
শ্রদ্ধেয়া জুন আপুনিকে উৎসর্গ করা বিশেষ পর্ব।
পঞ্চম শ্রেণির খ - বিভাগে আমাকে শ্রেণি শিক্ষক করা হয়েছিল । আমরা যারা বিদ্যালয়ে নতুন ঢুকেছি তাঁদেরকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যেকোনও একটি ইউনিটের শ্রেণি শিক্ষকের অপশন দেওয়া হয়েছিল । আমি বাচ্চাদের বেশ ভালোবাসি । আর তাছাড়া একেবারে প্রথম বছরে একটু উঁচু ক্লাসের দায়িত্ব নিতে একটু অনিহা ছিল । পাশাপাশি আমার আবার ইগোর ব্যাপারটি একটু কম আছে । নুতন ঢুকে নিচু ক্লাসের ক্লাস টিচার হতে অনেকের আপত্তি ছিল । কাজেই পঞ্চম -ক অভিজ্ঞ টিচারের জন্য বরাদ্দ থাকায়, খ - বিভাগ চাইতেই পেয়ে গেলাম । স্কুলে ক্লাস ফাইবের ক - বিভাগে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের শ্রেণি শিক্ষক করার পিছনে বিদ্যালয় কতৃপক্ষের যুক্তি ছিল বাইরে বিজ্ঞাপনে নুতনদের তুলনায় পুরানদের দিয়ে অভিভাবকদের সামনে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো তুলে ধরার পক্ষে আদর্শ ক্লাস । ওদের ধারনা প্ররম্ভিক ক্লাস হিসাবে নুতন অভিভাবকদের দৃষ্টি থাকে ক - বিভাগের প্রতি । তাই এরূপ ব্যবস্থাপনা ।
ইন্টারভিউ এর দিন সমন্বয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল । ছেলেটি ক্লাস ফাইবের ;ক - বিভাগে পড়ে । এখন মাঝে মাঝে করিডোরে বা ডাইনিংরুমে দেখা হয় । সাধারনত একটু হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যায় । সেদিন আমি সবে বসেছি হঠাৎ চোখাচোখি হতেই হাসতে হাসতে কাছে চলে এল । আমি ওর মাথায় হাত বোলাতে,
- স্যার আপনি আমাদের ক্লাস টিচার হলেননা কেন ?
- ক্লাস টিচার হওয়ার ব্যাপারে আমরা মতামত দিলেও ফাইনালি বিষয়টি অনেকটা বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমি কাউন্সিলেরর উপর নির্ভর করে । আর তোমাদের সেকশনটা সিনিয়র মাস্টার মশায়দের জন্য বরাদ্দ । তার উপরে আমার বেশি ক্লাস খ - বিভাগে। তোমাদের ক্লাসে সপ্তাহে একদিন গল্প নিতে যেতে হয়। কাজেই যে স্যারের যে ক্লাসে বেশি পিরিয়ড থাকে ওনাকে সেই সেকশনের শ্রেণিশিক্ষক করা হয় । তোমাদের ক্লাস টিচারতো মান্নাবাবু ।
- হ্যাঁ স্যার, মান্নাবাবু । তবে আপনি হলে ভালো হত । মান্নাবাবু খুব রাগি । ক্লাসে সারাক্ষণ চিৎকার করেন । আর রেগে রেগে কথা বলেন ।
- তোমরা স্যারকে রাগাও কেন ? তোমরা চুপচাপ থাকলে স্যার নিশ্চয় রাগ করেননা। তোমাকে আর একটি কথা বলবো। কোনও শিক্ষক মহাশয় সম্পর্কে এভাবে কথা বললে ওনাকে অসম্মান করা হয়। ভালো ছেলে শুধু পড়াশোনাতে নয়, তাকে আচরণেও ভালো হওয়াটা কাম্য - স্যরি স্যার। আর এমন হবেনা। তবে আমরা ওনার ক্লাসে একদম দুষ্টুমি করিনা । সবাই ওনাকে ভীষণ ভয় পাই । তবুও উনি খুব রেগে থাকেন ।
মান্নাবাবুর রাগের কারনটি কী - সেটা আমি বিলক্ষণ জানি । আমি সাধারনত বাচ্চাদের উপর রাগ করিনা । বাবা বাছা বলে কথা বলি । ওদের হাজার প্রশ্নের ঠান্ডা মাথায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি । অথচ সেই আমিও মাঝে মাঝে ওদের উপর ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলি । এমনিতেই বাচ্চারা প্রচন্ড নালিশ প্রবণ । আর পড়ার বাইরে কথা বললে দেখেছি সবাই খুব মনদিয়ে শোনে । কিন্তু যখনই পড়ানো শুরু করবো ওমনি নালিশের বন্যা শুরু হবে । বোর্ড ওয়ার্কের সময় দুমিনিট টানা কাজ করতে পারিনা ওদের নালিশের ঠেলায় ।
নালিশ বন্ধের চিন্তাভাবনা করতে অবশেষে একটি উপায় বার করি । আমি বলে রেখেছিলাম তোমাদের বন্ধুরা তোমাদেরকে যা যা করবে তোমরা মুখে না বলে চুপিচুপি আমার উপর সেটাই প্রয়োগ করে চলে যাবে । প্রথমে ওরা আমার কথা বুঝতে পারেনি । আমি একটু বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যে তোমাদের কোনও বন্দ্ধু তোমাদেরকে যা যা করবে তোমরা মুখে কিছু না বলে বা নালিশ না করে আমার গায়ে হাত বা পেন দিয়ে করলে পেন দিয়ে ঠিক সেটাই করে জায়গায় চলে যাবে । এরফলে আমার পড়ানোয় বিঘ্ন ঘটবেনা , আবার তোমরা স্যারকে অভিযোগটাও জানাতে পারলে । ওরা সবাই প্রায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল ।
আমার নুতন নিয়ম শেখানোর পরেরদিন বোর্ড ওয়ার্ক করছি এমন সময় হঠাৎ শার্টের পিছনে বেশ জোরে টান পেলাম । ঘার ঘুরিয়ে বুঝলাম নালিশের বিকল্প প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বুঝলাম পাশের ছেলেটির টান পেয়ে বাচ্চাটিও আমার শার্টে টান দিয়ে চলে গে্ল। আমি সামান্য ঘার ঘোরানো ছাড়া যথারীতি বোর্ড ওয়ার্ক চালু রাখলাম । খানিকবাদে বামদিকে কোমরের নিচে পেনের গুতো অনুভব করলাম। বুঝলাম নালিশ বন্ধের পাঠ বেশ কাজ দিচ্ছে । কিছুক্ষণ পরে কোমরের উপরে আস্তে করে একটি চড় মারা অনুভব করলাম । বুঝলাম পাশের ছেলেটি নিশ্চয় ওকে চড় মেরেছে । এরমধ্যে আবার পেনের খোঁচা । যাইহোক আমি ওদের এই ছোটো ছোটো প্রতিক্রিয়াগুলিতে বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম । আর বেশ ভালো লাগতো এদের সঙ্গে সময় কাটাতে ।
বেশকিছু দিন এভাবে চলার পর একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যে আমি যখন চেয়ারে বসে পড়াই তখন ওরা আমার সামনে এসে এসব টানাটানি বা খোঁচা দেওয়ার কাজ করেনা। কিন্তু বোর্ড ওয়ার্ক করলে ঘনঘন পিছন থেকে এরকম টানাটানির সম্মুখীন হতে হয় । এরমধ্যে একদিন একটি ছেলে পিছনে দাঁড়িয়ে বললো,
- ও স্যার একটু নিচু হও ।
আমি ওর কথায় সম্মতি জানিয়ে নিচু হতেই, ও আমার কানে হাত দিয়ে চলে গেল । আমি হাসতে হাসতে ওকে প্রশ্ন করি ,
- তোমার বন্ধু তোমাকে কানধরে টেনেছে ?
- হ্যাঁ স্যার ।
- খুব লেগেছে ?
- হ্যাঁ স্যার, বেশ লেগেছে ।
- তাহলে তুমি আমাকে শুধু কানে হাত দিয়ে চলে গেলে কেন ? তোমারতো জোরে কান ধরে টানার কথা ছিল ।
- ও স্যার, তুমিতো স্যার । তোমাকে কি আমরা কান টানতে পারি ?
আমি আবার হাসতে হাসতে এগিয়ে গিয়ে ওর পিঠ চাপড়ে বলি,
- একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি , আমি না বকাবকি করাতে তোমরা বেশ মজা পেয়ে গেছো। যে কারনে আমি যখন চেয়ারে বসে পড়াই তখন তোমরা শান্তভাবে পড়াশোনা কর । কিন্তু বোর্ড ওয়ার্ক করলেই তোমাদের আমাকে স্পর্শ করার একটি মজার খেলা শুরু হয়ে যায় । আচ্ছা,আমাকে তোমরা বন্ধু ভাবোতো?
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো,
-হ্যাঁ স্যার ।
-তাহলে তোমরা কে কে মিথ্যে কথা বলো, হাত তোলো । তোমরা তো জান আমি তোমাদের কোনও শাস্তি দেবোনা।
বেশকিছুক্ষন সময় গেলেও একটি হাতও উপরে উঠলোনা । এবার আমি আবার বলি,
- তোমরা মুখে বললেও প্রকৃতপক্ষে আমাকে বন্ধু ভাবোনা বা সত্যিকথাও বলোনা । বেশ! আমি তাহলে অ্যাকাডেমি কাউন্সিলকে বলে অন্য ক্লাসের ক্লাস টিচার হবো ।
এবারও সবাই চুপচাপ । হঠাৎ একটি ছেলে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো ,
- স্যার আর কখনোও মিথ্যে বলবোনা ।
ওর দেখাদেখি আরও তিন - চারজন উঠে একইভাবে বললো,
- স্যার আর মিথ্যে কথা বলবোনা ।
আপনি তুমি মিশিয়ে,
- তুমি আমাদের ছেড়ে অন্যক্লাসে যাবেনা ।
যারা এতক্ষণ বসেছিল সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলো ,###- স্যার আমরা আর মিথ্যে কথা বলবো না। তুমি আমাদের ছেড়ে যাবেনা, প্লীজ ।
এবার আমি ওদের আশ্বস্ত করি,
- বেশ! তোমাদের ছেড়ে যাবোনা ঠিকই, কিন্তু পড়ার সময় কি এভাবে আর নালিশ বা আমার গায়ে হাতে স্পর্শ বা পেনের খোঁচা চলতে থাকবে?
সবাই বলে উঠলো,
- না, স্যার আমরা আর আপনাকে স্পর্শ করবোনা ।
সত্যিকথা এরপরে ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়েছিল। আর পড়ানো কালীন আর কোনও অভাব - অভিযোগ শুনতে হয়নি।
দেখতে দেখতে স্কুলে দুমাস পার হয়ে গেল। আমি জীবনের প্রথম বেতন পেলাম । আগেই বলেছি বেসরকারি স্কুলে বেতন খুব কম। তবুও বিষয়ের প্রকৃতি দেখে অন্যরা তবুও একটু বেশি বেতন পায় । আমার সঙ্গে ইতিপূর্বে প্রেসিডেন্টের এনিয়ে কোনও কথা হয়নি। তবে বুঝলাম আমার বেতনটি সবার চেয়ে কম ছিল । তাৎক্ষনিক বেশ কষ্ট লাগলেও মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম, বিকল্প কিছু না পেয়ে চাকুরীটা করছি যখন তখন ঐ সামান্য বৈষম্যের কথা না ভেবে মন খারাপ না করতে । যাইহোক যেকটা টাকা পেলাম বাবার হাতে তুলে দিতে আবার গৃহে প্রত্যাবর্তন করলাম ।
সেদিন বাবার হাতে সামান্য কটা টাকা তুলে দিয়ে যে মজা পেয়েছিলাম, পরে স্থায়ী চাকরী পেয়েও সেই আনন্দ, সেইঅনুভূতি আর আসেনি ।এসময় দুদিন বাড়িতে কাটালাম রীতিমতো উৎসবের মেজাজে । তৃতীয় দিন খুব সকালে আবার স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম । আমার আসার সময় আমার মা বাবা বোনের চোখের চাহনি আমার কাছে পৃথক পৃথক বিরাট জিজ্ঞাসা বলে মনে হয়েছিল।
আমার মায়ের একটি শখ ছিল হাত সেলাই করা । আমার কৈশোরে না বুঝলেও পরে অবশ্য বুঝেছি আমাদের মত নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েদের সারাদিন সংসারের কাজ শেষে বিকালে দাওয়াই মাদুর পেতে এরকম সেলাই করা ছিল একমাত্র বিনোদন । ছোটো থেকে দেখতাম মা নিজের মলিন শাড়িতো বটেই পাশাপাশি আমার ও বোনের জামাকাপড় বা বাবার শতফুঁটো পাজ্ঞাবীতে সেলাই দিতে রোজ বিকালে এক দেড় ঘন্টা ব্যয় করতেন । মায়ের চোখে বেশ পাওয়ারের সমস্যা থাকলেও, একাজটি না করলে মায়ের যেন শান্তি ছিল না। চোখের সমস্যা থাকলেও ডাক্তার দেখানো বা চশমা নেওয়াটা আমাদের মত পরিবারের কাছে ছিল বিলাসিতা । কাজেই বাড়িতে একমাত্র বাবার কালো ফ্রেমের চশমাটিই বিকালে মায়ের জন্য বরাদ্দ ছিল । কিন্তু এক্ষেত্রে আমি পড়তাম বেশ বিপদে । বিকালে বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি এলে মায়ের সেলাই কাজটি যেমন সমাধা হত অন্যদিকে আমার যেত বিকালে খেলা বন্ধ হয়ে । মা বারংবার সূঁচে সুতো পড়ানোর জন্য আমাকে ডাকতেন। ফলে মায়ের ডাকে সাড়া দিতে বারবার আসাতে বন্ধুদের খেলায় বিঘ্ন ঘটতো । ওরা আমাকে 'মাডাকা ; নাম দিয়ে খেলতে নিতো না । ফলে আমি বিরস বদনে বন্ধুদের খেলা দেখতাম আর মায়ের পরের বার ডাকের জন্য তৈরী থাকতাম । মাঝে মাঝে বেশি ছেঁড়াফাটা থাকলে মা দুটি মুখ এক করে ধরার কথা বলতেন । ফলে সেদিন বিকালটা অবশ্য আমার একেবারে মাটি হয়ে যেত। । আমি যে একটু নিজের মত করে বিকালে খেলবো সে সুযোগ আর আমার ছিলোনা । তাই যেদিন বাবা কোনও কারনে বিকালে বাড়ি ফিরতে দেরি করতেন সেদিন মা সেলাই কাজে হাত দিতে না পারাতে যেমন চিন্তিত হয়ে পড়তেন আর আমিও ঠিক ততটাই আনন্দ পেতাম একটি স্বাধীন বিকাল উপহার পাওয়ার জন্য । সেদিনের সেই শৈশবে গোমরামুখে কাপর ধরতে বসে মাকে বলতাম,
- বড় হয়ে তোমার জন্য একটি সেলাই মেশিন কিনে দেব।
- আমি কি আর ওসব দেখে যেতে পারবো বাবা ?
- কখনও না। ওসব কথা মুখে আনবেনা।
- বড় হও বাবা। মানুষের মত মানুষ হও, ওটাই হবে আমার বড় পাওয়া ।
এহেন স্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রথম বেতন পেয়ে মায়ের জন্য একডজন নয় একটি শাড়ি ও বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবী কিনে দেখলাম হাতে থাকা টাকা অনেকটা কমে গেছে। বাকি টাকা বাবার হাতে তুলে দিই। দুদিন ছুটি কাটিয়ে আসার সময় বাবা মায়ের সঙ্গে আমার ছোট্ট বোনটির চাহনি, তাকে কিছু না দিতে পারার ব্যর্থতা আমাকে এতটা বেদনাহত করেছিল যে স্থির করেছিলাম, পরেরবার বেতন পেয়ে আর কোনও টাকা খরচ না করে বাবার হাতে তুলে দিয়ে বোনকে পছন্দের একটি ফ্রক কিনে দেওয়ার অনুরোধ করবো।
চলবে.....
বিঃদ্র- ১, পূজাবকাশে একটু ঘুরতে যাওয়ার কারনে পরবর্তী পর্ব পেতে দিন দশেক সময় লাগবে।
২, শ্রদ্ধেয়া মনিরা আপুনির কাছে ' কৃপণতা' বিশেষণ থেকে মুক্ত হতে পোস্টটিকে একটু দীর্ঘ করেছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


