somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যাদের রক্তে মুক্ত এদেশ (ধারাবাহিক)-22

০১ লা এপ্রিল, ২০০৬ রাত ৩:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকায় গেরিলা তৎপরতা :

ক্যাপ্টেন হায়দারের নেতৃত্বে আগরতলায় একটি ক্যামপে কমান্ডো আক্রমণের কলাকৌশল শেখানো হচ্ছিল। 2 নং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ এই ক্যামপের 16 জন কমান্ডোকে নিয়ে একটি সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার জন্য জুন মাসে বিশ্বব্যাঙ্কের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। খবর পেয়ে মেজর খালেদ তার সুইসাইড স্কোয়াডকে ঢাকায় পাঠান। ঢাকা আসার পথে দলের 4 জন স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ফিরে যান। বাকি 12 জনের প্রত্যেকের কাছে ছিল 4টি করে গ্রেনেড ও 20 পাউন্ড বিস্ফোরক।
6 জুন তারা ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন। 8 জুন জিন্নাহ এভিনিউতে গ্রেনেড বিস্ফোরন ঘটান
এবং দুপুর 2 টার দিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের এক সামরিক অফিসারের বাসভবনে গ্রেনেড ছোড়েন। 9 জুন সামরিক জান্তা বিশ্ব অর্থনৈতিক সাহায্যদাতা সংস্থার সদস্যদের সম্মানে হোটেল ইন্টারকনে (এখন শেরাটন) এক নৈশ ভোজের আয়োজন করেন। প্রিন্স সদরুদ্দিনসহ সংস্থার বেশ কিছু প্রতিনিধি ও বিদেশী সাংবাদিক তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 6 জন গেরিলা নির্দিষ্ট সময়ে হোটেলের মূল প্রবেশ পথে বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের গাড়ির ওপর পরপর তিনটি গ্রেনেড ছোঁড়েন। পুরো ধ্বংস হয়ে যায় তা। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে লোকজনের ছুটাছুটি ও চিৎকার শুরু হয়ে যায়। এতে বিদেশী প্রতিনিধিদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। এদিকে গেরিলারা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যান রমনা থানার কাছে জনৈক জামাত নেতার বাড়ি। সেখানে তখন পাকবাহিনীর দালাল শান্তি কমিটির এক সম্মেলন হচ্ছিল। হঠাৎ করেই গেরিলারা গাড়ি নিয়েই বাড়ির ভেতর ঢুকে তিনটি গ্রেনেড ছুড়ে বেরিয়ে আসেন। সেখান থেকে তারা যান দৈনিক পাকিস্তান (পরে দৈনিক বাংলা) ও মর্নিং নিউজ অফিসের সামনে। চলন্ত গাড়ি থেকে তারা সংবাদ পত্র অফিসের মধ্যে গ্রেনেড ছুড়ে কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক দালালকে হত্যা করেন। পরে গেরিলারা পুরানো পল্টনের গলিতে গাড়িটা পরিত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যান। প্রসঙ্গত, 9 জুন সন্ধ্যায় গুলশান এলাকার এক অবাঙালীর কাছ থেকে গাড়িটি ছিনতাই করেন তারা।
হানাদার বাহিনীর একটা ক্যামপ ছিল ফার্মগেটে। এখানে একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কিছু সেপাই থাকত। চলাচলকারী গাড়ি ও পথিকদের তারা অনুসন্ধান করত। এতে গেরিলাদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিল। তাই আগস্টের শুরুতে 10 জনের একটি গেরিলা দল এই ক্যামপ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। আক্রমণে তারা দুটো গাড়ি ব্যবহার করেন। 1 নং বা সামনের গাড়িটি ছিল অপারেশনের, দ্বিতীয়টি ছিল তাদের কাভার দেওয়ার জন্য। ফার্মগেট ওভারব্রিজের রাস্তার দুপাশে তখন পাকবাহিনীর কড়া প্রহরা ছিল।
সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় গেরিলারা সেখানে পৌছে দেখেন শত্রুসেনাদের কয়েকজন টুলের ওপর বসে গল্পে মশগুল, বাকিরা দাঁড়িয়ে। প্রথমেই দুজন গেরিলা দুটো এলএমজি দিয়ে গার্ডদুজনকে গুলি করেন। এরপর গাড়ি থেকে নেমে ব্রাশ ফায়ার শুরু করেন ক্যামপের ভেতর। ত্বরিৎ এই আক্রমণে হতভম্ব খানসেনারা ছুটোছুটি শুরু করে দিল। এরই মধ্যে 1 নং গাড়ি ড্রাইভার এমনভাবে গাড়ি ঘোরালেন যেন ডিগবাজি খেয়ে তা সোজা হল! গেরিলা দুজন গাড়িতে উঠে হানাদারদের প্রধান ক্যামপ লক্ষ্য করে কয়েকটা গ্রেনেড ছুড়েন। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যান তারা অপারেশন শেষে যাতে নিহত হয় 9 জন অফিসার সহ 17 জন শত্রুসেনা।
এই অভিযানগুলো চালাচ্ছিলেন একটি সংঘবদ্ধ গেরিলাদল যাদের ডাকা হতো মায়া (বর্তমান আওয়ামী লিগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন মায়া বীর বিক্রম) ক্র্যাকপ্লাটুন নামে। আগস্টের ওই ঘটনার পর 5 জন গেরিলা একটি টয়োটা করোলায় আইউব গেটের (আসাদ গেট) কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন মিরপুরের দিক থেকে আসা এক আর্মি কনভয়ের মুখোমুখি পড়ে যান তারা। পেট্রোল নেয়ার ভান করে টয়োটা কাছের এক পামপে থামালেন গেরিলারা। কনভয় এগিয়ে আসার আগেই দ্রুত একজন গেরিলা রাস্তায় কয়েকটি মাইন পেতে দেন। কনভয়ের প্রথম দুটো গাড়ি নিরাপদেই পার হলো কিন্তু তৃতীয় গাড়িটির চাকার আঘাতে চারদিক কেপে উঠল বিস্ফোরনে। ততক্ষণে টয়োটা হাইকোর্ট ও ময়মনসিংহ রোডের ক্রসিংয়ের ট্রাফিক রাউন্ডে পৌছে গেছে। এখানে গেরিলারা বিস্ফোরক ছুড়ে অবাঙালী যাত্রীবাহী একটি ডাবল ডেকার বাসকে বিধ্বস্ত করেন।
পরদিন নর্থসাউথ রোডের চাংওয়া রেস্তোরার উল্টোদিকে রাস্তায় দাঁড় করানো দুটো আর্মি জিপের চাকার নিচে এমকে14 মাইন রেখে সটকে পড়েন গেরিলারা। প্লাস্টিক মাইন আধঘণ্টা পর প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এইসঙ্গে গেরিলারা আরো কিছু অপারেশন করেন, 1. গ্যানিজ ও ভোগ ফ্যাশন বিপনী কেন্দ্র অপারেশন, 2.গ্রিনরোড মোড়ের পেট্রল পামপ অপারেশন- এখানে সায়েন্স ল্যাবরেটরির রাস্তায় এমকে16 মাইনের আঘাতে একটি মিলিটারি জিপ শত্রুসেনা সহ উড়ে যায়, 3. কমলাপুর স্টেশন অপারেশন, 4. টয়েনবি সার্কুলার রোড গভর্নর হাউজের পাশে পিএনও (পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল বা দাউদ পেট্রোলিয়াম লিঃ) পেট্রল পামপ অপারেশন। (চলবে)

ছবি: লুঙ্গি খুলে চেক করা হতো হিন্দু কীনা
2. মেলাঘর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং
3. 2 নম্বর সেক্টরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মেজর খালেদ (মাঝে)
পাদটীকা : কেউ এই ব্যাপারে আরো জানতে পড়তে পারেন জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি ও আনিসুল হকের মা বইটি। বা দেখতে পারেন হুমায়ুন আহমেদের আগুনের পরশমনি।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৯
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - 'সত্য বলার সনদ'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮



রাত দুটায় রাকিবের ফোন বেজে উঠলো।

—ভাই, আপনার মুক্তিযোদ্ধা সনদটা কোথায়?

—কেন?

—একজন আমেরিকা-প্রবাসী ব্লগার বলেছেন, আপনি নাকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমার সনদ তো আলমারিতে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ রক্ত ঋণ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৪




আমাদের পরিবারে সাব্বির নামটা উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ । সাব্বির ভাইয়া আব্বুর প্রথম সংসারের একমাত্র সন্তান আর আমরা দুই ভাই -বোন তার দ্বিতীয় সংসারের।
সাব্বির ভাইয়ার মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আর্কাইভ থেকে: আহ প্রিয়তমা, মিলনের গল্প জানো না

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:১৫



ফেলে আসা এক সড়কের কথা মনে পড়ে। হলুদ নিয়ন বাতির ম্লানাভ সন্ধ্যেবেলা। পলেস্তারা খসা বয়োজীর্ণ দেয়াল। দুয়েকটি রিক্সা। সিটের ’পর পা তুলে আঁটোসাটো ঝিমানো চালক। খেলা শেষে ঘরে ফেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×