এক
সেই সকাল থেকে বিরামহীন ঘুমিয়েছে আদিত্য। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। বড় জানালার স্বচ্ছ কাঁচের ভিতর দিয়ে বিকালের হেলে পড়া রোদ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সূর্য্যরে তেজ যে এখনো মরেনি, আলোর দ্বীপ্তিতে সেটা ঠিকই বুঝা যায়। দুপুরের খাবারটা এখনো পেন্ডিং রয়ে গেছে। প্রশান্তির দীর্ঘ ঘুমের পর চোখ দু’টো খোলার সাথে সাথে শরীরের সমস্ত নিউরণগুলোও যেন জেগে ওঠেছে। ঘুমিয়ে থাকা চিন্তারও আবার সচল হচ্ছে। তবু কেমন যেন একটা অলসতা লেগে আছে ঘুম জড়ানো চোখে মুখে। আরো যদি একটু ঘুমানো যেত। কিন্তু শরীর বলে দিচ্ছে আর ঘুমানো যাবে না। যতটুকু ঘুমের দরকার ছিল শরীরের, ততটুকু হয়ে গেছে। এবার শরীরের দরকার শক্তির। পাকস্থলি জানান দিচ্ছে শরীরের শক্তির চাহিদার কথা। সতরাং খেতে হবে এখন।
আদিত্য আরো কিছুক্ষণ অলস ভাবে এপাশ ওপাশ করল। তারপর একসময় নরম বিছানার আদর ছেড়ে ওঠতেই হল। কি করবে সে এখন? একটু চিন্তা করল। প্রথমে বাথরুমে ঢুকে ঘুমের মতই একটা লম্বা গোসল দিতে হবে। তাহলে শরীরটা একদম সতেজ হয়ে যাবে। খাবার কি আছে? ফ্রিজ খুলে দেখল আদিত্য। হ্যাঁ, আছে। মিষ্টি কুমড়া দিয়ে একটু সরুয়া সহ দুইদিন আগের রান্না করা মুরগীর গোস্ত আর করল্লা ভাজি। আজকের মত চলে যাবে। তারপর কি করবে? হ্যাঁ, চুল গুলো বড় হয়ে গেছে। কাঁটাব কাঁটাব করেও কাঁটানো হয়নি। আজকে সেটা সারতে হবে। তারাপর? তারপর কি করবে সেটা আর ঠিক করতে পারল না আদিত্য ।
দেয়াল ঘড়িতে দুটো বাজার ঘন্টা বাজল। জাপানি স্টাইলের মিউজিকটা খুব ভাল লাগে আদিত্যের। ঘড়িটা সে কেনেনি। কিছুদিন আগে রেজাউল করিম নামের এক ভদ্রলোক এখান থেকে টোকিও চলে যাওয়ার সময় বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র দিয়ে গেলেন। তার মধ্যে ঘড়িটিও ছিল। তবে কিছু ইয়েনের বিনিময়ে তাকে দুটো বেটারী কিনে ঘড়িটাকে সচল করতে হয়েছিল। আহামরি তেমন কোন ঘড়ি নয় এটা। কিন্তু ঘন্টার মিউজিকগুলো শুনে আদিত্যর মনে হল, ইয়েনগুলো তার জলে যায়নি। সকাল ছ’টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত একঘন্টা পরপর ঘন্ট বাজে। রাত বারোটা থেকে সকাল ছ’টা পর্যন্ত ঘন্টা বাজা বন্ধ থাকে। ব্যাপারটা আদিত্যের পছন্দ হয়েছে।
টেবিলের উপর রাখা অদিতির ছবিটার দিকে চোখ পড়ল আদিত্যের। বছর খানেক আগে শেষ বার যখন দেশে গিয়েছিল, তখনকার তোলা ছবি। অদিতির পাশে আদিত্যও বসে আছে। বড় বড় চোখ জোড়ায় কি যে মায়া। কত না বলা কথা। সে মায়া ছেড়ে কি ভাবে আসতে পারল, আদিত্য বুঝতে পারেনা।
অদিতির মা রাহেলা মুসতারি আদিত্যের বোনের অনেক দিনের পরিচিত। সেই সুত্রে আদিত্যের বোনের বাসয় অদিতিদের আসা যাওয়া অনেকদিনের। জাপানে আসার কিছুদিন আগে বোনের বাসায় অদিতির সাথে পরিচয় হয় আদিত্যের। এর আগেও হয়তো দু-একবার অদিতিকে দেখেছে সে। কথা বলা হয়নি তেমন। কিন্তু সেদিন একদম মুখোমুখো হয়ে পড়াতে অনেক কথাই বলল তারা। এর আগে আদিত্য ঠিক এত কাছ থেকে এত ভাল ভাবে দেখেনি অদিতিকে। সেদিন অদিতিকে দেখে আদিত্য যেন বিষম খেল। এই সেদিনের পুচকি মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল! মেয়েরা কি কোন একটা বয়সে এসে খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়? হয়তো তাই। না হলে এই সেদিনের এইচ. এস. সি. তে পড়া মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল কিভাবে।
অদিতি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চতুর্থ সেমিস্টার শেষ করেছে মাত্র। চোখে মুখে উচ্ছলতার ঝিলিক। নতুন নতুন স্বপ্নেরা চোখের তারায় খেলা করছে। মানুষের মন এত চঞ্চল আর উচ্ছল হতে পারে, আদিত্য যেন ভুলেই গিয়েছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংসারিক টানাপোড়নে কি প্রচন্ড অস্থিরতায় কেঁটেছে আদিত্যের গত সাতটি বছর। একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও সে পায়নি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যথেষ্ট সুঠাম আর পৌরুষদ্বীপ্ত আদিত্যের জন্য অনেক মেয়েই পাগল ছিল। বন্ধুরাও বলেছিল আদিত্যকে এসব কথা। কিন্তু সে সবের দিকে মনযোগ দেয়ার সময় কোথায় আদিত্যর। কত তাড়াতাড়ি নিজের পায়ে দাড়াতে পারবে, সেদিকেই ছিল তার সমন্ত মনযোগ। এসব ভাবতে গিয়ে সে মানুষের অনেক সহজাত এবং স্বাভাবিক আচরণ ভুলে যেতে বসেছে। সে তার চার পাশটাকে নিজের মত করেই ভেবেছে। অস্থির, চোপচাপ আর অনিশ্চিৎ।
অদিতির উচ্ছলতা আর চঞ্চলতায় আদিত্য নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে। সে ভাবে, শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিা পাওয়ার জন্যই কি একজন মানুষ তার মনের সবকটা জানালা বন্ধ করে দিতে পারে। মনের সমস্ত চাওয়া পাওয়াকে উপেক্ষা করতে পারে। ভাললাগা-মন্দলাগাকে পাশ কাটাতে পারে। আর আদিত্য সেটাই করে এসেছে এতটা দিন। কিন্তু অদিতির এই প্রাণ খোলা উচ্ছলতা আদিত্যের মনের সব কটা জানালা খুলে দিয়েছে। সেই জানালা দিয়ে আদিত্য অনেক দিন পরে আবার দেখতে পায় গ্রামের মেঠো পথে একাকি হেটে যাওয়া একটা ছোট্র কিশোরকে। চৈত্রের প্রচন্ড রোদের মাঝেও পাড়ায় পাড়ায় দাপিয়ে ফেরা এক ডানপিটে বালককে। বৈশাখের দুরন্ত বাতাসে নীল আকাশের সীমানায় ঘুরি উরিয়ে দিয়ে তার পিছু পিছু ছুটে চলা এক দুরন্ত বালককে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে কাঁদা-পানিতে একাকার হয়ে বাড়ি ফেড়া, মায়ের মিষ্টি বকুনি খাওয়া। বাবার বকুনি খেয়ে দু’দিন লুকিয়ে থাকা ভীতু অভিমানি আদিত্যকে। এই গাছের মিষ্টি আম, ওই গাছের সিঁদুর রাঙ্গা টক আম কুড়ানো সেই আদিত্য এতটা দিন কিভাবে সব ভুলে ছিল।
অদিতির সাথে পরিচয়ের পর আদিত্য তার ভুলে যাওয়া শৈশবের সেই চঞ্চলতাকে ফিরে পায়। মনের খোলা সেই জানালা একদমই অরক্ষিত থেকে যায়। আর অরক্ষিত সেই জানালা দিয়ে কখন যে অদিতি মুক্ত বাতাস হয়ে ঢুকে পড়ল, আদিত্য বুঝতেই পারলনা। খুব তাড়াতাড়ি তাদের মাঝে ভাললাগা তৈরী হয়ে যায়। এবং সেই থেকে ভালবাসা। একদিন পরন্ত বিকালে আদিত্য অদিতিদের বাসার ছাদের কার্নিশে বসে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের এবং সাফল্যের কথাটা বলে-
ঃ অদিতি, জাপানের স্কলারশিপটা আমার হয়ে গেছে।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৪:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


