তিন.
আমাদের বাস এবার সাগরের তীর ছেড়ে পাহাড়ের দিকে হাটা দিল। সাগর জলের আছড়ে পড়া শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বাতাসে। তবে বাসের উইন্ডো গ্লাসে লেগে থাকা স্বচ্ছ জলের কণাগুলো এখনো চিক চিক করছে।
আমি আবার উইন্ডো গ্লাস দিয়ে বাইরে চোখ রাখলাম। দু'দিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুব বেশী নয়। এখন গ্রীষ্মকাল। পাহাড়ের গাছগুলো সবুজ পাতায় ভরে আছে। বেশীর ভাগই পাইন কিংবা ওক্ জাতীয় গাছ। চিরল পাতাগুলো উর্ধমুখী। গাছগুলো কেমন যেন ফানেলের মত। নীচের দিকটা প্রসস্থ আর উপরের দিকটা সুচালো। শীত প্রধান অন্ঞলের গাছগুলোর এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বরফ পড়লে গাছে আটকে থাকে না। পড়ে যায়।
আমাদের বাস কিছুক্ষণ পরপরই টানেলের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। যেন একটা অজগর সাপের পেটের ভিতর ঢুকে যাচ্ছি। কোনটা ছোট আবার কোনটা পার হতে ৫-১০ মিনিট লেগে যাচ্ছে। জাপানের হাইওয়েগুলোতে এমন অসংখ্য টানেল আছে।
শুধু টানেল নয়, কখনো কখনো এক পাহাড়ের সাথে অন্য পাহাড়ের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে সেতুর মাধ্যমে। কোন নদী নেই, অথচ বিশাল বিশাল সেতু। নীচে তাকালে পাইন গাছের সুচাগ্র দেখা যায় কেবল। তাও কত নীচে, ঠাহর করা কষ্টকর। আমাদের বাস এমন এক হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলল। কখনো পাহড়েরর ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, কখনো পাহাড়ী সেতু আবার কখনো পাহাড়ের একদম ধার ঘেষে সাই সাই ছুটে চলা। নীচে তাকালে কলজের অবশিষ্ট জলটুকুও নিঃশেষ হবার উপক্রম হয়।
মাঝে মাঝে দেখা যায় দুই পাহাড়ের মাঝখানের ছোট্র সরু উপত্তকা। তাতে দশ-বারটি ঘর নিয়ে ছোট ছোট গ্রাম। পাহাড়ী গ্রাম হলেও তাতে অবশ্যই ইলেক্ট্রিসিটি আছে। টেলিফোন ও হয়তো আছে। হাইওয়ে থেকে ছোট্র সরু পাকা রাস্তা সেই গ্রামে গিয়ে মিশেছে। গ্রামের অব্যাবহৃত জমিতে ধানের চাষ হয়। অন্যান্য সবজির চায়ও হয়। তবে ধানই প্রধান। এখন জমিতে উঠতি ধানের গাছ। কি অসম্ভব সবুজ। ধান ক্ষেত দেখে আমার গ্রামের কথা মনে পড়ে গেল। এখানে ধানক্ষেত সবুজ বটে কিন্তু তাতে বাতাসের দোলা নেই। সেই আদিগন্ত বিস্তৃত বিল জোড়া ধান ক্ষেত। চৈত্রের মাতাল হাওয়ায় যৌবনবতী টগবগে ধানের শীষের সে কি মাতামাতি। বিলের একপ্রান্তের সেই বড় আম গাছটার নীচে বসে ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে আসা চৈতালী হাওয়ায় মন জুড়ানো। কোকিলের প্রাণ উদাস করা একটানা সুর। আমের মুকুলের মাতাল করা ঘ্রাণ। জাপানের এই ছোট্র পাহাড়ী গ্রামের ধান ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে মনের জানালা দিয়ে আমি যেন কোন এক বিস্মৃত অতীতে হারিয়ে গেলাম। দৃষ্টি থেকে পাহাড়ী সেই গ্রাম হয়তো হারিয়ে গেছে অনেক্ষণ, কিন্তু মনের জানালা থেকে আমার বিস্মৃত অতীত যেন হারাতে চায়না।
প্রায় দুই ঘন্টার পথ চলে এসেছি। আমাদের বাস যে পাহাড়ে পাহাড়ে চলতে চলতে অনেক উপরে উঠে গেছে খেয়াল করিনি। চারদিক কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। এখানটা কিছুটা সমতল মনে হল। পাহাড়ের উপর কোন মালভুমির মত কিছু হয়তো। একটা ছোট্র গ্রামও দেখতে পেলাম। গ্রামের কোল ঘেষে ছোট্র একটা নদী বয়ে চলেছে। নদীর দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেত। চার দিকে সবুজ পাহাড়। কোন মানুষজন চোখে পড়ল না। কি অদ্ভুদ সুন্দর গ্রাম। প্রকৃতির সাথে মিশে কেমন একাকার হয়ে আছে মানুষের জীবন। মানুষ এবং প্রকৃতিকে আলাদা করার কোন উপায় নেই। এরা যেন একে অপরের অংশ হয়ে আছে। একদিকে বাদ দিলে অন্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একা হয়ে যাবে।
বাসের উইন্ডো গ্লাসটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সেই ঝাপসা হয়ে যাওয়া গ্লাসের ভিতর দিয়ে আমি একদম কাছের পাহাড়টার একদম চুড়াটা দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দেখতে পারলাম না। তবে যেটা দেখলাম, সেটা যে আমার জীবনে এই প্রথম দেখা! মনের সমস্ত একাগ্রতাকে একত্রিত করে, চোখের সমস্ত কৌতুহলকে মিলিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম একটু দূরে পাহাড়ে হেলান দিয়ে জমে থাকা মেঘের দিকে। (চলবে)
পাহাড়ে হেলান দিয়ে...... মেঘ ঘুমায় ঐ।।। (পর্ব-৩)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে----- ড্রাকুলা হাসিনা।

ড্রাকুলার হাসিনা তো আর এমনি এমনি বলেনি যে, আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে।
রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা মূলত ভারতকে একতরফা সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন
তুমি অমর দিশারী

তুমি সূর্য কিনারায় উঁকি দিয়েছ বলে-
মা.. তুমি সূর্য আলো!
তোমার জন্মদিনে চাঁদ পৃথিবী হাসছে
আমরা যে গর্বিত গর্বিত-
মা.. তুমি সূর্য আলো;
তোমার অনুশাসন
আমাদের প্রেরণার উড়ন্ত পায়রা
শান্তির জ্বলন্ত মশাল
তোমার জন্ম সাতশত মহীয়ান-
আমরা শুধু গর্বিত... ...বাকিটুকু পড়ুন
অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয়! বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে!!! :-ls B-)

অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, অতুলনীয়,অবিস্মরণীয় যে বিশেষণই ব্যবহার করি না কেন বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ব বুঝাতে কোন শব্দ ভান্ডারই যেন যথেষ্ট নয়। আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি বাংলাদেশের এমন পারফর্মেন্স দেখে!! বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন
Humans are (not) from Earth-রূপের বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং

আমাদের মনে কি এমন প্রশ্নের উদয় হয় না যে,"আমরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অবয়ব, গায়ের রঙ, চুল কিংবা পুরুষদের মুখের দাড়ি-গোঁফের দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত... ...বাকিটুকু পড়ুন
গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।
বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।