somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপকথার গল্প ২: পার্সিফোন

২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পার্সিফোন
গ্রিক রূপকথা
মূল : ফ্লোরা টি. কুক; রূপান্তর ঃ শেখর রায়

গ্রিকরা বিশ্বাস করে যে দেবী ডিমিটার পৃথিবীর গাছপালা, ফলমূল আর নানা রকম ফসলের যত্ন নেন। তিনিই মানুষকে শিখিয়েছেন কিভাবে জমি চষে মাঠে ফসলের বীজ বুনতে হয়। তিনি মানুষকে ফসল কেটে গোলায় তুলতে সাহায্য করেন। তাই তো সবাই তাকে ’পৃথিবীর মা’ বলে স্বীকার করে, মান্য করে আর ভালোবাসে। ডিমিটারের মেয়ে রূপসী পার্সিফোনকেও তারা ভালোবাসে। পার্সিফোন সারাদিন ফুলে ভরা বন-জঙ্গল আর মাঠে খেলা করে বেড়াত। সে যেখানেই যেত পাখিরা ঝাঁক বেঁধে মিষ্টি সুরে গান গাইতে গাইতে তার পিছু নিত। তাই লোকেরা বলত, ’পার্সিফোন যেখানে সেখানেই আনন্দ। সে হাসলেই ফুল ফোটে আর কথা বললেই পাখিরা গান গেয়ে ওঠে।’ ডিমিটার চাইতেন তার আদরের মেয়ে সবসময় তার সাথে সাথেই থাকুক। একদিন পার্সিফোন একা একা সমুদ্রের ধারের একটা বনে গেল। দুহাতে প্রচুর ফুল তুলে নিজের জামার কোঁচরে রাখছিল আর খোঁপায় পরার জন্য সে একটা ফুলের মালা গাঁথছিল। বেশ কিছুটা দূরেই ধবধবে সাদা একটা ফুল নজরে এল তার। এক দৌড়ে কাছে গিয়ে সে দেখল যে ওটা নার্গিস ফুল। ওটা ছিল তার দেখা সবচেয়ে চমৎকার ফুল। একটা ডালেই ছিল শত শত ফুলের গুচ্ছ। সে ওটা তুলতে চেষ্টা করল কিন্তু ডালটা বেশ শক্ত। অনেকবার চেষ্টা করার পর অবশেষে সে ফুলটা তুলতে পারল দেখা গেল যে শিকড়সহ গোটা গাছটাই তার হাতে চলে এসেছে ! নার্গিস ফুলের গাছটা যেখানে ছিল সে জায়গাটা হঠাৎ করেই ফেটে গিয়ে দু’পাশে সরে যেতে লাগল আর ফাটলটা ক্রমেই বড় হতে লাগল। হঠাৎ পার্সিফোন পায়ের তলার মাটি থেকে বজ্রপাতের মতো বিকট এক শব্দ শুনতে পেল। তারপরই দেখা গেল ফাটলটা থেকে চারটি কালো ঘোড়া তার দিকেই আসছে ! ঘোড়াগুলোর পেছনে সোনা আর মূল্যবান মণি-মাণিক্যে সাজানো চমৎকার একটা রথ ছিল। তাতে বসে ছিলেন হেডেস নামের কুচকুচে কালো একজন লোক। অকারের রাজ্য থেকে এসেছে বলে দু’হাত দিয়ে নিজের দুচোখ ঢেকে রেখেছিল সে। বাইরের ঝকঝকে রোদে হেডেস রূপসী পার্সিফোনকে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। রথ চালিয়ে কাছে এসেই সে পার্সিফোনকে দুহাতে ধরে রথের ভেতরে তুলে নিল। পার্সিফোনের হাত থেকে ফুলগুলো মাটিতে পড়ে গেল। সে চেঁচিয়ে উঠল, ’আমার সুন্দর ফুলগুলো মাটিতে পড়ে গেল।’ এরপরই সে হেডেসের ভাবলেষহীন মুখের দিকে তাকাল। ভয় পেয়ে সে দেবতা অ্যাপোলোর সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। অ্যাপোলো তখন মাথার ওপর দিয়ে রথ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সে মা ডিমিটারকে ডাকল। কিন্তু কেউ তার কথা শুনতে পেল না। রথ চালিয়ে হেডেস তার অকারের রাজ্য পাতালের রাজপ্রাসাদে চলে এল। ঘোড়াগুলো যেন প্রায় উড়ে উড়েই যাচ্ছিল। আলো থেকে দূরে চলে এসেই হেডেস পার্সিফোনকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তিনি তাকে নিজের রাজ্যের আশ্চর্য জিনিসের কথা বললেন, তার কত ধন-রত্ন-মণি-মাণিক্য আছে সে কথা বললেন। পার্সিফোন দেখল মৃদু আলোয় পথের পাশে দুধারেই রত্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু এসব সে মোটেই ভুলল না বরং আরো জোরে জোরে কেঁদেই চলল। হেডেস বললেন, ’বিশাল এ সাম্রাজ্যে আমি খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছি। তাই তো তোমাকে আমার রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি আমার রানী হবে। আমার যা কিছু আছে সব তোমায় দেব।’ পার্সিফোন কিন্তু মোটেও রানী হতে চায়নি। সে শুধু তার মা, আলো ঝলমলে দিন আর সুগ িফুলগুলোর প্রতীক্ষায় থাকত। বেশ কিছুক্ষণ পর তারা হেডেসের রাজপ্রাসাদে পৌঁছাল। পার্সিফোনের কাছে জায়গাটা খুব অকার, নিরানন্দ আর ঠাণ্ডা বলে মনে হলো। পার্সিফোনের সমমানে বিরাট এক ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু পার্সিফোন তা ছুঁয়েও দেখেনি। সে জানত যে হেডেসের বাড়িতে কোনো কিছু খেলে আর কোনোদিনই পৃথিবীতে ফেরা যাবে না। হেডেস তাকে খুশি করার অনেক চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হলো না। পার্সিফোনের মন কিছুতেই ভালো হলো না। পার্সিফোন নেই বলে পৃধিবীতেও সবাই অসুখী হয়ে পড়ল। ফুলগাছেরা একের পর এক মাথা নিচু করে রইল আর বলতে লাগল, ’পার্সিফোন চলে গেছে বলে আমরাও আর ফুল ফোটাব না।’ গাছেরা সব পাতা ঝরিয়ে ফেলল। পাখিরা উড়ে চলে গেল আর বলতে লাগল, ’পার্সিফোন চলে গেছে বলে আমরাও আর গান গাইতে পারব না।’ ডিমিটারের অবস্থা এদিকে আরো করুণ। পার্সিফোনের ডাক তিনি শুনেছিলেন। কিন্তু দ্রুত বাড়িতে গিয়ে আর তাকে খুঁজে পাননি। পৃথিবীর সব জায়গাতেই তিনি তার সন্তানকে খুঁজলেন। পথে কারো সাথে দেখা হলেই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ’পার্সিফোন কোথায়? তোমরা কি কেউ তাকে দেখেছো?’ খুব তাড়াতাড়ি ডিমিটার বুড়ি হয়ে গেলেন। কেউ জানল না যে তিনিই সেই মা যে সবসময় মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। দিনরাত সারাদিন তিনি কান্নাকাটি করলেন। চোখের পানি মাটিতে পড়ে কয়েকটি পুকুর হয়ে গেল। পৃথিবীর মাটি এত রুক্ষ হয়ে গেল যে তাতে ঘাসও গজাল না। লোকেরা বৃথাই জমি চাষ করতে আর বীজ বুনতে লাগল। ডিমিটারের সাহায্য ছাড়া এসব তো সম্ভব নয়। কাজ না করতে করতে পৃথিবীর লোকেরা অলস আর নিরানন্দ হয়ে উঠল। বহু জায়গায় খুঁজেও ডিমিটার এমন কোনো মানুষ পেলেন না যে পার্সিফোনের খোঁজ দিতে পারে। তখন তিনি আকাশে মেয়ের খোঁজ করতে লাগলেন। হঠাৎ আকাশের অনেক উঁচুতে উজ্জ্বল এক রথে বসা দেবতা অ্যাপোলোকে দেখতে পেলেন। অত উঁচুতে বসে অ্যাপোলো নিশ্চয়ই নিচের পৃথিবীতে কোথায় কী হচ্ছে তা সবই দেখতে পান। এটা ভেবেই ডিমিটার জিজ্ঞেস করলেন, ’আমার আদরের মেয়েটাকে কে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তা কি আপনি জানেন ?’ অ্যাপোলো বললেন যে হেডেসই পার্সিফোনকে পাতালপুরীতে লুকিয়ে রেখেছে। একথা শুনেই ডিমিটার দেরি না করে দেবতা জিউসের কাছে গেলেন, যার কাছে অসম্ভব বলতে কিছু নেই। ডিমিটার জিউসকে প্রার্থনা জানালেন মেয়েকে উদ্ধার করার জন্য তিনি যেন তাকে হেডেসের কাছে পাঠিয়ে দেন। জিউস হার্মিসকে ডেকে বাতাসের বেগে হেডেসের কাছে ডিমিটারকে পৌঁছে দিতে বললেন । হার্মিস জিউসের কথা মতো ডিমিটারকে নিয়ে চললেন। পথে যেতে যেতে যার সাথেই দেখা হলো তাকেই বললেন, ’আমি পার্সিফোনকে আনতে যাচ্ছি। তাকে স্বাগতম জানাতে তৈরি থেকো কিন্তু !’ পাতালপুরীর নিঃস্তব্ধ রাজ্যে পৌঁছাতে খুব একটা দেরি হলো না তাদের। জিউসের পক্ষ থেকে হেডেসকে তাদের আসার উদ্দেশ্য জানানো হলো। পার্সিফোন নেই বলে পৃথিবীটা কেমন শূন্য হয়ে গেছে আর কিভাবে তার মা মেয়ের জন্য শোকে আকুল হয়ে গেছে তাও তাকে জানানো হলো। তিনি আরো বললেন যে পার্সিফোন না ফেরা পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো ফুল-ফল বা শস্য হবে না। পৃথিবীর মানুষ অনাহারে মারা যাবে। পার্সিফোনও খুব কাঁদল, কারণ সেদিনই ক্ষিদের চোটে সে হেডেসের দেয়া ডালিমের ছয়টি দানা খেয়ে ফেলেছে। তার মনে পড়ে গেল যে হেডেসের রাজ্যে কেউ কিছু খেলে সে আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে না। সবকিছু শুনে হেডেস্‌েরও দয়া হলো। সে বলল, “পার্সিফোন তুমি পৃথিবীতে ফিরে যাও। কিন্তু তোমাকেও এখানকার নিয়ম মানতে হবে। ডালিমের ছয়টি দানা খেয়েছ বলে প্রত্যেক বছর আমার কাছে তুমি ছ’মাস করে থাকবে।” হেডেসের প্রস্তাব মেনে নিয়ে সবাই খুশি মনে পৃথিবীতে ফিরে এল। চারদিক আবার ফুলে ফুলে ভরে গেল। ঝাঁক বেঁধে পাখিরা আবার গান গেয়ে উঠল। নতুন কচি পাতায় সমস্ত গাছ ছেয়ে গেল। সবাই যার যার ভাষায় বলতে লাগল, ’কী মজা ! পার্সিফোন ফিরে এসেছে!’ ডিমিটারও সব দুঃখ-শোক ভুলে গিয়ে হেসে উঠলেন। আদরের মেয়েকে তিনি দু’হাতে জড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন। পার্সিফোন বছরের মাত্র ছয় মাস থাকবে বলে ডিমিটার মেয়েকে চমৎকার গয়নায় সাজিয়ে দিলেন। তখন থেকেই পার্সিফোন যতদিন পৃথিবীতে থাকত ততদিন চারদিক সৌন্দর্য আর আনন্দে ভরে থাকত। আর চলে গেলে, সমস্ত পৃথিবী থাকত ঘুমিয়ে। ডিমিটার পৃথিবীর নদী আর জলাশয়গুলোর ওপর বিছিয়ে দিতেন একটা নরম আর সাদা বরফের চাদরে। (শেষ)

৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×