তন্ন তন্ন করে খুঁজে অনেকগুলো ফাইল বের করলো কার্তিক। এগুলো অতি গোপনীয় কিছু যা অনেক অনেক বছর ধরে তাদের কাছ থেকে গোপন করা হয়েছে। যার কিছুই কার্তিক কিংবা সাধারন মানুষ জানেনা। সকল সিকিউরিটি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে কার্তিকরা পৃথিবীর মাটির উপরের স্তরে এসেছে। মুক্তির আনন্দে তারা আজ সকল গোপন উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। কারণ তাদের এই বদ্ধ জায়গা থেকে বেরুতে হবে। প্রথম কয়েকটি ফাইল পড়ে কার্তিক তেমন কিছু বুঝছিলো না। অন্য গ্রহের প্রানের অস্তিত্বের প্রমান জড়ো করা হয়েছে এইসব পুরোনো ফাইল গুলোতে। কয়েকটিতে বেশ কঠিন কিছু হিসেব নিকাশ। কিছুতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে বিশদ সব আলোচনা আর হিসেব। কিছুই বুঝলোনা এসবের। সে খুজছিলো একটি ম্যাপ যা তাকে এবং তার সঙ্গীদের এখান থেকে বের হওয়ার পথ বাতলে দেবে। একটি ফাইলের শিরোনাম “প্ল্যান টু লিভ”, কৌতুহল বশত কার্তিক ফাইলটি পড়া শুরু করলো।
প্ল্যান টু লিভ
সালঃ ২১১১
স্থানঃ নতুন পৃথিবী
পর্যায়ঃ অতি গোপনীয়
অংশ গ্রহণকারীঃ গোপনকৃত
বর্তমান পরিস্থিতি (সরকারী মতামত): শতাব্দী আগেও(২০১১) পৃথিবী এমনই ছিলো (তথ্য সুত্রঃ ২০১১ পর্যন্ত রেকর্ড)। পরিবর্তন হয়েছে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীন শাসন পদ্ধতির। সাধারন মানুষ এর কাছে এই কার্যক্রম গোপনীয়। কোন কিছুতে কোন বিভেদ রাখা হয়নি। বিভিন্ন সেক্টরে সকল মানুষকে সমানভাবে কাজ বন্টন করা হয়েছে। সকল সেক্টরে শতকরা একজন করে থাকছে সরকারী লোক। এখানে সরকারী লোকদের কাজ হচ্ছে বাকিদের পর্যবেক্ষন করা এবং তাদের সাথে মিশে যাওয়া। কেউ জানেনা কে সরকারী লোক। এতে সবাই নিজের কাজ সঠিকভাবে করে যাচ্ছে। এমনকি একজন সরকারী লোক অপর সরকারী লোকদের চেনেনা। এতে সেও তার কাজ করছে সঠিকভাবে। কারণ সে জানেনা কে তার উপর নজর রাখছে। সরকারী এই লোকদের কাজ অন্যদের পর্যবেক্ষন করা হলেও সাধারন মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার স্বার্থে তাদেরও কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কল-কারখানা এমনকি ইউনিভার্সিটির শিক্ষকের কাজও করতে হচ্ছে। সাধারনের মনে যাতে কোন প্রকার সন্দেহ না জাগে তাই খুব সতর্কতার সাথে দ্বায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাদের। আশা করা যায় সুন্দর পৃথিবীর সৃষ্টি করতে যাচ্ছি আমরা।
মূল বৈঠক আলোচনার সারাংশঃ (এই পর্যায়ের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে। ২০১১ সালের পুর্বেও অনেকটা এমন গোপন বৈঠক হত। ওগুলোর সাথে এই বৈঠকের পার্থক্য হল এখানে কোন দেশের প্রধানগণ অনুপস্থিত এবং তারা কখনই জানবেনা। তখনকার বেশ ক্ষমতাধর অল্প কিছু মানুষের উপস্থিতিতে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অতি গোপনীয় কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই বৈঠক এতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয় ছিল যে বৈঠকের বাইরে কেউ কখনই জানবেনা এই বৈঠকের কথা।)
পৃথিবীতে খনিজ সম্পদ অর্থাৎ তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদির আর খুব বেশি মজুদ নেই। শুধুমাত্র ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের উন্নয়নের কাজে বাকি সম্পদ গুলো ব্যাবহার করা হবে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পৃথিবীর সকল মানুষকে দাস করে রাখা হবে। এতে করে সকল সম্পদ কব্জা করা সহজ হবে। বৈঠকে এর জন্য প্ল্যান নির্ধারন করা হয়। প্রতিটি দেশের প্রধানদেরকে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ সাহায্য, ঋণ, উপঢৌকন এবং ক্ষমতা দেয়া হবে। যেকোন ক্ষেত্রে এসে দেশের প্রধানরা আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হবে। পরবর্তীতে একটি দৃশ্যমান শক্তি সৃষ্টি করে দেশগুলোর সংবিধান-এ পরিবর্তন আনা হবে। এই দৃশ্যমান শক্তিকে নিয়ন্ত্রন করবে ক্ষমতাধরেরা দৃশ্যের আড়ালে থেকে। নজরদারির কাজ দিয়ে সরকারী লোক বানানো হবে। কাউকে জানানো হবে না সে ছাড়া আর কে কে সরকারী হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সরকারীকরণ করা হবে সকল নাগরিককে। সে জানবে তার কাজ একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার জনগনের উপর নজর রাখা। এবং যাতে পরিচয় গোপন থাকে তার জন্য সে করবে চাষাবাদ, শ্রমিকের কাজ থেকে শুরু করে সকল সেক্টরে। এভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিক হবে সরকারী এবং প্রত্যেকেই অন্যের কাছে অভিনয় করে যাবে সাধারণ জনগনের। এরা মিছিলের অভিনয় করবে বিপ্লবীদের সাথে, বিপ্লবের কথা বলবে। মন্ত্রী পরিষদে মিটিং এর সময় অভিনয় করবে। প্রধানমন্ত্রী অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক আলাপ করবেন ঠিকই কিন্তু টা হবে অভিনয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম হয়ে যাবে অভিনয়। সবাই জানবে তার কাজ মূলত নজরদারী এবং অভিনয় করছে সে নিজের পরিচয় ঢেকে রাখতে। এতে করে সবার কাছ থেকে কাজও আদায় হবে আর সবাই দাস হয়েও থাকবে। কারোরই ব্যাক্তিগত বলে কিছু থাকবেনা। ২০১১ থেকে ২১১১ সালের ভেতর সকল মানুষকে দাসে পরিনত করা হবে সরকারীকরনের মাধ্যমে। এ শতাব্দী থেকেই খনিজ সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়ার লক্ষন শুরু হয়েছে। তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি দাহ্য পদার্থ যখন শেষ হয়ে যাবে এবং প্রকৃতিতে আর কোন পেট্রোলিয়াম পাওয়া যাবেনা তখন মানুষ গাছ কাটা শুরু করবে জ্বালানী যোগাতে। বিদ্যুৎ থাকবেনা, অতিদ্রুত সকল গাছ ধংস হয়ে যাবে। মানব জাতির টিকে থাকাটা একটা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে যাবে। তাই সবাইকে দাস করে রেখে সময় থাকতে থাকতে টিকে থাকার একটা ব্যাবস্থা করে ফেলাটা জরুরী।...
এতটুকু পড়েই কার্তিক জানালার পুরু কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের ফ্যাকাসে কমলা রঙের পৃথিবীর দিকে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলার আগেই প্রচন্ড গরম অনুভব করতে লাগলো। কেবিনের সবার একই অনুভূতি।
ক্লারাঃ তাপমাত্রা বাড়ছে
কার্তিকঃ সময় কতো?
সুমিত্রঃ সবে ভোর
কেবিনের একপাশের দেয়ালে কাউন্ট করা হচ্ছে মনিটরে কিসের যেন।
৬ ঘন্টা ৩ মিনিট ৩২ সেকেন্ড...
৬ ঘন্টা ৩ মিনিট ৩১ সেকেন্ড...
৬ ঘন্টা ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ড...
৬ ঘন্টা ৩ মিনিট ২৯ সেকেন্ড...
৬ ঘন্টা ৩ মিনিট ২৮ সেকেন্ড...
ক্লারা দেখিয়ে দেয়ার পর কার্তিক অনেকক্ষণ ধরে কাউন্ট ডাউন দেখলো। তার মাথায় কি যেন এসেও চলে যাচ্ছে। কার্তিকের হাত পা অবশ হয়ে যেতে শুরু করে। সে মেলাতে শুরু করলো ফাইলের তথ্য গুলো। উপরের কেবিনগুলো ছিলো শুধুমাত্র ক্ষমতাধরদের জন্য যাদের ইশ্বর মানা হোত পাতাল মানুষদের কাছে। কার্তিক বাইরে তাকিয়ে দেখলো পুরো অঞ্চল জুড়ে অজস্র কেবিন। মাটি পুড়ে কটকটে লাল হয়ে আছে। কোন গাছ নেই কোথাও। কেবিন গুলো খুবই সুরক্ষিত। বাইরের পৃথিবীর প্রচন্ড তাপের মোকাবেলা করার সামর্থ কেবিনগুলোর ছিলো। পৃথিবীতে গাছ নেই। কৃত্রিম অক্সিজেন সাপ্লাই আছে বিশাল বিশাল সব কেবিনে। পুরো পৃথিবীর সকল কেবিনই একে অপরের সাথে সংযুক্ত করিডোরের মাধ্যমে। কিন্তু করিডোরে তাপরোধক ব্যাবস্থা নেই। কিছুদিন হল মাটির উপরের কেবিনগুলো স্বাধীন হয়েছে। পাতালবাসী সকল খনি শ্রমিক মানুষেরা উপরে উঠে এসেছে কিন্তু এই কেবিনগুলো থেকে বেরুতে পারছেনা। তাই হন্যে হয়ে তারা ম্যাপ খুঁজছিল আর কার্তিক এই গোপন এবং কয়েকগুণ বিশাল এই কেবিনটি খুঁজে পেয়েছে। কার্তিকের কাছে এটা ভেবে ভালো লাগছিলনা যে মাটির উপরের মানুষগুলো কেবিনে নেই। সব কেবিনই ফাঁকা পেয়েছে তারা এবং সব কিছু কম্পিউটারাইজড। কার্তিক বুঝতে পারছে ঈশ্বর বলে কেউ ছিলনা তাদের। মাটির উপরের মানুষরা অনেক আগেই অন্য গ্রহে পাড়ী জমিয়েছে। কেবিনের ভেতরকার তাপ এতোই বেড়ে যাচ্ছিলো যে কার্তিক বুঝছিলো এই কাউন্ট ডাউন তাদের জীবনের কাউন্ট ডাউন। কিছুক্ষন পর কেবিনগুলো গলতে শুরু করবে। পৃথিবীর সব মানুষ এই কেবিনগুলোর মধ্যে সিলগালা অবস্থায় আছে। এর কারণ কার্তিক পর্যায়ক্রমিক করে ভাবতে থাকে, খনিজ সম্পদ শেষ করে ফেলা, সমতা বজায় রেখে সম্পদ কাজে না লাগিয়ে শুধু মাত্র একটি অঞ্চলের উন্নয়নে সকল সম্পদ ব্যাবহার করা। সকল দাহ্য পদার্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রচুর পরিমানে গাছ কেটে ফেলা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস এর অভাবে সকল উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যাওয়া। গ্রীন হাউজ ইফেক্ট এর তীব্রতার কারনে সকল বরফ গলে যাওয়া। উপকূলীয় সকল দেশ সেই বরফ গলা পানিতে তলিয়ে যাওয়া, অবশিষ্ট স্থলভাগ মরুভুমিতে পরিনত হওয়া।কেবিন তৈরী করে পাতালে খনিতে কাজ করার জন্য চাপ দেয়া। সকল মানুষ সেই কাজে যোগ দেয়া এবং বন্দী হয়ে যাওয়া এই কেবিনগুলোতে। সকল তথ্যের সমন্বয় এই যে পৃথিবীর মাটির উপরে বসবাসরত সবাই মহাকাশ যানে করে অন্য গ্রহে চলে গেছে আর সকল সরকারী কর্মীদের রেখে গেছে মাটির নীচে। কার্তিক ধীক দিতে থাকলো তার পূর্ব পুরুষদের। বিংশ শতাব্দীর মানুষগুলোর প্রতি তার তীব্র ঘেন্না জন্ম নিল। একদলা থুতু ফেললো তার সেইসব পূর্বপুরুষদের কথা ভেবে যারা তলিয়ে যাওয়া একসময়ের বাংলাদেশের মানুষ ছিল। যাদের প্রধান খনিজ সম্পদ গ্যাস, কয়লা, তেল। শাসকগণ নিজের লাভের কথা ভেবে চামচার মতো তা তুলে দিয়েছিলো ক্ষমতাধরদের হাতে। কার্তিক নিজেকে ঘেন্না করতে শুরু করলো এই ভেবে যে হয়তো তার পূর্ব পুরুষ সেই শাসকদের কেউ, হয়তোবা প্রধানমন্ত্রীই ছিল। তাদের লোভকে কার্তিকের কাছে মুখ ভর্তি একদলা গন্ধযুক্ত বমি মনে হল। অনেকটুকু বমি উগরে দিল কার্তিক। এই কেবিনে আরো যারা আছে তাদের সবার দ্বায়িত্ব ছিল কার্তিকের। কার্তিক তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল সবাই। সরকারীকরণ পদ্ধতি সকল মানুষকেই বাধ্য করেছিল মাটির নীচে খনি কাটার কাজ করতে। আর খনি থেকে উত্তলিত সম্পদ ক্ষমতাধরেরা ব্যবহার করুছিলো অন্য কোন পৃথিবীতে পাড়ী জমাতে। কিন্তু কার্তিক বুঝতে পারলো অনেক দেরী হয়ে গেছে স্বাধীনতা অর্জনের। সে ফাইলগুলো পড়া শুরু করলো এবং নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জানলো যা আর কেউ জানেনা। কার্তিকের চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগলো।
সূর্যের কাছে তখন কার্তিকের অনুযোগ ‘ আমি কি দোষী?’
কার্তিকের গায়ে ফোস্কা পড়া শুরু হয়েছে। বাকিদেরও তাই। কেবিনেই বাইরের পুরু লোহার পারত গলতে শুরু করেছে। পৃথিবী নামক গ্রহে ওটাই মানুষের শেষদিন ছিল।
কার্তিক জানতোনা সুর্য তার অনুযোগ শুনে কেঁদেছিলো। আর কার্তিককে এই বলে শান্তনা দিতে চেয়েছিলো যে ভাবিস না, কিছুদিন পর পুরো পৃথিবীর কোন অস্তিত্ব থাকবেনা। এতে সকল গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে মধ্যাকর্ষনের ভারসাম্য নষ্ট হবে। ছিটকে যাবে সকল গ্রহ এদিক থেকে ওদিকে। ক্ষমতাধর মানুষগুলো যত দূরেই যাকনা কেন বাঁচবেনা। তুই কাঁদিসনা কার্তিক, প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয়না।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১১ সকাল ১১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


