
খাওয়ার সময় পরিবর্তন করেও লাভ হলনা । সেই কবে বাড়ি যাওয়ার সময় শেফালীম্যাডামের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাও প্রায় আট - দশদিন হয়ে গেছে । নিশ্চয় এতদিন স্কুলে চলেও এসেছেন । কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হচ্ছেনা । ধুস! যত্তসব আজেবাজে চিন্তা আরকি। কেন যে আমার মনের এই পরিবর্তন - সেটা ভেবে বেশ হতাশ হই । আগে তবুও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটু আধটু পড়াশোনা করতাম । কিন্তু এখন ওসব সম্পূর্ণ বন্ধ। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে একটি চিন্তা যেন পাক খেয়ে চলেছে । আবার এটাও ভাবি বয়স তো আমার নেহাৎ কম নয় , এমন একটি চাকরি পেলাম যে বেকারদশা ঘুঁচলো না। অথচ এখানে এভাবে পড়ে থাকলে আমার বিকল্প জীবিকার অন্বেষণের উদ্যোম শেষ হয়ে যাবে - তা একপ্রকার নিশ্চিত । তার মধ্যে এসব বয়ঃসন্ধিকালের আচরণে নিজের কাছে নিজেকে যেন খুব ছোটো লাগছে । কিন্তু পরক্ষণেই একটি ভালোলাগার নেশা আমাকে পাগোল করে তোলে । স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতাম শেফালীম্যাডামের কথা ভাবতে ভাবতে । সম্বিত ফিরলে নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে আরও অসহায় বোধ করতাম।।
সেদিন রাতে ডাইনিংরুমে বসে এরকম আনমনে ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ পার হয়ে গেছিল ঠিক খেয়াল ছিল না । হঠাৎ সামনে পিঙ্ক কালারের দেওয়ালে বাংলা, ইংরেজির নানা রকম অক্ষরের পাশে নানান ফুল, বিভিন্ন রকম ছবির সঙ্গে কয়েকটা লাইনের একটু অন্যরকম লেখা চোখে পড়লো । বাংলাতে নয় কিন্তু তিন - চার লাইনের লেখাগুলির যে একটা অর্থ আছে সেটা অনুমান করতে অসুবিধা হল না । প্রতিবেশী রাজ্য উড়িষ্যা । আমি যে টুকু বুঝি লেখাটা উড়িয়া ভাষারও নয় । এলাকায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশ প্রভাব আছে । জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের । সামনে বসা একটি আদিবাসী ছাত্রকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে,
- না না! স্যার, আমি ওসব লিখিনি ।
- আমি তোমার লেখার কথা বলছিনা ,বাবা । আমার প্রশ্ন দেওয়ালে কী লেখা আছে সেটা তুমি বলতে পারবে কিনা ।
- না স্যার! আমি জানিনা ।
আমাদের কথোপকথনের সময় বেশ কয়েকজন নাইন / টেনের পড়ুয়া দাঁড়িয়ে দেখছিল । তাদের উদ্দেশ্য করে বললাম,
-তোমরা কেউ বলতে পারবে দেওয়ালে কী লেখা আছে? বা কোন ভাষায় লেখা আছে? ওদিক থেকে সমবেত কন্ঠে উত্তর এল,
- না স্যার, বলতে পারবোনা ।
একেএকে সব ছেলেরা চলে গেল । কয়েকজন সহকর্মীও এলেন । তবে দু- একটা কথা বলে ডিনার সেরে ওনারাও চলে গেলেন । আমি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম। বিভিন্নভাবে মেলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম । এসব করতে গিয়ে বেশ রাত হয়ে গেল । অবশেষে এক সময় মনে অতৃপ্ত বাসানা নিয়ে রুমে চলে গেলাম । মনে মনে স্থির করলাম যে পরেরদিন আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রদের জিজ্ঞেস করবো তারা কেউ লেখাটার কোনও সদুত্তর দিতে পারে কিনা।
যথারীতি পরেরদিন আগেভাগে ডাইনিংরুমে চলে এলাম । বসার সঙ্গে সঙ্গে ঘোমটাটানা মিলিদি একফালি পেঁয়াজ ও কাঁচালংকা যোগে সুন্দর করে ভাত সাজিয়ে নিয়ে এল । রমেনদাও যেন রেডি ছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ডাল ও আলুপোস্ত থালায় দিয়ে গেল । খেতে খেতে রমেনদাকে দেওয়াল লিখনের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতেই ,
-না মাস্টারদা , কে লিখেছে জানিনা ।
- আমি কে লিখেছে সেটা জানতে চাইছিনা । দেওয়ালে কোন ভাষায় লেখা আছে? কিমবা কি লেখা আছে - এটা যদি তুমি জানতে ।
- মাস্টারদা, আমি মূর্খ মানুষ। লেখাপড়া বেশি জানি না। ওসব বলতে পারবো না ।
এমন সময় কিছু ছেলে হাসি হাসি মুখে আমার পাশে এসে দাঁড়াতে, আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-বাবুরা, তোমরা কেউ এই দেওয়াল লিখনটা আমাকে পড়ে দিতে পারবে?
- স্যার আপনি ডাইনিংহলেও পড়া ধরছেন?
-আরে বোকা ! আমি তোমাদের বই এর পড়া ধরছি নাকি? স্রেফ জানতে চাইছি তোমরা কেউ এই লেখা বা অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত কিনা ।
- স্যরি স্যার ।
- ও.কে ।
হঠাৎওদের মধ্যে একজন বলে উঠলো ,
- স্যার লেখাটা অলচিকি ভাষাতে হতে পারে ।
পাশে আরেকটি আদিবাসী ছাত্র সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে জানালো ,
- একদম না । আমি অলচিকি ভাষা চিনি । এটা অন্য কোনও ভাষার হবে ।
যাইহোক আমার গোয়েন্দাগিরি এভাবে চলতে থাকে ।
এরমধ্যে একদিন সকালে গিয়ে দেখি দেওয়ালে ঐ লেখাগুলি নেই । ভাবলাম ছেলেরা কেউ মুছে দিয়েছে । আমিও হাঁফছেড়ে বাঁচলাম । পাশাপাশি একটু হতাশও লাগছে যে যেটাই হাত দিই সমাধান করতে পারিনা । কেবল নিরাশই আমার নিত্যসঙ্গী । উল্লেখ্য গতকয়েকদিনে দেওয়াল লিখন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে শেফালীম্যাডামের কথা বেমালুম ভুলে গেছিলাম । আজ আবার ওনার কথা মনে পড়ছে। ইচ্ছা করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম । যেন ওসব ভাবনা চিন্তা মনে না আসে । যে কারনে সেদিন দশ / বার মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে যখন উঠবো, ঠিক তখন রমেনদা এগিয়ে এল,
- মাস্টারদা, এত দ্রুত খাওয়া শেষ করলেন । কোথাও যাবেন নাকি?
- না না। কোথায় আর যাবো । রুমে একটু কাজ আছে ।
- ও আচ্ছা । আপনার দ্রুত খাওয়া দেখে মনে হল যেন কোথাও যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন ।
- কেন? রমেনদা কিছু বলবে ?
- না, তেমন নয়। তবে..
- তুমি বলতে পারো ।
- না না,আপনি আসুন ।
আমি বিনিময়ে চওড়া হাসি দিয়ে রুমে ফিরে আসি ।
দুদিন পরে আবার দেওয়ালে অন্যরকম লেখা দেখলাম । না বুঝলেও আমি আগের লেখাগুলিকে এত বেশিবার দেখেছি যে আজকের লেখাগুলি যে আলাদা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত । দুদিন দেওয়াল পরিষ্কার থাকায় এ ধারনাও মাথায় এসেছিল যে ছেলেরা নিছক মজা করেই মোছেনি, আমার গোয়েন্দাগিরিতে দেওয়াল- লেখক সজাগ হয়ে লেখাগুলি মুছে ফেলেছে বলে ধারনা তৈরী হয়েছিল । আগেও বলেছি কোনও কিছু বার করতে না পেরে আমার আগ্রহেরও বেশ ভাটা পড়েছিল । কিন্তু আজ নুতন করে দেওয়াল লিখন দেখে আমার জানার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল । দেওয়ালে যেটাই লেখা থাকুক - ওটা যে কাব্যিক বা কবিতা গোছের ; সে বিষয়ে আমার মনের ধারনাটা আরও বদ্ধমূল হলো।
চলবে.......
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৯ দুপুর ২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



