somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরীচিকা ( পর্ব - ৪)

১০ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৪:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



খাওয়ার সময় পরিবর্তন করেও লাভ হলনা । সেই কবে বাড়ি যাওয়ার সময় শেফালীম্যাডামের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাও প্রায় আট - দশদিন হয়ে গেছে । নিশ্চয় এতদিন স্কুলে চলেও এসেছেন । কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হচ্ছেনা । ধুস! যত্তসব আজেবাজে চিন্তা আরকি। কেন যে আমার মনের এই পরিবর্তন - সেটা ভেবে বেশ হতাশ হই । আগে তবুও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটু আধটু পড়াশোনা করতাম । কিন্তু এখন ওসব সম্পূর্ণ বন্ধ। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে একটি চিন্তা যেন পাক খেয়ে চলেছে । আবার এটাও ভাবি বয়স তো আমার নেহাৎ কম নয় , এমন একটি চাকরি পেলাম যে বেকারদশা ঘুঁচলো না। অথচ এখানে এভাবে পড়ে থাকলে আমার বিকল্প জীবিকার অন্বেষণের উদ্যোম শেষ হয়ে যাবে - তা একপ্রকার নিশ্চিত । তার মধ্যে এসব বয়ঃসন্ধিকালের আচরণে নিজের কাছে নিজেকে যেন খুব ছোটো লাগছে । কিন্তু পরক্ষণেই একটি ভালোলাগার নেশা আমাকে পাগোল করে তোলে । স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতাম শেফালীম্যাডামের কথা ভাবতে ভাবতে । সম্বিত ফিরলে নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে আরও অসহায় বোধ করতাম।।

সেদিন রাতে ডাইনিংরুমে বসে এরকম আনমনে ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ পার হয়ে গেছিল ঠিক খেয়াল ছিল না । হঠাৎ সামনে পিঙ্ক কালারের দেওয়ালে বাংলা, ইংরেজির নানা রকম অক্ষরের পাশে নানান ফুল, বিভিন্ন রকম ছবির সঙ্গে কয়েকটা লাইনের একটু অন্যরকম লেখা চোখে পড়লো । বাংলাতে নয় কিন্তু তিন - চার লাইনের লেখাগুলির যে একটা অর্থ আছে সেটা অনুমান করতে অসুবিধা হল না । প্রতিবেশী রাজ্য উড়িষ্যা । আমি যে টুকু বুঝি লেখাটা উড়িয়া ভাষারও নয় । এলাকায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশ প্রভাব আছে । জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের । সামনে বসা একটি আদিবাসী ছাত্রকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে,
- না না! স্যার, আমি ওসব লিখিনি ।
- আমি তোমার লেখার কথা বলছিনা ,বাবা । আমার প্রশ্ন দেওয়ালে কী লেখা আছে সেটা তুমি বলতে পারবে কিনা ।
- না স্যার! আমি জানিনা ।
আমাদের কথোপকথনের সময় বেশ কয়েকজন নাইন / টেনের পড়ুয়া দাঁড়িয়ে দেখছিল । তাদের উদ্দেশ্য করে বললাম,
-তোমরা কেউ বলতে পারবে দেওয়ালে কী লেখা আছে? বা কোন ভাষায় লেখা আছে? ওদিক থেকে সমবেত কন্ঠে উত্তর এল,
- না স্যার, বলতে পারবোনা ।
একেএকে সব ছেলেরা চলে গেল । কয়েকজন সহকর্মীও এলেন । তবে দু- একটা কথা বলে ডিনার সেরে ওনারাও চলে গেলেন । আমি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম। বিভিন্নভাবে মেলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম । এসব করতে গিয়ে বেশ রাত হয়ে গেল । অবশেষে এক সময় মনে অতৃপ্ত বাসানা নিয়ে রুমে চলে গেলাম । মনে মনে স্থির করলাম যে পরেরদিন আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রদের জিজ্ঞেস করবো তারা কেউ লেখাটার কোনও সদুত্তর দিতে পারে কিনা।

যথারীতি পরেরদিন আগেভাগে ডাইনিংরুমে চলে এলাম । বসার সঙ্গে সঙ্গে ঘোমটাটানা মিলিদি একফালি পেঁয়াজ ও কাঁচালংকা যোগে সুন্দর করে ভাত সাজিয়ে নিয়ে এল । রমেনদাও যেন রেডি ছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ডাল ও আলুপোস্ত থালায় দিয়ে গেল । খেতে খেতে রমেনদাকে দেওয়াল লিখনের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতেই ,
-না মাস্টারদা , কে লিখেছে জানিনা ।
- আমি কে লিখেছে সেটা জানতে চাইছিনা । দেওয়ালে কোন ভাষায় লেখা আছে? কিমবা কি লেখা আছে - এটা যদি তুমি জানতে ।
- মাস্টারদা, আমি মূর্খ মানুষ। লেখাপড়া বেশি জানি না। ওসব বলতে পারবো না ।
এমন সময় কিছু ছেলে হাসি হাসি মুখে আমার পাশে এসে দাঁড়াতে, আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-বাবুরা, তোমরা কেউ এই দেওয়াল লিখনটা আমাকে পড়ে দিতে পারবে?
- স্যার আপনি ডাইনিংহলেও পড়া ধরছেন?
-আরে বোকা ! আমি তোমাদের বই এর পড়া ধরছি নাকি? স্রেফ জানতে চাইছি তোমরা কেউ এই লেখা বা অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত কিনা ।
- স্যরি স্যার ।
- ও.কে ।
হঠাৎওদের মধ্যে একজন বলে উঠলো ,
- স্যার লেখাটা অলচিকি ভাষাতে হতে পারে ।
পাশে আরেকটি আদিবাসী ছাত্র সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে জানালো ,
- একদম না । আমি অলচিকি ভাষা চিনি । এটা অন্য কোনও ভাষার হবে ।
যাইহোক আমার গোয়েন্দাগিরি এভাবে চলতে থাকে ।

এরমধ্যে একদিন সকালে গিয়ে দেখি দেওয়ালে ঐ লেখাগুলি নেই । ভাবলাম ছেলেরা কেউ মুছে দিয়েছে । আমিও হাঁফছেড়ে বাঁচলাম । পাশাপাশি একটু হতাশও লাগছে যে যেটাই হাত দিই সমাধান করতে পারিনা । কেবল নিরাশই আমার নিত্যসঙ্গী । উল্লেখ্য গতকয়েকদিনে দেওয়াল লিখন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে শেফালীম্যাডামের কথা বেমালুম ভুলে গেছিলাম । আজ আবার ওনার কথা মনে পড়ছে। ইচ্ছা করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম । যেন ওসব ভাবনা চিন্তা মনে না আসে । যে কারনে সেদিন দশ / বার মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে যখন উঠবো, ঠিক তখন রমেনদা এগিয়ে এল,
- মাস্টারদা, এত দ্রুত খাওয়া শেষ করলেন । কোথাও যাবেন নাকি?
- না না। কোথায় আর যাবো । রুমে একটু কাজ আছে ।
- ও আচ্ছা । আপনার দ্রুত খাওয়া দেখে মনে হল যেন কোথাও যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন ।
- কেন? রমেনদা কিছু বলবে ?
- না, তেমন নয়। তবে..
- তুমি বলতে পারো ।
- না না,আপনি আসুন ।
আমি বিনিময়ে চওড়া হাসি দিয়ে রুমে ফিরে আসি ।


দুদিন পরে আবার দেওয়ালে অন্যরকম লেখা দেখলাম । না বুঝলেও আমি আগের লেখাগুলিকে এত বেশিবার দেখেছি যে আজকের লেখাগুলি যে আলাদা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত । দুদিন দেওয়াল পরিষ্কার থাকায় এ ধারনাও মাথায় এসেছিল যে ছেলেরা নিছক মজা করেই মোছেনি, আমার গোয়েন্দাগিরিতে দেওয়াল- লেখক সজাগ হয়ে লেখাগুলি মুছে ফেলেছে বলে ধারনা তৈরী হয়েছিল । আগেও বলেছি কোনও কিছু বার করতে না পেরে আমার আগ্রহেরও বেশ ভাটা পড়েছিল । কিন্তু আজ নুতন করে দেওয়াল লিখন দেখে আমার জানার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল । দেওয়ালে যেটাই লেখা থাকুক - ওটা যে কাব্যিক বা কবিতা গোছের ; সে বিষয়ে আমার মনের ধারনাটা আরও বদ্ধমূল হলো।



চলবে.......

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৯ দুপুর ২:০৬
৪০টি মন্তব্য ৪০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলা নিয়ে আমার সামান্য কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৮

গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে আমার মন ভালো নেই

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৭ জুনে বিয়ে, অথচ ২২ জুনের সিভিতে ‘অবিবাহিত’? এমপি সাহেবের এই গণিত কে মেলাবে?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮



ধরা খাইলেই “দ্বিতীয় বিবি”! কিন্তু ১৭ জুনের বিয়ার পর ২২ জুনের সিভিতে মাইয়া 'আনম্যারিড' থাকে কেমনে?
সাতক্ষীরার এমপি সাবের এই ভণ্ডামির জট ছাড়াইতে পারবেন তো, নাকি এআই (AI) এর ওপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×