somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরীচিকা ( পর্ব - ১৫ )

১০ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সভাস্থলে বয়স্ক মানুষটি বলতে লাগলেন,
-আমাদের সমাজের একটি নিয়ম আছে। আমরা যার তার সঙ্গে আমাদের ছেলে মেয়েদের বিবাহ দিতে পারি না বা বিবাহ মেনে নিতেও পারি না। তুই খুকি অত্যন্ত বেয়াদবি কাজ করেছিস । এখন শাস্তি তোকে পেতেই হবে। তবে শাস্তিটা এমন হবে যাতে আর কেউ যেন তোর মত ওই পথে হাঁটতে না পারে।
প্রবীণ মানুষটি এবার তরুণকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- তুমি আমাদের সমাজের একটি মেয়ের জীবনকে নষ্ট করেছ। আমরা তোমাদের সমাজে নাক গলাই না । কিন্তু তুমি যা করেছ ক্ষমার অযোগ্য। তবে পাশাপাশি থাকতে হয় বলে তুমি বা তোমাদের ব্যাপারে আজ আমরা নাক গলাবো না। কিন্তু মনে রাখবে, এখন থেকে আর আমাদের মেয়ের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখবে না । এরপরেও যদি রাখো তাহলে তোমার জন্যও আমাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে । যাও তুমি এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও ।

তরুণের সঙ্গে আমরা যারা আদিবাসী নই তাদেরকে চিহ্নিত করে উনি ওখান থেকে চলে আসতে নির্দেশ দিলেন। ফলে তরুণের পিছন পিছনে আমরা সকলেই ওই স্থান থেকে চলে আসি। সাথে সাথে মনে প্রবল খচখচানি শুরু হল; কি এমন বিচারের রায় হবে যেটা আমাদের সামনে প্রবীণ মানুষটি ঘোষণা করতে পারলেন না ।

সেদিন রাতে বাধ্য হয়ে সভাস্থল ত্যাগ করলেও মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল সে কথা অস্বীকার করি কি করে। পরদিন সকালে বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে ব্রাশ করতে করতে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম ; কেউ বিষয়টি নিয়ে কোনো খোঁজ খবর রাখে কিনা । কিন্তু কেউ এ সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারল না। সকাল তখন আটটার সামান্য একটু বেশি হবে , এমন সময় পরপর দুটি পুলিশের জিপ যেতে দেখে মনের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হতে লাগল । কাউকে কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করলাম ; এক্কেবারে সোজা গত রাতের সভাস্থলে। ওখানে গিয়ে আদিবাসী পাড়ার একজন মানুষকেও সামনে দেখতে পেলাম না। আশপাশের বাড়িগুলোও জনশূন্য । একজন পুলিশ কাকুকে এগিয়ে গিয়ে কি হয়েছে, জিজ্ঞাসা করতেই উল্টো উনি আমার নাম ঠিকানা জানতে চাইলেন। তখন অবশ্য বুঝতে বাকি রইল না যে গতরাতে সভাস্থলে ভয়ংকর একটা অঘটন ঘটে গেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা বলতে আদিবাসী পাড়ার কিছু অর্ধ বা সম্পূর্ণ নগ্ন বাচ্চা ; যাদেরকে পুলিশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখলাম। পুলিশ কাকুরা ওদের কয়েকজনের নাম ,বাবার নাম, বাবা কোথায়? প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তরে দেখলাম নিজের নাম বাবার নাম যথাযথ বললেও বাকি প্রশ্নের উত্তরে সকলের এক কথা জানিনা। পুলিশ কাকুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলো। খানিক বাদে ওরা দুটো দলে ভাগ হয়ে পড়ার দুটি রাস্তা দিয়ে সামনের দিকে হাটতে লাগল। আমি আরো কিছুক্ষণ ওদের জিপের কাছে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অবশেষে মিতালীদির বিচার সংক্রান্ত কিছু উদ্ধার করতে না পেরে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।

আদিবাসী পাড়ার ঠাকুরতলা থেকে হেঁটে মাঝপথে পৌন্ড্র পাড়ায় ঢুকেছি ; এমন সময় চার পাঁচ জন পুরুষ-মহিলা আমাকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে ডাকলেন এবং ঘিরে ধরলেন। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ওনারা আমাকে রাস্তার ধারে একটি বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেলেন। পুলিশ কত জনকে গ্রেপ্তার করেছে বা ওখানে আর কি কি হচ্ছে সে সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি তেমন কোন উত্তর দিতে না পারায় ওনারা হতাশ হলেন । এখানেই বরং আমি পাল্টা প্রশ্ন করাতে ওনারা যেটা বললেন ,
- গতকাল রাতে সালিশি সভাতে ওদের সমাজের নিদান অনুযায়ী মিতালীকে শাস্তি দিতে ওদের সমাজের ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সভাস্থলে উপস্থিত মিতালীর বাবা-মা ও দাদা প্রবল আপত্তি করলে জেঠার নির্দেশে বাকিরা ওদেরকে বেদম প্রহার করে। মারের চোটে তিনজনেই সংজ্ঞা হারালে একসময় ওরাই উদ্যোগী হয়ে ওদেরকে হসপিটালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এইভাবে সালিশি সভার নামে একটি পরিবারের উপর অকথ্য অত্যাচার চলতে থাকে। আর মিতালীকে দশ- বারো জন আদিবাসী যুবক টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলেও অত রাতে কোথায় নিয়ে গিছিল সেটি অবশ্য কেউ বলতে পারলো না। ভোরবেলায় পাড়ার লোকেরা একটু দূরে বাগানে প্রাতঃ কাজ করতে গিয়ে মিতালীর অচেতন নগ্ন দেহ দেখতে পেয়ে পাড়ার খবর দেয় । সেই মত কেউ পুলিশকে জানালে সকালে পুলিশ এসে মিতালীকে উদ্ধার করে। তবে দেহে প্রাণ আছে কিনা মনে হয় না ।

সালিশি সভার নামে আদিবাসী সমাজের হাড় হিম করা সন্ত্রাসের ঘটনা শুনে বাস্তবে শিউরে উঠলাম। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম ।এক- পা দু- পা করে বডিটাকে টানতে টানতে কোনক্রমে যখন বাড়িতে এলাম ; ততক্ষনে স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সকালবেলা পড়াশোনা বন্ধ রেখে কোথায় গিয়েছিলাম ? মায়ের এমন বাঘা বাঘা প্রশ্নের উত্তরে ; সত্যি কথাটি বলতেই মা অবাক হয়ে গেছিলেন। মায়ের ছোট্ট মন্তব্যটি,
- কি আশ্চর্য! আমাদের এত পাশে থাকে অথচ ওরা এতটা হিংস্র!
এই ঘটনার পর আমার শরীর ও মনের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়েছিল। যেটা ফিরে পেতে আমাকে পরে আরো বেশ কিছুদিন সময় লেগে গেছিল । । ওদিকে লোকমুখে মিতালীদির খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে ও মরেনি; তবে অবস্থা অত্যন্ত খারাপ । যদিও বাস্তবে কতটা খারাপ ছিল সেটি চোখে দেখার সুযোগ আমার পক্ষে হয়ে ওঠেনি । পরে বিভিন্নভাবে ওদেরকে এই গ্রামে খুঁজে গেছি । তবে একদিনের জন্যও ওদের বাড়ির কারো সঙ্গে কোনদিন সাক্ষাৎ হয়নি । তারপরে এতগুলি বছর পরে আজ চোখের সামনে দাঁড়িয়ে মিতালীদি।

মিতালীদি বলতে লাগলো,
- সেদিন রাতে ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে জঙ্গলে নিয়ে গেছিল। জানোয়ার গুলো আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। আমি আমার সাধ্যমত ওদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করলে ওরা আমাকে প্রচন্ড মারধর করে। সঙ্গে চলতে থাকে জানোয়ার গুলোর ভোগের পর্বও। ফলে ওদের লাম্পট্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এক সময় আমি নিস্তেজ হয়ে পড়ি এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলি । কয়েকদিন পরে হসপিটালের বেডে শুয়ে যখন জ্ঞান আসে তখন শুনি বাড়ির সকলকে ওরা প্রচন্ড মারধোর করেছিল। মারের চোটে বাবার অবস্থা হয়েছিল সবচেয়ে গুরুতর । মেরুদন্ডের সঙ্গে শরীরের একাধিক জায়গার হাড় ভেঙে গেছিলো সঙ্গে ছিল ইন্টারনাল হেমারেজও। শুনেছিলাম অস্ত্রোপচার করেও বাবার শেষ রক্ষা হয়নি। সংক্রমিত হয়ে হসপিটালেই বাবা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাবার মৃত মুখ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়ে ওঠেনি। দাদা আমাকে বাবার মৃত্যুর খবর দেয় নি। কিন্তু কদিন পরেই দাদার গুরুদশা দেখে প্রশ্ন করতেই আর সত্য লুকাতে পারেনি। খবরটি আমাকে এতটাই আঘাত করেছিল যে কান্নার শক্তিও তখন হারিয়ে ফেলেছিলাম। শুধু ভাবতাম, আমার জন্যই সবার জীবনে এত বড় সর্বনাশ হয়েছে। এই ভাবনা আমার হৃদয়কে বারে বারে কুঠারাঘাত করেছিল।

হসপিটালে মা কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হতেই দাদা মাকে মামার বাড়ী পাঠিয়ে দেয়। এদিকে আমিও ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকি । যদিও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে দুই মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল। এই মধ্যবর্তী সময়ে দাদা রাতের বেলা গাছতলায় থেকে দিনের বেলায় ভিজিটিং সময়ে এসে আমাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতো । বয়সে দাদা আমার থেকে চার বছরের বড় ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর এই দাদাই যেন আমাকে বাবার অনুপস্থিতিকে ঢেকে দিয়ে বটগাছের মতো মাথার উপর ছাতা মেলে ধরলো । আমি সুস্থ হতেই দাদা যখন গ্রামে ফিরে যেতে অস্বীকার করল , আমি তখন নিরবে ওর সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ জানিয়েছিলাম । আমাদের মামারবাড়ি সুন্দরবনের বিধবা পল্লীতে। কাজেই হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়ে দাদার সঙ্গে আমরা সোজা মামার বাড়িতে চলে যাই ।

গ্রামে তবুও আমাদের দুই বিঘা পাঁচ কাঠা জমি ছিল। সারাবছর অন্যের জমিতে কাজ করার পাশাপাশি নিজের জমিতেও চাষাবাদ করে আমাদের দিব্যি চলে যেত। কিন্তু নতুন জায়গায় আমরা পড়লাম নতুন একটি সংকটে। এখানে চাষাবাদ ভীষণ কম বা একেবারে হয়না বললেই চলে। এক ফসলি জমিতে যা বর্ষাকালে একটু-আধটু চাষাবাদ হতো কিন্তু আইলার পর সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে। মাইলের পর মাইল জমি সম্পূর্ণ পতিত হয়ে আছে। কাজেই নতুন জায়গায় পেশা হারিয়ে দাদা অন্যান্যদের সঙ্গে জঙ্গলে কাঠ কাটতে, মধু সংগ্রহ করতে বা মাছ ধরতে যেত । ইতিমধ্যে পাশের গ্রামে একটি মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ করে দাদার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়। নতুন বৌদিকে পেয়ে যখন আমরা একটু একটু করে আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে চলেছি ঠিক তখনই এলো আবার একটি দুঃসংবাদ ।

চলবে....






সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:২২
৩৭টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বৃষ্টি বিলাস!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮



বৃষ্টির জন্য খুব বেশি হাহাকার জমেছিল বলেই কিনা,
জমিয়ে বৃষ্টি এসে রীতিমতো আমাদের জমিয়ে রেখেছে-
এখন গৃহ কারাবাস!
বৃষ্টি তুমি কিনা জমিয়ে রেখেছিলে এতটা ক্রোধ!
থামছেই না তোমার চোখ রাঙানি!
অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

প্রিয়,
মেঘ বালিকা
(আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিলাম ) ।



আজ তোমাকে আমার মনের একটি গোপন ইচ্ছার কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
এই বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত,এখানে সবকিছুর একটা শেষ থাকে।
কিন্তু যখনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেঁপের বেগুনী, কুমড়োর চপ, কাঁঠালের বার্গার, ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে ও পেঁয়াজ কুচি করে শুখিয়ে সংরক্ষন!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

উহা পলাতক। যাহা কখনো পালায়না উহাই পালিয়েছে। উহা রান্না করা ভাত তরকারী বাস্প উড়ছে খেতে পারেনি কিন্তু তাতে কি উহা প্রতিদিন ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা প্রতিদিন খেয়েছে! :B#... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের আনন্দের ফুল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯



প্রেয়সি হে প্রিয়তমা গিয়েছ কোথায়?
হারায় অমৃত ঘুম খোলা আখি পাত
বিবর্ণ অনেক লাগে জোছনার রাত
তোমায় হারিয়ে প্রিয়া আঁধার জীবন।
আসবে কি ফিরে তুমি সুখের প্রভায়
জীবন রাঙ্গিয়ে দিতে? অপেক্ষার হাত
তোমার পরশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×