
ডাইনিংরুমে খাওয়ার সময় ছেলে - মেয়েদের আড্ডা-ইয়ার্কি নিয়ে কিচেনের দিদিরা প্রায়ই আপত্তি করতো । কিন্তু কে শোনে কার কথা । আমারও প্রথমদিকে ওদের আপত্তিকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হত। এমনকি মনে হত আমি যেন ওদেরই একজন । কিন্তু শেফালী ম্যাডামের সঙ্গে পরিচয়ের পরে রাতারাতি আমি আবার ওদের বিরোধী হয়ে গেলাম। মনের মধ্যে একটি ধারনা তৈরী হল যে শিক্ষক - শিক্ষিকাদেরও এরকম আচরণ দেখে কিছু বলতে না পারার কারনে বোধহয় দিদিদের ছাত্র - ছাত্রীদের উপর ক্ষোভটা এতটা বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদের মধ্যে বয়স্কা নমিতামাসি প্রায়ই বলতো,
- এই ছেলে- মেয়েগুলোর জন্য দেখবো প্রেসিডেন্ট সাহেব ডাইনিংরুমটাকেও কোনওদিন হয়তো আলাদা করে দিয়েছেন।
বাকি দিদিরা মৃদু হেসে বলতো ,
- ও মাসি, তা তোমার এত গায়ে লাগছে কেন?
- তা তোরা ঠিক বলেছিস, আমারা এখানে দুবেলা দুমুঠো খাবার পাই। বিনিময়ে একটু রান্নাবান্না করতে হয় ঠিকই, তবে ওসব কথা বার্তা আমাদের মুখে সাজে না ।
অস্বীকার করবোনা যে আমরা বড়রাও ওদের আরেক মাথা ব্যাথার কারন ছিলাম। বেশ কয়েকদিন তিনবেলাতে আমিও একজনকে মনে মনে খুঁজে চলেছি। হয়তো পরিচয়টা একটু বেশি হলে আমিও অন্যান্য শিক্ষক - শিক্ষিকা বা ছেলে- মেয়েগুলোর মত আড্ডাতে মেতে উঠতাম। কিন্তু একবারের জন্যও আমি সে জনকে দেখা পেলামনা । কাউকে দিয়ে যে খোঁজ নেবো, সে উপায়ও ছিল না । অগত্যা তৃষ্ঞার্ত মন নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর যে রাস্তা নেই।
বেশকিছু দিন পরে শেষরাতে প্রচন্ড অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল । একটু পরে প্রচন্ড পেট যন্ত্রণাও শুরু হল । চেনা যন্ত্রণা তবে সময়টা অচেনা আরকি । আমি আর দেরি না করে বাথরুমে চলে গেলাম । পরপর তিনবার গেলেও অবস্থার উন্নতি হলোনা । দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেল । আরও একটু বেলা বাড়লে আমি হাঁটতে হাঁটতে ঔষুধের দোকানের সন্ধানে বার হলাম । পৌঁছে গেলাম শাখাচুকিয়া বাজারে । বাজারতো নয়, গ্রামের হাট - চালা আরকি। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজি করে অবশেষে একটি ঔষুধের দোকানের সন্ধান পেলাম । একজন কোয়াক ডাক্তার সবে চেম্বার খুলে জল ছেঁটাচ্ছিলেন । অমনি আমাকে দেখে আগ্রহভরা চোখে জিজ্ঞেস করলেন,
- কি ব্যাপার?
- আজ্ঞে! প্রচন্ড আমাশা হয়েছে।
আমার আসার কারন শুনে ওনার আগ্রহভাবটা একেবারে বিলীন হয়ে গেল । সামান্য কিছু ঔষধ দিয়ে আমাকে কিছু খাওয়ার পরে খেতে বললেন। ফেরার পথে ক্লান্তি ভাবটা আরও বেড়ে গেল। কোনক্রমে হাঁটছিলাম।বাজারের রাস্তা পার হয়ে স্কুলের রাস্তা ধরতেই দেখি উল্টোদিক থেকে শেফালীম্যাডাম আসছেন। আমি দুপাশে একটু দেখে নিলাম । চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত। সকালবেলা তার উপর দিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে চলেছে । রাস্তার দুদিকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি তালগাছ । এমন সময় কাছাকাছি আসতেই, উনি আগে জিজ্ঞেস করলেন,
-কী ব্যাপার! এত সকালে বাইরে?
-শরীরটা ভালো লাগছেনা। যে কারণে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে গেছিলাম ।
- কেন? কি হয়েছে আপনার ?
- না, তেমন কিছু নয়। তবে পেটে একটু চিনচিন করছিল। সে জন্য ডাক্তারখানায় যাওয়া ।
- হ্যাঁ, একদম ঠিক করেছেন । টুকটাক ঔষধ কাছে রাখা জরুরি । তবে হোস্টেলের খাবারের মান খুব একটা ভালো নয়। আর ডালটা আমার সবচেয়ে অখাদ্য লাগে । চেষ্টা করবেন ডালটা না খাওয়ার।
উল্লেখ্য ডাল আমার খুব প্রিয় । ইউনিভার্সিটির হোস্টেলের ডাল খেতেও আমার কোনও সমস্যা হতনা। বন্ধুরা মজাকরে বলতো বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্যতম স্বাদের ডাল আমাদের হোস্টেলের ডাল । বিশ্ববিখ্যাত ছিল এই কারনে যে কেনিয়ার ছাত্ররা একবার এমন আপত্তি করেছিল যে সমস্যা সমাধানে ভিসি স্যারকে পর্যন্ত চলে আসতে হয়েছিল। আমরা আশায় ছিলাম এবার অন্তত ডালের স্ট্যাটাস পরিবর্তন হবে। দুদিন ঠিকঠাক হলেও কদিন বাদে আবার যা তাই। তখন আমরা বলতাম, ওদের মধ্যে কেউ কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে না বদলানো পর্যন্ত ঐতিহ্যশালী হলুদগোলা গরমজল বা ডাল হোস্টেলে চলতে থাকবে। সুতরাং এহেন ডাল নিয়ে আমাদের রীতিমত গর্ব ছিল।তবে আজ শেফালীম্যাডামের সুরে রা না করে আমিও বললাম ,
- হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনি ঠিকই বলেছেন । স্কুলের ডালটা যেন একদম খাওয়া যায় না । তবে আপনি এত সকালে কোথায় চললেন?
- আমাকে একটু বাড়ি যেতে হবে । জয়েন করার পরে আজ প্রথম বাড়িতে যাচ্ছি ।
- কোথায় বাড়ি আপনার ?
- ফুলেশ্বরে।
- ফুলেশ্বরে! বাহা! খুব সুন্দর জায়গা ফুলেশ্বর।
-আপনি এর মধ্যে বাড়িতে যাননি?
- না।আমি সেই যে এসেছিলাম আর যাওয়া হয়নি ।
- তাহলে আপনাকে তো আর ডাইনিং টেবিলে দেখিনা ।
- বা রে! আমি যে ঠিকই যাই। তিনবেলাতেই যাই। আমিও যে আপনাকে আর দেখতে পাইনা ।
- আসলে আমি একদম শুরুর দিকে যাই ।
- ও আচ্ছা ! আমি আবার একেবারে শেষের দিকে যাই। ঠিক আছে অনেক কথা হল। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন-কামনা করি। আসি তাহলে..
- হ্যাঁ আসুন।সাবধানে যাবেন ।
শেফালীম্যাডাম চলে যেতে অদ্ভূত মিষ্টতায় যেন বাতাসটা ভরে গেল । ভরে গেল আমার হৃদয়টাও । কিছু একটা খোঁজার ভান করে পাঞ্জাবীর দু পকেটে হাত দিয়ে অনেক্ষণ সেই সুবাস উপভোগ করতে লাগলাম।আরও কিছুক্ষণ পরে পিছনে তাকাতে ততক্ষণে উনি বাজারের রাস্তা পার হয়ে গেছেন । আমিও ক্রমশ সামনের দিকে পা চালালাম। তবে মনে মনে একটা প্রশ্ন খচখচ করছিল, কবে উনি ফিরবেন সেটা জিজ্ঞেস করতে পারলাম না বলে । সঠিক সময়ে সবকিছু আমার যে মনে আসেনা । এই অতৃপ্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে আমি আবার হোস্টেলের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।
রুমে এসে সামান্য একটু জলমুড়ি খেয়ে ঔষুধটা খেয়ে নিলাম । কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম খেয়াল ছিল না । পরে যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেকটা বেলা হয়ে গেছে । তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে ডাইনিংরুমে গেলাম । অল্পপরিমানে ভাত ও সামান্য একটু ডাল ও আলুচোখা দিয়ে খেয়ে ক্লাসে চলে গেলাম ।
সেদিন সন্ধ্যে থেকে ডাইনিংরুমের সময়টা আমি পরিবর্তন করি । লক্ষ্য ছিল ম্যাডামের ফিরে আসার আগে থেকে আমার এই সময় পরিবর্তনটাকে স্বাভাবিক করতে হবে। লক্ষ্য ছিল আমার এই আপাত পরিবর্তন কেউ যাতে ধরতে না পারে। এদিন সন্ধ্যায় আমাকে আগেভাগে দেখে ইতিমধ্যে পরিচয় হওয়া রমেনদার জিজ্ঞাসা,
- মাস্টারদা, কোথাও যাবেন নাকি?
- না, এখন আর কোথায় যাবো । তবে প্রথমদিকে না খেলে পরে আর ভালো খাবার পাওয়া যায় না ।
-সেকি! মাস্টারদা আমরা কখনই আপনাদের খারাপ খাবার দিই না।
- আরে না না! আমি তোমার সঙ্গে একটু রসিকতা করছিলাম । ওসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করোনা । তোমরা অত্যন্ত ভালো খাবার খাওয়াচ্ছ । আর সেই লোভেই আজ একটু আগে আসা ।
সঙ্গে সঙ্গে এক চওড়া হাসিতে রমেনদার বহিরঙ্গ যেন দুলে উঠলো । বলতে বলতে খাবারও চলে এলো ।
রমেনদা কিচেনে ঢুকে যেতেই নিজের বোকামির জন্য বেশ লজ্জা অনুভব করলাম । সামনাসামনি হঠাৎ কথা খুঁজে না পেয়ে খাবারের কোয়ালিটি নিয়ে কথা বললে যে ওদের গায়ে লাগতে পারে তাৎক্ষনিক সে বুদ্ধি আমার মাথা থেকে চলে গেছিল । কোনক্রমে ম্যানেজ করতে পেরে নিজেকে খুব খুশি লাগছিল । তবে এবেলাটা গেলেও পরের বার রমেনদা আবার এমন জিজ্ঞাসা করতে পারে কিনা বা করলে তার উত্তর কি হবে - এসব মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো ।
আরও দু- তিন সপ্তাহের মধ্যে সহকর্মী সবার সঙ্গে মিশে গেলাম । সিনিয়র বলতে তেমন বয়স্ক কেউ ছিলেন না । বড়জোর আমার চেয়ে তারা তিন - চার বছর বড় হবেন । সবাই বেটার ক্যারিয়ারের চেষ্টায় আছেন । সময় পেলে প্রত্যেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করেন । আমিও মনে মনে তৈরী হলাম। দাদাদের কাছ থেকে জানলাম স্কুলের বেতন যৎসামান্য । কাজেই আমিও ওদের নুতন পথের সন্ধানের এক জন যাত্রী হলাম । প্রকাশ্যে অবশ্য পড়াশোনার সুযোগ ছিল না । যেকারনে ছেলেদের টিফিনের আগে, ভোরবেলা বা বেশি রাতে আমাদের এরকম ক্যারিয়ার উপযোগী পড়াশোনা করা যেত ।
একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি ডাইনিং রুমের দাদা -দিদিদের নুতন টিচারদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রবল একটা আগ্রহ ছিল । পুরাতন টিচারদের কাউকে ওদের সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে দেখিনি । কেমন যেন আদেশের সুরে ওদের সঙ্গে কথা বলতেন । দিদিমণিদের আচরণ অবশ্য তেমন চোখে পড়েনি । রমেনদাকে ওরা সবাই রমেনখুঁড়ো আর বাকিদেরকে মাসি বলে ডাকলেও আমি নমিতামাসিকে কেবল মাসি বললেও বাকিদের দিদি বা বুবু আর রমেনদাকে দাদা বলে সম্বোধন করাতে ওদের চোখে মুখে সুখানুভূতি লক্ষ্য করতাম । দিদিদের মধ্যে একজনকে দেখতাম আমাকে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে খাবার দিতে । একেবারে শুরুতে বিষয়টি লক্ষ্য করিনি । কিন্তু বেশকিছু দিন যেতে একদিন চোখে পড়লো স্বাভাবিক অবস্থায় মাথায় কাপড় বা ঘোমটা না দিয়ে বরং বড় পিঠ বার করে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে । আমি একপা দুপা করে মাটির দিকে তাকাতে তাকাতে সামনে এগিয়ে যেতেই যথারীতি বড় ঘোমটা । আমি খাওয়ার জল চাইতে, ছুটে গিয়ে জগটি এনেও দিল । ওনার আচরণে আমি একটু রহস্যের আঁচ করে জল খেয়ে নাম জিজ্ঞেস করতেই ঘোমটার ভিতর থেকে উত্তর এল,
- মিলি সর্দার ।
নামটি বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে । কিন্তু মুখ দেখতে না পাওয়াতে ঠিক মেলাতে পারলাম না । নুতন একটি ভাবনা মাথায় ঢুকলো।
(চলবে.)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৯ সকাল ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



