somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবার কি ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিৎ!

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সকাল ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের দেশে ১৮ বছর হলেই ভোট দেওয়ার উপযুক্ত হিসাবে গন্য করা হয় । কেবল আমাদের দেশেই নয়, বোধ কর এটা পৃথিবীর প্রায় সকল গনতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেই সঠিক । একটা নির্দিষ্ট বয়স হলেই তার ভোট দেওয়ার ক্ষমতা আসে । ভোট দেওয়ার ক্ষমতা মানে হচ্ছে আপনি নিজে দেশের জন্য, আরো ভাল করে বললে নিজেই নিজের শাসক নির্বাচন করা । কিন্তু ১৮ বছর হলেই কি একজনের ভেতরে এই বোধটা এসে হাজির হয়?

কেউ যদি এমনটা বলে যে দেশের সব মানুষের ভোট দানের ক্ষমতা দেওয়া উচিৎ না তাহলে বোধহয় আমরা সবাই তার দিকে লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে যাবো তাকে মারার জন্য । বেটা বলে কি ! দেশের সব নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে চায় । বেটা স্বৈরশাসক ! বেটা ফ্যাসিস্ট ! থাপড়ায়ে তোর দাঁত ফেলে দেওয়া উচিৎ !

তবে একটু অন্য ভাবে চিন্তা করি । রাষ্টকে শুধু মাত্র দেখি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে । যদিও জগতে সব কিছুই এই অর্থনীতি কেন্দ্রীক । যা কিছু হচ্ছে এবং সামনে যা কিছু হবে তার মূলে রয়েছে অর্থনীতি ।

কয়েকদিন আগে একটা বই পড়লাম । বইটির নাম How an Economy Grows and Why It Crashes । কিভাবে একটি অর্থনীতি গড়ে ওঠে এবং কিভাবে এটির পতন হয় । সেখানে লেখক পিটার শিফ এবং অ্যান্ড্রু শিফ একটা গল্পের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি দেখিয়েছেন যে কিভাবে আসলেই একটা ছোট দল থেকে পুরো একটা রিপাবলিক গড়ে ওঠে । পুরো অর্থনীতি এগিয়ে চলে এবং এক সময়ে কী কারণে সেটি পতন হয় । মূলত আমেরিকান অর্থনীতি গড়ে ওঠা এবং ২০০৮ সালের পতনের ঘটনা টা খুবই সহজ ভাবে গল্পে দেখানো হয়েছে ।
গল্পটা শুরু হয় ছোট একটা দ্বীপ থেকে । এই দ্বীপের শুরুতে কেবল তিন জন মানুষ বাস করতো । এই তিনজন মানুষ কোথা থেকে এখানে এল সেটা অবশ্য বলা নেই ।

শুরুতে সেটা এমন একটা দ্বীপ ছিল যেখানে কোন কিছুই ছিল না । একেবারে প্রিমিটিভ অবস্থা । সেখানে খাওয়ার মত কেবল মাছ ছিল । ঐ তিনজন মাছ খেয়েই বেঁচে থাকত। এবং তারা দিনে হাত দিয়ে একটার বেশি মাছও ধরতে পারতো না । এই একটা মাছ ধরতেই দিন পার হয়ে যেত । পরের দিন আবারও সেই একই ভাবে একটা মাছ ধরতো । এভাবেই দিন পার করছিল।

তখন তাদের ভেতরে একজন ঠিক করলো যে এভাবে দিন পার না করে সে নতুন কিছু করবে । এমন কিছু যার ফলে সে দিনে একটা নয় দুটো মাছ ধরতে পারবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একটা জাল তৈরি করলো এবং দেখা গেল সেই জাল ব্যবহার করেই দিনে সে দুইটা করে মাছ ধরতে পারছে । অর্থ্যাৎ একদিন মাছ ধরে সে দুইদিন চলতে পারছে ।

এভাবে পুজি সৃষ্টি করে উৎপাদন বাড়িয়ে ফেলল সে । এভাবে ধীরে ধীরে দ্বীপে আরো নানান জিনিস পত্র তৈরি হতে শুরু করল । এক সময়ে যেখানে কেবল খাওয়ার চিন্তা করতে এখন খাওয়া বাদ দিয়ে আরও অন্যান্য জিনিসের চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হল ।

প্রাচীন সমাজ গুলোর দিকে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখা যাবে ঠিক একই ঘটনা ঘটছে । আগে মানুষ কেবল খাওয়ার চিন্তাই করতো । অন্য কোন চিন্তা তাদের মাথায় ছিল না । সকালে ওঠো শিকার কর খাও । এছাড়া প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী থেকেও তাদের রক্ষা পাওয়ার চিন্তা ছিল । কিন্তু যখন তারা ধীরে ধীরে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করলো তখন তাদের ভেতরে আরো নানান রকম জিনিস আসতে শুরু করলো । পোশাক বিনোদন এই সব ।

এখন যখন অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো তখন নতুন নতুন ঝামেলাও সৃষ্টি হতে শুরু করলো । যখন ঐ দ্বীপে মাত্র তিনজন মানুষ ছিল, একেবারে শুরুর দিকে তখন যে ঝামেলাই নিজেরা আলোচনা করে সমাধান করতে পারতো । কিন্তু লোক সংখ্যা যখন তিন থেকে তিন হাজার তখন কেবল নিজেদের ভেতরে আলোচনা করে সমাধান করার ব্যাপারটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাড়ালো । তখনই জন্ম নিল রিপাবলিক । দ্বীপে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল । ঠিক হল যে বারোজনের একটা দল পুরো দ্বীপে সকল সমস্যা আরো ভাল করে বললে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করবে । এবং দ্বীপবাসীরা সেই বারোজনের দলটাকে নির্বাচন করবে । এবং দ্বীপবাসী তাদের আয় করা মাছের কিছু অংশ সেই বারোজনের হাতে তুলে দিবে এবং বারোজন সিদ্ধান্ত নিবে যে দ্বীপের প্রয়োজনের সেই মাছ কোন কোন কাজে খরচ হবে ।
আমরা এখন যেভাবে ট্যাক্স দেই আর কি ! এটার নাম হল ফিসট্যাক্স।

এখন ভোট কারা দিতে পারবে? অর্থ্যাৎ দ্বীপের ঐ বারোজন সিনেটরকে নির্বাচিত করতে কাদের কাদের ভোট নেওয়া হবে?
দ্বীপে থাকা সকলের ভোট?
গল্পে তেমনটা করা হয় নি । সিনেট নির্বাচনে কেবল তাদের ভোটই গ্রহন করা হবে যারা ঐ ফিসট্যাক্স দিবে ! যুক্তিটা হচ্ছে আমি যখন ট্যাক্স দিব তখন আমার মাথায় এই চিন্তা থাকবে যেন আমার টাকাটা সঠিক ভাবে ব্যবহার এবং আমার টাকাকে যে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারবে আমি তাকে তাকেই নির্বাচন করবো । যে কোন টাকা দেয় না, তার মাথায় আসলে এই চিন্তা থাকেও না যে সেই টাকা কিভাবে খরচ হল ।

বইয়ের এই অংশ টুকু পড়ার পরে মনে হল কথাটা কিন্তু একেবারেই ফেলে দেওয়ার মত না । একজন ২০ বছরের ছেলে যে কিনা কোন কর দেয় না অথ্যাৎ সরকার চালাতে যে টাকা লাগে তার কোন অর্থ সে নিজে দেয় না । সেখানে তার নিজের কোন অর্থ নেই নিজের পরিশ্রম নেই । তার কোন চিন্তাও নেই সরকার টাকা কোন ভাবে খরচ করবে ! অন্য দিকে একজন ৩০ বছরের যুবক, যে তার কষ্টের আয় থেকে একটা বড় পরিমান সরকারকে দিচ্ছে । নিজের টাকা ঢালছে তখন তার মনে এই চিন্তা অবশ্যই থাকবে যে আমার টাকা যেন সঠিক ভাবে খরচ হয় ! একজন নির্ভরশীল মানুষ যে কিনা অন্যের উপর নির্ভর করে আছে তার রাষ্ট্র পরিচালনায় কোন ভূমিকা নেই। তার কোন মাথা ব্যাথা যেমন নেই, তার কোন কিছু বদলানোর ক্ষমতাও নেই।
একটা দেশ গঠনে সব থেকে গুরুত্বপূরণ ভূমিকা রাখে সেই দেশের ওয়ার্কফোর্স আরো ভাল করে বললে সেই দেশে উৎপাদনশীল কাজে যারা নিয়োজিত তারা । একটা পুরো দেশের অর্থনীতিই টিকে থাকে এদের উপরে।

এটা কেবলই একটা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা একটা ভিউ । অনেকের কাছে এটা অদ্ভুত আর অযৌক্তিক মনে হতে পারে বটে কিন্তু বই পড়ার সময় তেমনটা মনে হবে না মোটেও। আমাদের বিশ্বের বেশির ভাগ অর্থনীতি চলে কেইনসিয়ান তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে। যেখানে সঞ্চয় থেকেও খরচ করার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অথচ এই তত্ত্বটি বয়স শখানেক বছর । তার আগেও আরও কত শত বছর ধরে একটা সমাজ গড়ে উঠেছে টিকে ছিল।

এই বইয়ের লেখক ২০০৮ সালর অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে একেবারে নির্ভুল ভাবে ভবিষ্যৎ বানী করেছিলেন । এই বইটা তার দুই-তিন বছর পরে বের হয়। তখনও এবং এখনও যারা বুঝতে পারেন না যে ২০০৮ সালে মন্দা কেন হয়েছিলো তারা এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন। খুব সহজ ভাষার এবং গল্পের ছলে পুরো প্রক্রিয়াটা বর্ণনা করা হয়েছে। ইংরেজিটা পড়তে পারেন আবার বইটার একটা বাংলা সংস্করণও বের হয়েছে সম্প্রতি। অর্থনীতি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তারা পড়ে দেখতে পারেন।

বইটির বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভার্শনই পাবেন এই পেইজ থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ১২:২৮
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ব্লগার ভাবনা: ব্লগ জমছেনা কেন? এর পেছনে কারণ গুলো কি কি? ব্লগাররা কি ভাবছেন।

লিখেছেন লেখার খাতা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৩৫


সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আম পাকা বৈশাখে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। কাঠফাটা রোদ্দুরে তপ্ত বাতাস যেমন জনপ্রাণে একটু স্বস্তির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি প্রাণহীন ব্লগ জমে উঠলে অপার আনন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার ২৭ নম্বর সমুদ্রবন্দর থেকে

লিখেছেন অপু তানভীর, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:০০

চারটার দিকে বাসায় ফেরার কথা ছিল । তবে বৃষ্টির কারণে ঘন্টা খানেক পরেই রওয়ানা দিতে হল । যদিও তখনও বৃষ্টি বেশ ভালই পড়ছিল । আমি অন্য দিন ব্যাগে করে রেইনকোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধা কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৪ ই জুন, ২০২৪ রাত ৩:৩২

কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।
সকল যোগ্যতা জিপিএ-্র প্রমান দিয়ে, এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, সেকেন্ডারি।
এরপর ভাইবা দিয়ে ৬ লাখ চাকুরি প্রার্থি থেকে বাছাই হয়ে ১০০ জন প্রাথমিক নির্বাচিত।

ধরুন ১০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউ জার্সিতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পেয়ে গেলাম একজন পুরনো ব্লগারের বই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৪ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৭

জাকিউল ইসলাম ফারূকী (Zakiul Faruque) ওরফে সাকী আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; ডাঃ আনিসুর রহমান, এনডক্রিনোলজিস্ট আর ডাঃ শরীফ হাসান, প্লাস্টিক সার্জন এর। ওরা তিনজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেনজীর তার মেয়েদের চোখে কীভাবে চোখ রাখে?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৪ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০৬


১. আমি সবসময় ভাবি দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর যারা মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে সৎ ব্যক্তি হিসেবে থাকে, কিন্তু যখন সবার কাছে জানাজানি হয়ে যায় তখন তারা কীভাবে তাদের স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×