
শামচুল হক
ছান্ধিয়ার মনের কথা (গল্প দ্বিতীয় পর্ব)
মুচীর মেয়ে ছান্ধিয়া (গল্প প্রথম পর্ব)
আমার বসার একটু পরেই একজন কালো মত লোক দোকানে এলো। লোকটির গায়ের রং কুচকুচে কালোই বলা চলে, মুখে খোচা খোচা দাড়ি, চোখ দু’টো কোটরগত লাল লাল, গোফগুলো বেশ লম্বা লম্বা, গোফের তুলনায় দেহের গঠন খুবই দুর্বল, লম্বায় পাঁচ ফুটের হয়তো একটু বেশি হবে, চেহারা মোটেই সুশ্রী নয়। নেশার কারণেই হোক আর রোগের কারণেই হোক দেখতে কিছুটা রোগাটে রোগাটে মনে হয়। ছান্ধিয়া পরিচয় করিয়ে দিল। দাদা ইনিই আমার বর। বরের দিকে ভাল করে তাকালাম। বর আমাকে নমস্কার দিল। আমি মাথা ঝুঁকে নমস্কার গ্রহণ করলাম। বরকে ছান্ধিয়ার পাশে বসতে বললাম। বর বসল। কিন্তু ছান্ধিয়ার সাথে একদম বেমানান। একই খাঁচায় ময়ুরের সাথে কাক রেখে দিলে যেমন বেমানান দেখায়, তেমনই এদের জুটি। ছান্ধিয়ার চেহারা শুধু ফর্সাই নয় গায় গতরে নাদুস নুদুস সুন্দরীও বটে। কিন্তু বর সেই তুলনায় কুৎসিত।
ছান্ধিয়া আমাকে বসিয়ে রেখে কোথায় যেন চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে মিস্টির দোকান থেকে অনেক গুলো মিস্টি নিয়ে এলো। ওর স্বামী আমার পাশেই বসে আছে। মিস্টির প্যাকেটটি নিয়ে আমার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল, দাদা, চোখটা বন্ধ করেন তো।
আমি বললাম, কেন?
আহা! প্রছনো করছেন কেন? আমি আপনার ছোট বোন হয়ে চোখ বন্ধ করতে বলছি বন্ধ করেন।
ছোট বোন দাবী করে এমন আবদার করায় না করতে পারলাম না। চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু চোখ বন্ধ করার পরও সে আবার আরেকটি আবদার করে বসল, হা করেন।
-- আবার হা করবো কেন রে?
-- আমি হা করতে বলছি হা করেন, আবার প্রছনো করছেন কেন?
বুঝলাম, হা না করা পর্যন্ত ও ছাড়বে না। ছোট করে হা করলাম।
ও আবার বলল, দাদা এত ছোট হা করলেন কেন, আরো বড় করে হা করেন।
ওর শিশুশুলভ আচরণ দেখে বড় করে হা করতে বাধ্য হলাম। বড় করে হা করা মাত্রই একটা বিশাল সাইজের মিস্টি মুখে ঢুকিয়ে দিল। বড় মিস্টি মুখে নিয়ে কিছুটা বিপদেই পড়ে গেলাম, না পারছি মুখ নাড়াতে না পারছি কথা বলতে। আমার এ অবস্থা দেখে ছান্ধিয়া খিল খিল করে হেসে উঠল, সাথে সাথে মুগীলালও হাসল। কিন্তু ওর স্বামীকে হাসতে দেখলাম না। ওর স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখি ও আমার দিকে কেমন আশ্চার্য হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি মুখ ঘুরিয়ে ছান্ধিয়ার দিকে তাকালাম। ছান্ধিয়া মিস্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে তখনও হাসছে। অনেক কষ্টে মিস্টি গিলে ছান্ধিয়াকে বললাম, এটা তুই কি করলি রে?
-- কেন দাদা, আপনার বুঝি মনে নেই, ছোট থাকতে আপনি যে আমাকে চোখ বন্ধ করতে বলে মুখের মধ্যে চকলেট দিয়েছিলেন?
ছান্ধিয়ার কথা শুনে সেই পুরানো দৃশ্যটি মনে পড়ে গেল। হাই স্কুলের রাস্তাদিয়ে বিকালের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি ছান্দিয়া এবং তার মা উল্টা দিক থেকে আসছে। কাছে আসলে ছান্দিয়ার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাকী কোথায় গিয়েছিলেন?
ছান্ধিয়ার মা বলল, বাবা বাজারে গিয়েছিলাম।
-- কেন?
-- বাজার করতে।
-- ছান্ধিয়াকে বাজারে নিয়ে কি খাওয়ালেন?
আমার কথা শুনে ছান্ধিয়া তাড়াতাড়ি জবাব দিল, না দাদা আমি কিছু খাইনি।
-- কেন খেলি না কেন?
-- ইচ্ছা হয়নি তাই খাইনি।
আমি ওর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বললাম, চোখ বন্ধ কর?
-- কেন দাদা?
-- আহা! চোখ বন্ধ করতে বললাম, চোখ বন্ধ কর।
আমার কথা শুনে ছান্ধিয়া মায়ের দিকে তাকালো। ছান্ধিয়ার মা ছান্ধিয়াকে বলল, তোর ভাইয়া যখন চোখ বন্ধ করতে বলেছে তখন চোখ বন্ধ কর।
মায়ের কথা শুনে ছান্ধিয়া চোখ বন্ধ করল। আমি ওকে হা করতে বললাম। ছান্ধিয়া ছোট করে হা করলে টুপ করে একটা চকলেট ওর মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বললাম, এবার যা।
ছান্ধিয়া চোখ খুলে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে চকলেট মুখে নিয়েই বলল, মা।
মা বলল, কিরে?
-- চকলেট।
-- তোর ভাইয়া তোকে আদর করে চকলেট মুখে দিয়েছে, খেয়ে নে।
ছান্ধিয়া চকলেটটি মুখে পুরে আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলল, আপনার পকেটে কি ছবছময় চকলেট থাকে দাদা?
-- সবসময় নয়, মাঝে মাঝে থাকে।
ছান্ধিয়ার মা আমার কান্ড দেখে হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে বাবা, এখন তা হলে আছি।
ছান্ধিয়াকে চকলেট খাওয়ানোর ঘটনাটি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু ছান্ধিয়া ঠিকই মনে রেখেছে। শুধু এই ঘটনাই নয়, কলেজ জীবনে ওর সাথে দেখা হওয়ার প্রত্যেকটা ঘটনাই ওর মনে আছে। ওর স্মৃতি শক্তির প্রশাংসাই করতে হয়।
আমি মিস্টি খেয়ে আবার ওর স্বামীর দিকে তাকালাম। ওর স্বামী তখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ছন্ধিয়ার মিস্টি খাওয়ানোটা তার স্বামী কিভাবে নিয়েছে সেটা আমি কিছুটা অনুমান করলেও পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। ছান্ধিয়ার বরও কিছু বলতে পারছে না। কারণ মুগীলাল কাছেই বসা। ছান্ধিয়ার দুস্টুমি দেখে মুগীলালও হাসছে। ছান্ধিয়ার স্বামী মিস্টি খাওয়ানোর এমন দুষ্টুমি সহ্য করতে না পারলেও কিছু বলতেও পারছে না। মনে মনে আমার প্রতি রাগলেও প্রকাশ করতে পারছে না। রাগে দুঃখে শুধু আহাম্মকের মত তাকিয়ে আছে।
ছান্ধিয়া দুষ্টুমি শেষে মিস্টির প্যাকেটের উপরের কভার খুলে আমার সামনে মেলে ধরল। আমি প্যাকেট থেকে আরো দু’টি মিস্টি খেয়ে বাকীগুলো রেখে দিলাম।
মুগীলালের বন্ধুত্ব আর ছান্ধিয়ার ভালোবাসাময় দুষ্টুমীতে ধর্ম-জাত-পাত-বর্ণ ভুলেই গেলাম। হারিয়ে গেলাম মানুষ হিসাবে মানুষের সাথে। সারা জীবনেও যেখানে ওদের ছোঁয়া কোন খাবার খাইনি, সেখানে ছান্ধিয়ার নিজ হাতে মুখে তুলে দেয়া মিস্টি বিনা সংকোচেই খেয়ে নিলাম। খাওয়ার সময় এতটুকু ঘৃণাও হলোনা। অথচ রিক্সায় আসার সময়ও ছান্ধিয়ার পাশে বসে ছান্ধিয়ার সাথে কিছুটা হলেও দূরুত্ব বজায় রেখেছিলাম। কিন্তু এই মুহুর্তে ওদের আপ্যায়ন আর ভালোবাসার কাছে সব ভুলে গেলাম। কলেজ জীবনে মুগীলালের সাথে যেভাবে হাসি ঠাট্টায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম আজও তেমনি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।
মিস্টি খাওয়া শেষ হতেই ছান্ধিয়া কাঁচের গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলো। পানি খেয়ে ছান্ধিয়ার হাতে গ্লাস দিতে দিতে মুগীলালের দিকে তাকিয়ে বললাম, মুগীলাল-- এবার তাহলে উঠি রে?
আমি বিদায় চাইতেই মুগীলাল ছোট একটা বন্ধুসুলভ ধমক দিয়ে বলল, আরে রাখ তোর উঠি উঠি, তোর সাথে কথাই বললাম না তার আগেই বলছিস উঠিরে। আজ তুই যেতে পারবি না।
মুগীলালের কথা শুনে ছান্ধিয়া মনে হয় খুব খুশিই হলো। সেও চাচ্ছে আমি আজ থেকে যাই। তাহলে সে মনের ভিতর লুকিয়ে রাখা আরো অনেক কথা আমকে বলতে পারবে।
তাদের দুইজনের আন্তরিকতাপূর্ণ সমাদর দেখে ছান্ধিয়ার স্বামী আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বরের তাকানো দেখে ছান্ধিয়া বলল, এই দাদা আমার দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ছোট থাকতে এই দাদা আমাকে অনেক আদর করতো। রাস্তা পথে দেখা হলে অনেক কিছু কিনে খাওয়াতো। আমি তার কাছে ছোট বোনের মত আদর পেতাম। ছান্ধিয়ার কথা শুনে বর বলল, এতক্ষণে বুঝতে পারছি।
ছান্ধিয়ার কথা শেষ হলে আমি দুধ লালকে অনুরোধ করলাম, আমি থাকতে পারবো না রে। বাড়িতে বলে আসিনি। বাবা মা আমাকে খুঁজবে। আজ চলে যাই, অন্যদিন এসে তোদের সাথে রাত কাটাবো। আমার কথা বলা শেষ হতে না হতেই কালো একটি মহিলা কারুকাজ করা ধবধবে সাদা শাড়ি পরে দোকানে এলো। ছান্ধিয়া লাফিয়ে উঠল, দাদা, এটা দাদার বউ, আমাদের বউদি।
ছান্ধিয়া তার বউদির সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল, ইনি আমার দাদার বন্ধু। নাম রতন দা। নমস্কার কর বউদি-- নমস্কার কর--।
মুগীলালের বউ নমস্কার করল। আমি নমস্কারের জবাব দিলাম। মুগীলালের বউয়ের চেহারা ফর্সা না হলেও কুৎসিত নয়। কালোর মধ্যেও শরীরে জৌলুস আছে। মাঝারি ধরনের সুঠাম দেহ। গোলগাল মুখমন্ডল। চোখদুটো টানা টানা হরিনীর মত। কারুকাজ করা সাদা শাড়িতে ভালই লাগছে। তবে মুগীলালদের পরিবারের সাথে এদের চেহারায় কোন মিল নেই। মুগীলালরা ধবধবে ফর্সা আর তাদের জুটিগুলো কালো।
মুগীলালের বউ ছান্ধিয়ার পাশেই দাঁড়ানো ছিল। আমি একটি দোকানের টুল দেখিয়ে বললাম, বউদি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসেন।
আমার কথা শুনে মুগীলালের বউ কিছুটা লজ্জাবনত হয়েই মুখে আঁচল গুজে মৃদু হেসে বলল, না দাদা বসবো না, আমি এখোনি চলে যাবো।
মুগীলালের বউয়ের কথা শুনে ছান্ধিয়া আগ বাড়িয়েই বলল, আরে বউদি লজ্জা করছেন কেন? দাদা আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ। আমরা তিনজন ভাই বোনের মত।
ছান্ধিয়ার কথা শুনে মুগীলালের বউ মুগীলালের দিকে তাকালে, মুগীলাল হাসি হাসি মুখেই বউকে বলল, ছান্ধিয়া ঠিকই বলেছে, ও আমার গলাধরাধরি করা বন্ধু, ওর সামনে লজ্জা করা যাবে না।
স্বামীর কথায় মুগীলালের বউয়ের কিছুটা মনে হয় লজ্জা ভাঙল। তবে ছান্ধিয়া, মুগীলালের মত অতটা আন্তরিক হতে পারল না। সম্পর্কের দূরুত্ব রেখেই কথা বলতে লাগল।
আমি তাকে খোলামেলা করার জন্য প্রথমেই ইয়ার্কি করে বললাম, মুগীলালকে কেমন লাগে আপনার।
মুগীলালের বউ স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল, ওতো আমার ছামী, ছামীকে কি কখনও খারাপ লাগে?
আমি আশ্চার্য হওয়ার ভাব ধরে কিছুটা অভিনয় করেই দুই হাত নাড়িয়ে চোখ কপালে তুলে বললাম, বলেন কি! কখনও খারাপ লাগে না?
আমার ভাব দেখে মুগীলালের বউ মনে করেছে সত্যি সত্যিই হয়তো আমি তার কথায় আশ্চার্য হয়েছি। আমার অভিনয় বুঝতে না পেরে সেও আশ্চার্য হয়ে বলল, বোলেন কি দাদা! ছামীকে আবার খারাপ লাগবে কেনো? আপনি আপনার স্ত্রীকে দিয়ে বুঝেন না? আপনার স্ত্রীকে কি আপনার খারাপ লাগে?
মুগীলালের বউয়ের কথা শুনে মুগীলাল, ছান্ধিয়া একসাথেই হো হো করে হেসে উঠল। মুগীলাল হাসতে হাসতেই বলল, আরে কার সাথে কি বলছো? ও তো বিয়েই করেনি, ও বউয়ের ভালোবাসাবাসি বুঝবে কি করে?
মুগীলালের কথা শুনে মুগীলালের বউ লজ্জা পেয়ে গেল। মুখটা নিচু করে বলল, আপনি তো দেখি আচ্ছা রোসিক লোক। নিজে বিয়ে করেন নাই অথোচ আরেক জনের বউয়ের ভালোবাসা খুজঁতে এসেছেন।
-- নিজে বিয়ে করি নাই দেখেই তো অন্যের ভালোবাসার খোঁজ খবর নিতে হয়। ভালোবাসার খোঁজ খবর না নিলে বন্ধুবান্ধবরা সুখে আছে না কষ্টে আছে কি করে বুঝবো?
আমার কথা শুনে ছান্ধিয়া বলে উঠল, আরে বৌদি দাদার ছাথে কথায় পারবেন না, দাদা মজার মানুষ। দাদাকে আজকে রাতে রেখে দিলে দেখবেন, দাদা কেমন ছারা রাত ছবাইকে হাছিয়ে মারে।
লজ্জাবনত মুগীলালের বউ ছান্ধিয়ার কথা শুনে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল, তাহলে দাদা আপনার ছাথে ছবাই মিলে রাতেই গোল্প কোরবো।
ছান্ধিয়া দন্ত ‘স’ কে ‘ছ’ উচ্চারণ করায় যেমন ওর কথাগুলো সুন্দর শোনায়, মুগীলালের বউয়ের ‘ছ’-এর পাশাপাশি কিছু কিছু শব্দে ‘ও’কার যোগ করায় কথাগুলো শুনতে আরো মজা লাগতে ছিল। কিন্তু সময়ের স্বল্পতার জন্য এই মজার আড্ডায় বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হলো না।
ওদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠায় বাড়ি ফেরার কথা মনেই ছিল না। মুগীলালের বউয়ের কথায় ট্রেনের কথা মনে পরে গেল। আমি বিদায় চাইতেই তিনজনেই না না করে উঠল। অল্প কিছু কথা বার্তা বলাতেই মুগীলালের বউ ওদের মতই আমার প্রতি আন্তরিক হয়েছে। আগে ছিল মুগী লাল আর ছান্ধিয়া এবার তার সাথে যোগ হয়েছে মুগী লালের বউ। তিন জনের আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারে আমারো মন উঠতে চাচ্ছিল না। কিন্তু বাড়ি না ফিরে উপায় নেই, বাবা মা দুঃশ্চিন্তা করবে।
ওরা আমার থাকার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করল, কিন্তু আমি রাজি না হওয়ায় অবশেষে বিদায় দিতে বাধ্য হলো। মুগীলাল আমাকে স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসতে চেয়েছিল। হঠাৎ কয়েকটি জুতার কাস্টমার আসায় নিজে না এসে ছান্ধিয়াকে আমার সাথে পাঠালো। মুগীলাল ছান্দিয়ার হাতে একশত টাকার একটি নোট দিয়ে বলল, স্টেশনে গিয়ে নিজে টিকিট কেটে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসবি।
ছান্ধিয়া এ দায়িত্ব পেয়ে খুব খুশিই হলো। সেও মনে মনে এরকম দায়িত্বই চাচ্ছিল।
ছান্ধিয়া রিক্সা ডেকে এনে আমাকে আগে রিক্সায় উঠতে বলল, আমি রিক্সায় উঠে বসলে তারপরে সে আমার বাম পাশে বসল। তবে আগের মত এত কথা বলল না। চুপচাপ বসে থাকল। মাঝ রাস্তায় এসে বলল, দাদা, আমার বরকে দেখেছেন তো?
বললাম, দেখলাম তো। বলেই ওর মুখের দিকে তাকালাম। ছন্ধিয়া অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে মুখ না ঘুরিয়েই বলল, বলেন তো দাদা, এই বর কি আমার ছাথে মানায়?
ছান্দিয়া তার বর সম্পর্কে সরাসরি এরকম কথা বলবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিয়ের পরে বর নিয়ে এরকম মন্তব্য করাটা, তার মনের কত যে কষ্টের বহিঃপ্রকাশ সেটা যারা ভুক্তভোগী তারাই বুঝবেন। ছান্দিয়া তার বর সম্পর্কে প্রশ্নটি করেই চুপ করে আছে। আমি তার প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। যেখানে দু’জনের চেহারায় আকাশ পাতাল পার্থক্য, সেখানে আমি কি বলে সান্তনা দিব। সান্তনা দেয়ার মত কোন ভাষাই খুঁজে পেলাম না। চুপ করে বসে থাকলাম। আমি চুপ করে থাকায় সেও কোন কথা বলল না। আমি রাস্তার পাশের দৃশ্য দেখছি সেও অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে বলতে পারি না। স্টেশনে কখন রিক্সা এসেছে তাও বলতে পারি না। ছান্ধিয়ার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। ছান্দিয়া রিক্সা থেকে নেমে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, দাদা নামবেন না?
হুশ হারা লোকের হুশ ফিরে এলে যেমন হয়, আমিও তেমনি সম্বিত ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি রিক্সা থেকে নেমে এলাম। ছান্ধিয়া রিক্সার ভাড়া দিয়ে আমাকে নিয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে গেল। আমাকে কাউন্টারের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজেই একটা টিকিট কাটল। আমি টিকিট কাটতে নিষেধ করলেও মানলো না।
ট্রেন আসার অপেক্ষায় স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পাশে ছান্ধিয়াও দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন স্টেশনে আসার পূর্ব মুহুর্তে আমার হাতে টিকিট দিয়ে বলল, দাদা, আপনি আবার কবে আছবেন?
ছান্ধিয়ার কথা শুনে মুখের দিকে তাকালাম। চোখ দু’টা জলে ভিজে গেছে। আমি ওর মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে আর তাকাতে পারলাম না। ধরা গলায় বললাম, আসবো রে, সময় হলেই আসবো।
ট্রেন এসে দাঁড়ালো। আমি দরজা দিয়ে ট্রেনে উঠলাম। আমি ট্রেনের কামরায় যে জানালার পাশে বসেছি, ছান্ধিয়া সেই জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো। আমার দিকে চেয়ে কেঁদে দিল। আমি ওর চোখের দিকে আর তাকাতে পারলাম না। আমারো চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মাথা নিচু করে চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করলাম। ট্রেন ছেড়ে দিলে মাথা তুলে তাকালাম। ছান্ধিয়া মুখে আঁচল গুঁজে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন প্লাট ফরম ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে। স্টেশনের দিকে আবার তাকালাম কিন্তু দূর থেকে নজর যায় না। ছান্ধিয়াকে আরেক নজর দেখার খুব ইচ্ছা হলো কিন্তু দেখতে পেলাম না।
সিটে বসার পর সামনের সিটের মহিলা জিজ্ঞেস করল, মহিলা আপনার কে হয়?
আমি বললাম, ছোট বোন।
-- আপনি চলে আসায় মেয়েটি খুব সক পেয়েছে।
আমি শুধু বললাম, ওকে ছোট কালে খুব আদর করতাম তো, এই জন্য ও আমাকে ভুলতে পারছে না।
মহিলা কেন যেন একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, এরকম ভাই বোন হতে আমারো মন চায়।
অনাকাঙ্খিতভাবে এমন কথা শুনে, আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কোন কথা বললাম না।
০০০ সমাপ্ত ০০০
(ছবি ঃ ইন্টারনেট)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




