আমি ভেবেছিলাম কখনো রাজনীতি নিয়ে কিছু বলবো না, সব সময় ‘গা বাচানো’ নীতি নিয়ে চলবো | এখন তো কেউ রাজনীতি নিয়ে কথা বললেই তাকে নানান ভাগে ফেলে দেওয়া হয় | দরকার কী তার আমার? সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, এমনি চালিয়ে যাবো – পথে চলাফেরা করতে হলে চলবো, নইলে ঘরে লেপের তলায় বসে ফেসবুকে খেলা, গান, মুভি নিয়ে স্ট্যাটাস দিবো ; বাস্তবতা থেকে যত দূরে থাকা যায় আরকি|
কিন্তু আরো অনেকের মত ‘I hate Politics’- এই দর্শন নিয়ে চলতে আজ বাঁধছে | আমি চোখ বন্ধ করে সমস্ত বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু বাস্তবতা তো আমাকে ছেড়ে কথা বলবে না | আগুন পাশের বাড়িতে লেগেছে, আমার বাড়িতে তো লাগেনি ভেবে পানি নিয়ে আগুন নেভাতে না গেলে আমার বাড়িও পুড়তে পারে |
আমি পাবলিক বাসেই চলাফেরা করি | আমি চাকরিজীবি, ব্যবসায়ী, ছাত্র – অনেকেরই মতামত শুনেছি বাসে চলাফেরার সময় | তারা কেউই দেশের রাজনীতি নিয়ে সন্তুষ্ট না | তাদের কথায় উঠে আসে যে তারা সচেতন, তাদের ভালো-মন্দ বুঝার ক্ষমতা আছে | কিন্তু ক্ষমতা থাকাটাই মূল নয়, সেই ক্ষমতাটার ব্যবহারও করতে জানতে হবে | আমরা যদি সব বুঝেও চুপ করে থাকি, তাহলে সেই বুঝার আদতে কোন মূল্যই নেই |
আমরা একটা ছোট দেশ, কিন্তু দেখো কত শত মানুষ | আমাদের সুযোগ, সুবিধা, সম্পদ- সবই সীমিত | এর মধ্যে একটা বড় সম্পদ আমরা যারা তরুণ | আমাদের বয়সটা দেশ গড়ার বয়স, একে ভাঙ্গার নয় | দেশের তরুণ সমাজের বড় অংশই স্বপ্ন দেখে, দুর্দান্ত খাটে বা খাটতে চায় | কিন্তু সেই খাটার সুযোগ কি আমরা পাচ্ছি?
তাহলে কী করা উচিত আমাদের?
আমাদের সবাইকে এক হয়ে একই লক্ষ্যে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে |
হেলাল হাফিজের একটা কবিতা তুলে দিচ্ছি-
মিছিলের সব হাত
কন্ঠ
পা এক নয় ।
সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে
কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয় ।
মিছিলের সব মানুষ এক জায়গা থেকে আসে না, তাদের ভাবনা-চিন্তাও একরকম নয় | কিন্তু যে আদর্শ নিয়ে মিছিল হবে, তার লক্ষ্য এবং ভিত্তি নিয়ে সবাইকে একমত তো হতে হবে | সম্মিলিতভাবে কিছু চাইলে তা হবে না কেন? প্রশ্ন এইটাই, স্বাধীনতার পর আমরা সম্মিলিতিভাবে জাতি হিসেবে কিছু কী চেয়েছি? এবার প্রশ্ন করি নিজেকে আমি অন্যায় সুযোগ পেলে নিব কিনা? আমি যে নীতি ও আদর্শের কথা বলি, তার কতটুকু আমার ভিতরে আছে? আর যদি আমি নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলি, তাহলে আমার তো এটাও খেয়াল রাখা উচিত আমি অন্য কারো অধিকার খর্ব করছি নাতো? অন্যের জন্য, দেশের জন্য আমরা কতটুকু ছাড় দিতে রাজি আছি?
তোমার সাথে আমার বনে না, তার সাথেও না | আমি চলবো আমার মত, অন্যেরা কী ভাবলো তাতে যায় আসে না | -----তোমার ভাবনা কী এইরকম? তাহলে কিভাবে তুমি আশা কর তুমি যখন অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করো না, অন্য কেউ তখন তোমারটা করবে? হয়তো তোমার দরকারই নেই ঐসবের, তাই না? কিন্তু খেয়াল করো, তুমি তোমার মতাবলম্বী একটা দল নিয়ে খুশি থাকলে, অন্যরাও তোমার আদর্শই অনুসরণ করে ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করলো | যখন তোমাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘর্ষ দেখা দিল, তোমরা একে অন্যকে আঘাত করলে, নিজের মত প্রতিষ্ঠায় কাজটা ঠিক কী বেঠিক বিচার করলে না , হয়তো প্রতিপক্ষকে দমিয়েও দিলে | কিন্তু এখানেই কী শেষ হয়ে গেলো? আজ যারা দমে গেলো, কাল তারা এই স্মৃতি মনে রেখে বদলা নিতে চাইবে | আর এমনি যদি চলে, তাকিয়ে দেখো, তোমরা কেউ কী আগাতে পেরেছ? আঘাত শুধু প্রত্যাঘাতই বয়ে আনে |
যারা বোমা বানাচ্ছে টাকার বিনিময়ে, যারা মানুষ মারছে, আহত করছে – তাদের কেউ কী এই লেখা পড়বে? যারা দুর্নীতি করছে, কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে- তারা কি পড়বে? যারা দেশ নিয়ে না ভেবে নিজের স্বার্থের খেলায় মেতে উঠেছে, তারা কি পড়বে? মনে হয় না | তাহলে কেন লিখছি? লিখছি কারণ তোমরা আমার মতই তরুণ – যদি বয়সে না হয়, তাহলে অন্তত মনে | তোমরা নিশ্চয়ই চাও না দেশটা এমন চলুক | রাজনীতির নোংরা খেলা দেখতে দেখতে তোমরাও হয়ত ক্ষুব্ধ | তোমরা কেউ হয়ত ঘৃণা করো এই রাজনীতি, কেউবা রাজনীতিতেই আছ | কিন্তু আমি যেটা বিশ্বাস করি, যদি সুযোগ পাও, তোমরা সবাই সঠিক সিদ্ধান্তই নিবে, দলের রাজনীতি ছেড়ে দেশের রাজনীতিই করবে, রাজনীতিকে ঘৃণা না করে অর্থনৈতিক বিকাশের পথ খুঁজবে |
এখন সুযোগের প্রশ্নে আসি | সুযোগটা কি কেউ তৈরী করে দিবে? এমন কোন মহান নেতা কী আসবেন, যার উত্তরীয় ধরে আমার পগার পার হয়ে যাবো? উত্তরটা হলো, ‘না’ | কেউ আসবে না | আমাদের ভবিষ্যত আমাদেরকেই গড়তে হবে, সেটা কেউ গড়ে দিবে না | কারো অপেক্ষায় চেয়ে যদি কাটিয়ে দিই, দিন বদলাবে না | আর যদি আমরা না চাই, তাহলে আজ থেকে বিশ বছর পরেও(যখন চল্লিশের দ্বারগোড়ায় পৌঁছাবো, বা পৌঁছে গেছি), আমরা এমন অনিরাপত্তায়, আশংকায়, আতংকে দিন কাটাব | পদক্ষেপ নেয়ার সময় আজই, এটাই, এখনই |
আমি লেখার সময় নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, এই যে কথাগুলো বলছি, সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য আমি তৈরী কিনা? উত্তর হলো, ‘না’| কিন্তু একইসাথে এই উপলব্ধিও হল যে, যদি আজীবন ‘তৈরী কিনা?’ এই প্রশ্নই করে যাই, তাহলে জীবনে কখনো আর তৈরী হতে পারব না | তাই বদলাতে হলে নামতে হবে অপ্রস্তুত অবস্থাতেই | বাস্তবতার জন্য কেউ কখনো সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে পারে না |
আমি একজন সাধারণ মানুষই, একজন গড়পরতা মানুষ | আমার মধ্যে যে ভাবনা আসে, তোমাদের মাথায় তার চেয়েও ভালো কোন ভাবনা আসবে | তোমাদের ভাবনাগুলো শোনার জন্যই বসে থাকবো | আর সত্যিকার ‘ভাবনা’ সেগুলোই যেগুলো তুমি আসলেই কাজে পরিণত করতে চাও, তুমি ছাড় দিতে পারবে যেগুলোর জন্য | কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয় |
তোমদেরকেই বলছি, তোমরা কি শুনছো?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৪ সকাল ১১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


