপর খবর পেলাম আমার অনুপস্থিতি দুমাসের বদলে চার মাসের ওপর হয়ে যাওয়ায় আমার পোস্টে লোক নেওয়া হয়েছে। তার মানে বেকার আমি। সন্দেহ নেই পরিবার যদি আমার পাশে এসে না দাঁড়াত- আমি হয়তো পিছলে যেতাম। এবং আমার ভালো বন্ধুরা এবং প্রথম আলোয় সপোর্টস বিভাগে আমার কলিগরা (মোসতফা মামুন, আসিফ আহমেদ রম্য, আশীষ চক্রবর্তী, সুমন হক, সনৎ বাবলা-সবাই এখন যায়যায়দিনে) নিয়মিত ফোনে খোঁজ নিয়েছে। ভেঙে পড়তে নিষেধ করেছে, উৎসাহ যুগিয়ে গেছে।
নিয়ম হলো ঢাকা অফিসে প্রতি সপ্তাহে দুদিন এনএ মিটিং হয়, তাতে যোগ দেওয়া। শুরুতে মিস দিতাম না একদম। আমার ভালো লাগা, খারাপ লাগা এমনকি যদি নেশা করার ইচেছ জাগে সেটাও বলতাম, অন্যরাও বলত। এই শেয়ারিংটাই ছিল সবচেয়ে জরুরি। এরপর আমরা কয়েকজন রিকোভারি মিলে সংসদ ভবনে প্রতিদিন বিকেলে আড্ডা দিতে শুরু করলাম। এভাবেই আমাদের নিয়মিত শেয়ারিং হতো। অনেকের অনেক রকম সমস্যা। কেউ কেউ পারিবারিকভাবে অসচছল। তার সিগারেট খাওয়ার টাকাটাও সে যোগাতে পারে না। ওখানে এমনও কেউ কেউ ছিল, যদি খারাপভাবে চায়, তাহলে প্রতিদিন হাজারখানেক ইনকাম করতে সম। কিন্তু সেন্টার থেকে বলে দেওয়া বরাদ্দের 15 টাকা দিয়েই তারা গোটা দিনের চা সিগারেট যাতায়ত ম্যানেজ করেছে। আমার কথা আলাদা- এই অর্থে যে টাকা থাকলেই স্লিপ করব এই ভাবনা আমার আসেনি কখনো। বড়াই ধরবেন না। পাঁচশ বা হাজারখানেক টাকা বাসা থেকে চাইলেই আমি পেয়েছি প্রতিদিন। খরচ করেছি, বন্ধুদের সাহায্য করেছি, বাকিটা ফেরত দিয়েছি মাকে। কিন্তু তা দিয়ে নেশা করার চিনতা। একদমই আসেনি। সিগারেট ছাড়া কিছুই খাওয়া হয় না আমার।
তারপরও ওই যে বললাম পদে পদে প্রলোভন- ওটা তাড়িয়ে বেড়িয়েছে ঠিকই। পাড়ার অ্যাডিক্ট বন্ধুরা লোভ দেখিয়েছে- আরে একদিন খা, কী হবে! নয়তো শাসিয়েছে- হ, দেখুম কয়দিন ভালো থাকস। আমি নিশ্চুপ থেকে এড়িয়ে গেছি। এড়িয়ে গেছি আমার জন্য সপর্শকাতর জায়গাগুলো যাকে প্রোগ্রামের ভাষায় বলে ব্যাড বাউন্ডারি।
এই সময়টাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ধরলাম। সেন্টারে প্রতিদিন সকালে প্রার্থনা করতে হতো, আর একটা অসাধারণ প্রার্থনা ছিল যেটা এখন দেখি বদলে গেছে। তবুও তুলে ধরছি-
'হে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা আমাকে শানতি দাও, যাতে আমি পরিবর্তন করতে সক্ষম নই এমন সমসত কিছু মেনে নিতে পারি। সাহস দাও, যাতে আমার পক্ষে যা কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব, আমি তা পরিবর্তন করতে পারি। এবং জ্ঞান দাও, যাতে এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারি।'
এই প্রার্থনাই আমাকে সবধরণের প্রলোভন ও মানসিক চাপের মুখে সুস্থির রেখেছে। অ্যাডিক্টদের মুল সমস্যা হচেছ চাপের মুখে ভেঙে পড়া। বাসায় হয়তো টাকা হারালো কারো, ঘুরেফিরে সন্দেহ করা হলো হয়তো তাকেই- যেহেতু রেকর্ড খারাপ। দ্বিতীয়ত তারা ভীষণ অভিমানী। প্রতিটি সেন্টার থেকে সুসপষ্ঠ নির্দেশ দেওয়া হয় কেউ যেন দুবছরের মধ্যে বিয়ে না করে এবং আবেগীয় কোনো সমপর্কে না জড়ায়। অনেক রিকোভারি প্রেম জটিলতায় স্লিপ করেছে। রিভিউ অবস্থায় কাউন্সিলররা তাদের প্রেমিকাদের ডেকে এনে সমস্যা সমাধান করেছেন দেখেছি।
আর বেকারত্বও একটা বড় ব্যাপার বটে। আমার জায়গায় লোক নেওয়া হলেও আমাকে কিন্তু বরখাসত করা হয়নি। বরং 2003 সালের 4 নভেম্বর আমি নিজে ইসতফা দিয়ে কতর্ৃপক্ষকে বাটে ফেলে দিই। সে অন্য গল্প। যা হোক এমন সময় চাকুরির অফার আসে যায়যায়দিন ও সমকাল থেকে। প্রথম আলোর বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে আমি প্রথমে যোগ দিই সমকালে কিন্তু সেখানে বাকিদের পছন্দ না হওয়ায় যায়যায়দিনে। দেড় বছরের ওপর ফাও বেতন তুলছি আর খাচিছ।
বিয়ে তো করতে পারছি না, প্রেম ও নিষেধ। কিন্তু অবদমিত কাম বড়ই মারাত্মক তাড়না! নিজেকে সামলে রাখাটা যে কত কষ্টের সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি ও এখনো পেয়ে যাচিছ। বুড়ো হয়ে গেছি, কিন্তু কোনো ছুড়ি তো আমাকে পছন্দ করে না। যাক, আপাতত বেশ কিছু ভালো বান্ধবী আছে আমার যাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময়টা ভালোই কেটে যায় আমার। কাজ করছি, সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবে আছে ইন্টারনেট আর সামহোয়ার ইন দ্য ব্লগের বন্ধুরা। 7 বছর পর গিটার হাতে নিয়েছি আবার, কবিতাও লিখছি। মন খারাপ হলেই চলে যাই সাভারে জয় সেন্টারে- মনটা খুব ভালো হয়ে যায়। আমাদের দেখে নতুন যারা পেশেন্ট তারা উদ্দীপ্ত হয়- এরা পারলে আমরাও নিশ্চয়ই পারব।
রিকোভারিদের অবশ্য পালনীয় যে সব :
1. অ্যাডিক্টদের এড়িয়ে চলা, দীর্ঘদিনের বন্ধু হলেও দুয়েকটা কথা বলে কোনো অজুহাত দেখিয়ে কাটিয়ে দেওয়া। অবশ্য সময় যত বেশি যাবে, অনতর ততই মজবুত হবে।
2. মানসিক চাপে না ভোগা। কোনো ভালো বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করুন কেটে যাবে। দুঃখবিলাসকে প্রশ্রয় দেবেন না।
3. বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের রিকোভারি হচেছন বারাকার পরিচালক বকুল দা। আমার প্রথম কিন বার্থডেতে ফিডব্যাক দিয়েছিলেন- দ্যাখ, ভালো থাকতে চাইলে একটা সাধারণ মানুষ যা করে তাই কর। ওরা দুঃখ পাইলেই মদের বোতল বা গাঞ্জার কলকি নিয়া বসে না। হয়তো মনে মনে কান্দে। তোরাও তাই করবি। আকাশে মেঘ মাল খামু, রোইদ উঠলেও মাল খামু- এই আইডিয়া থাইকা বাইর হ। জীবনে দুঃখ কষ্ঠ আনন্দ অন্যরা যেমনভাবে সামলায় উপভোগ করে, সেটা ফলো কর। এটাই হইল জেনুইন বাসতব মোকাবেলা। তোরা এখনও খাস- এমন সন্দেহ করা হবে। তোদের টিটকারি দেওয়া হবে। চুপ থাকবি। আকাশে সূর্য উঠলে সবাই দেখে। তোদের সুস্থতাই তগো হইয়া সব জবাব দিব। অসাধারণ কথাগুলো।
4. বিশেষ উৎসবের দিনগুলো- যেমন ঈদের আগে চান রাত, শবেবরাত, থার্টি ফার্স্ট, নববর্ষ ইত্যাদি সময়গুলো সেন্টারে ঢু মারুন।
5. পোস্ট অ্যাকুউট উইথড্রয়ালসিন্ড্রম (পিএডব্লু বা পও) দুবছর পরও একজন রিকোভারিকে স্লি্লপ করাতে পারে। পুরো ব্যাপারটাই আসলে মনে। শারীরিক কষ্টটা তাড়াতে 14 দিন যথেষ্ট, কিন্তু মনের টান বড় টান। আত্মবিশ্বাসী হোন- কোনো পরিস্থিতিতেই আর ড্রাগস নয়।
আমার সামনে এখন মদের আসরও বসে। আমি নির্বিকার কোকের বোতলে চুমুক দিয়ে যাই। কদিন আগে চিটাগাং গেলাম টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে। মনসুরাবাদে বন্ধুদের একটা পুরনো আড্ডায় গেলাম। কথা প্রসঙ্গে উঠল আমার গাজা বানানোর সুনামের কথা (শর্মী, রোলিং!), ওদের অনুরোধে বানিয়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের পথ ধরলাম। কারণ পরিস্থিতি বিপজ্জনক। যদি অনুরোধে গাজা বানাতে পারি, খেতেও তো পারতাম। পথে ফোন করলাম ঘনিষ্ঠ এক রিকোভারিকে। তার সঙেগ শেয়ার করলাম আমার পাপ।
যাই হোক, যেভাবেই হোক সুস্থ্য আছি, সুস্থ্যতাকে ধরে রেখেছি। অতীত নিয়ে আমার কোনো অনুতাপ নেই। কিন্তু ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন প্রচুর যার নির্মাণ চলছে বর্তমানে। প্রোগ্রামে রিকোভারিদের উৎসাহ দেওয়া হয় তাদের ক্লিন বার্থডেতে (সুস্থতার এক বছর পূর্তি মানেই পুনঃজন্মদিন, যা রীতিমতো উৎসব করে পালন করা হয় সেন্টারগুলোতে), বিজয়ীদের সঙ্গে থাক, এবং সেভাবেই বার বার ফিরে এসো (স্টিক উইদ দ্য উইনার্স অ্যান্ড কিপ কামিং ব্যাক)।
এখন পর্যনত টিকে আছি। ভবিষ্যত বলতে পারব না। তবে প্রার্থনা করবেন সবাই, প্রোগ্রামের ভাষায়- একটা একটা দিন করে যেন সুস্থ থাকতে পারি। ওয়ানডে অ্যাট আ টাইম!
পাদটীকা : এক সতীর্থ রিকোভারিকে (এই ব্লগেরই) লেখাটা সমপর্কে বলতেই, সে আমাকে প্রথমে নিষেধ করল। তারপর বলল ভাই আপনে তো অসত্র নিজেই তুইলা দিতাছেন। এখন দেখবেন আপনার লেখায় মনতব্য আসব- কী আবার খাওয়া ধরছেন? প্রশ্নটার উত্তর নেই আমার কাছে। কিন্তু... আমার মন জানে আমি জানি!
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




