কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর.....
... চিৎকার করে গাইতে ইচ্ছে করেছে মাসুমের । কিন্তু অত জোর কই কণ্ঠে? কেঁপে উঠছে গুমরে গুমরে সুর। কষ্টের ভারে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে সে সূর্য দীঘির উত্তর পাড়ে একা। নিরিবিলা এলাকা। দু' গাঁয়ের সীমানা টেনেছে দীঘিটি। দীঘির অর্ধেক পড়েছে মাসুমদের গাঁয়ে আর বাকী অর্ধেক পাশের গাঁয়ে, যে গ্রামেই আজ স্থায়ী বসত সাবিহার। চোখের বাধে মাসুমের এই পড়ন্ত বেলায় ফাটল ধরেছে , চুইয়ে চুইয়ে ঝরছে পানি । দীঘির অত জলের কাছে হয়তো অতি তুচ্ছ সে জল--চোখের। তাহলে কি হবে?- সে যে অতি আপন , মনের শুদ্ধ সরোবর হতে উঠে আসা। সে জল যে একজনের বিরহের সত্য ফসল। কান্নার জল কিছু মিশছে দীঘীর পাড়ের ঘাসে , একসময় মিইয়েও যাবে ঠিক বাতাসে । কিন্তু আসলেই কি আর মিইয়ে যায় মনের বেদনা? চোখের জল তো বেদনার বর্জ্য কেবল। কষ্ট বেড়ে গেলেই উপচে উপচে ওঠে।
দীঘির পাড়ের এই পড়ন্ত বেলার বিষন্নতা তার কাছে আজ নতুন না। এই পথ দিয়ে তাকে সপ্তাহে অন্তত তিন চারাবার যাতায়াত করতেই হয়। আসতে হয় সাবিহার শ্বশুর বাড়ীর পাশ দিয়ে। নিজের গ্রাম পেরিয়ে সাবিহার শ্বশূর বাড়ীর গ্রাম তারপরের গ্রামটিতে বড় বাজার। ওখান হতে ডাক আসে। নিজের গ্রামে ছোট বাজারে একটা কাঠের দোকান আছে মাসুমের । আশেপাশের 10 গ্রামে কাঠের আসবাবে তার মতো বার্নিশ কাজে ওস্তাদ লোক আর কেউ নেই। বড় বাজারে তাই তার বেশ নাম ডাক। ঘন্টা চুক্তিতে রঙের কাজ করে সে সেখানে। ভালই ইনকাম আজকাল তার। বুড়া মা আর এক ছোট ভাইকে নিয়ে তার ছোট সংসার বেশ ভালই কেটে যায়। ছোট ভাইটাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। একমাত্র বোনটাকে শ্বশূর বাড়ীতে আজ আর কোন গঞ্জনা শুনতে হয়না। জামাইয়ের টিভি , সাইকেল , ঘড়ি এসবের কোনো দাবীই অপূর্ণ রাখতে দেয়নি মাসুম। এসবই হয়েছে মাত্র গত দেড় বছরে। অথচ বাবা মারা যাবার পর তিন চার বছর কি কষ্টাই না করতে হয়েছে এই পরিবারটিকে। তিনবেলাই খাবার জুটেছিল এমন কোন দিন তাদের ছিলনা। অবশেষে বাজারে বেহাত হয়ে যাওয়া বাবার মুদির দোকানটা ফিরে পেল যখন দেরী করেনি, পরিশ্রমের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছিল মাসুম। ততদিনে বড় বাজারে কাঠের দোকানে টুকটাক ফাইফরমেশ খাটতে খাটতে শিখে ফেলেছিল অনেকটাই কাঠের কাজ। রাত দিন চবি্বশ ঘন্টা কাজ করেছে সে দোকানে। দিনে পর দিন ঘুমিয়েছে ওখানেই। ঘরে ফিরে কি হবে, কি হবে গ্রামের কোন আড্ডায় বসে। বাবার মৃতু্য আর হঠকারীদের হঠকারীতায় মন ভাঙার পর যতটুকু জিইয়ে রেখেছিল দুবাড়ী পরের ভালবাসার সুখ সাথী সাবিহা নামের মেয়েটা, সেটাও যে ভেঙে গেল যেদিন চোখের সামনে বিয়ে হলো মেয়েটার । ভীষন ভালবাসত সাবিহা মাসুম কে। শত কষ্টের সময় সাবিহা বহুদিন ঘর থেকে চাল ডাল এনে রান্না করে খাইয়েছে ওদের। বাবার হাতে মার ও খেতে হয়েছে শান্ত মায়াবী মেয়েটাকে। সেই কোমল মেয়েটাকে কিভাবে নিজের সেই অনিশ্চিত জীবনের ছেঁড়া সূতোয় বাধবে , ভাবেতই কষ্ট হতো তার।
তাইতো পারেনি বিয়ের আগের রাতে এককাপড়ে যখন মেয়েটা এসে বলল ," চল আমারা পালায় আজকাই বিয়া কইরে ফেলি"। মাসুম বাস্তবার আলোয় ঝলসানো চোখে প্রেম ভালবাসাকে দেখেনি সেদিন। সাবিহাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে বারবার। ফিরে যেতে বলেছে বাবার বাড়ী। সাবিহা অনঢ় ছিল। কাঁদছিল ঘন বর্ষার বৃষ্টি মতো বর্ষনে। জোর করে হাত ধরে টেনে সাবিহাকে দিয়ে এসেছিল বাবার বাড়ী। যেতে চাচ্ছিলনা । বলছিল ওটা নরক। মাসুম অটল ছিল সিদ্ধান্তে। সাবিহার নখের আঁচর আজও আছে ও র হাতে। শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল সাবিহা। অবশেষে সাবিহার বাবার শক্ত হাতের জোরালো চড় দুটোর বিনিময়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিল স্বেচ্ছায় মাসুম। আর কিই বা করার ছিল তার ও সময়? মাসুম জানে ঘরে একপ্রকার বন্দী অবস্থাতেই সারারাত নির্ঘুম কেঁদেছে ওর পরম ভালবাসার নারী- সাবিহা।
সেদিন রাতেও এই দীঘির পাড়ে শুয়েছিল সে। ঘন বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির শব্দে হারাতে চেয়েছিল সাবিহার কান্নার করুন সুর। কিন্তু তাই কি আর হয়? যে শব্দ মনের ভেতর থেকে আসে সে শব্দ কে রুখতে পারে?
পরের দিন দুপুরে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সকালেই সেই বৃষ্টি কাদা ভেজা কাপড়েই একবার মার সাথে দেখা করে চলে গিয়েছিল বড় বাজারে।
দুদিন পর বাড়ী ফিরছিল । চিনতোনা তখনও সাবিহার শ্বশূর বাড়ী। লাল শাড়ীতে ঘোমটা দেয়া সাবিহাকে একনজর দেখেছিল । না , চিনতে ভুল করেনি। ও মুখ তো মনের সবখানেই আঁকা। ভুল কি করে হয়। বাড়ীর পাশ দিয়েই চলে গেছে পথ। সাবিহা দেখেনি অবশ্য সেদিন। মাসুমও নিজেকে আড়াল করেছিল। নিজের দেবদাস চেহারাটা দেখিয়ে সাবিহার সদ্য সুখের স্বচ্ছ জল ঘোলাটে করতে চায়নি। ও বাড়ী পেরিয়ে এসে বসেছিল সূর্য দীঘির উত্তর পাড়ে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল কান্নার জল। হাহাকার করে উঠেছিল মন। লালটুকটুক মেয়েটাতো তার ঘরের উঠানেও হেঁটে বেড়াতে পারতো একই ভাবে!
তারপর অনেক সময় পেরিয়েছে। অবস্থা ফিরেছে। পরিচয় হয়েছে ইতোমধ্যে সাবিহার বরের সাথে। বড় বাজারে কাপড়ের ব্যবসা তার। বেশ ভালো একজন মানুষ বলেই মনে হয়েছে তাকে মাসুমের। মনে অন্তত সেটা ভেবে শান্তির একটুকরো পালক এসে পড়েছিল ।
পথের ধারে বাড়ী হওয়ায় অনেকবারই সাবিহার চেহারটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে মাসুমের । কখনও ওকে দেখার জন্যেই ভীষন ধীর গতিতে হেঁটেছে পাদুখানা ও বাড়ীর সামনে এসে। তবে সাবিহা তাকে দেখেছে খুবই কম। কম কেনো কেবল একবারই দেখেছিল বোধহয়। তাও সেদিন সাথে আরও দুজন মহিলা ছিল। এর পর থেকে সাবিহার চোখও অজান্তে ঘুরেছে পথের দিকে। মাসুমও এড়িয়েছে সাবিহার দৃষ্টি ফেলার সময়।
কিন্তু আজ সাবিহা ঘরে বাইরে দাঁড়িয়েছিল কোন কাজে। একহাত দূরত্ব। দুজনের দৃষ্টির রং বদলে গিয়েছিল ক্ষণিক। অতিচেনা দুজন নর নারী অথবা প্রেমিক প্রেমিকাই অচেনার অভিনয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল ক্ষণিক। মাসুম সর্বশক্তির বাধ তখন দিয়েছিল মনে , চোখে। সাবিহার কোমল প্রাণ পারেনি। কান্নার জল বাধ মানেনি। পারেনি দাঁড়াতে আর। মাসুম চলে গিয়েছিল দ্রুত। এসে বসেছিল সূর্য দীঘীর উত্তর পাশ্বর্ে সেই প্রিয় বকুল গাছ তলে । অস্তির লাগছিল। শূণ্যতা মনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েই চলেছিল। কখন উবু হয়ে শুয়েই পড়েছিল সবুজ ঘাসে খেয়াল করেনি। সোজা হতে গিয়ে হাতের ধাক্কা লেগে কাত হয়ে গেলো পাশ্বর্ে রাখা বার্নিশ করার রঙ আর স্পিরিটের কৌটা। এক দুফোঁটা করে স্পিরিট পড়ছে সবুজ ঘাসে। কৌটাটা হাতে উঠাতেই মনের ভেতর থেকে বিমূর্ত বেদনার এক দৈত্য বলে উঠল, "খা খা , খেয়ে মর।"
ঠিক তখনই একটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ল দীঘির আধাস্বচ্ছ জলে। গোলাকার ঢেই এগিয়ে আসছে মাসুমের কাছে । সেখানে জলে যেন ভেসে উঠল একটি মিষ্টি মেয়ের হাসি মাখা মুখ , একজন বৃদ্ধা মাতার ঝাপসা চোখ। হাত নড়ে উঠল। আধা স্বচ্ছ জলে গোলাকার ঢেউ বেড়ে গেলো হঠাৎ। স্পিরিট আর তেল ভাসছে জলের উপর।
মনে নতুন চেতনা জেগেছে হঠাৎ দীঘির জলের দিকে চেয়ে , ঝেরেছে কৌটা ফেলে মনের ক্ষোভ কিছু। বুঝেছে হঠাৎ দীঘিতো কারও হয়না। বকুল ছায়া কারও সাথে যায়না, তবুও ভালবেসে যায় প্রতি পথিকেরে। মরে গেলে কি আর ভালবাসা যায়। ভালবাসলেই তো বেঁচে থাকতে হয়। আর কষ্ট- সেতো ভালবাসারই সংযোগ সূত্র। ...এভাবেই ভাবতে থাকে আর চোখ মুছতে মুছতে মাসুম একবার তাকায় উপরের দিকে-আকাশে। মাথা নাড়ে। তারপর হাঁটা শুরু করে বাড়ীর পথে আর মনে সাবিহার অস্তিত্ব নতুন করে পেতে থাকে ঝকঝকে ফ্রেমে দৃঢ় স্থায়ীত্ব।
21/01/2007
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ২:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







