somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপকথার গল্প ৪: খড়ের বাছুর

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খড়ের বাছুর
কশাক রূপকথা
রূপান্তর : খসরু চৌধুরী


একদা বাস করত এক বুড়ো আর এক বুড়ি। বুড়ো মাঠে পিচ জ্বাল দিত, আর বুড়ি বাড়িতে বসে শনের দড়ি পাকাত। তারা এতই গরিব ছিল যে কখনো টাকা জমাতে পারত না। যা আয় হতো সব খাবার কিনতেই ব্যয় হয়ে যেত। অবশেষে বুড়ির মাথায় এল এক বুদ্ধি।
'শোনো বুড়ো' বলল সে গলা চড়িয়ে। 'আমাকে একটা খড়ের বলদ তৈরি করে দাও। আর বলদটার সারা গায়ে আলকাতরা লেপে দেবে।'

'চুপ, বোকা বুড়ি!' ধমক দিল বুড়ো। 'ওরকম একটা বলদ তৈরি করে কি ঘোড়ার ডিমের কাজ হবে?'
'সে নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না' বলল বুড়ি। 'তুমি শুধু তৈরি করে দাও। ওটা নিয়ে কী করব সেটা আমার ব্যাপার।'
বেচারা বুড়ো তখন আর কী করে? বসে বসে একটা খড়ের বলদ তৈরি করল সে। আর বলদটার গায়ে আচ্ছা করে আলকাতরা লেপে দিল। পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই শনের কাটিম আর খড়ের বলদটাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল বুড়ি। স্তেপে গিয়ে ঘাস খাওয়ার জন্য বলদটাকে ছেড়ে দিল। তারপর একটা টিলার পাশে বসে শন পাকাতে পাকাতে গান ধরল :
"ঘাস খাও খড়ের বাছুর
শন পাকাই আমি
সময় হলেই তুমি হবে
সোনার চেয়ে দামী।"

শন পাকাতে পাকাতে একসময় মাথা ঝুলে পড়ল তার, ঢুলতে লাগল বুড়ি। পেছনের বনের বড় বড় পাইনগাছের ফাঁক দিয়ে এক ভালুক ছুটে বেরিয়ে এসে বলদটাকে বলল, 'কে তুমি? জবাব দাও।'
বলদটা জবাব দিল, 'তিন বছরের এক বাছুর আমি, ভেতরে খড় ঠাসা, আর সারাগায়ে আলকাতরা লেপা।'
'ওই!' আনন্দে ডগোমগো হয়ে ভালুক বলল, ভেতরে খড় ঠাসা আর সারা গায়ে আলকাতরা লেপা, তাই না? তাহলে তোমার থেকে কিছু খড় আর আলকাতরা দাও, আমার এলোমেলো লোমগুলো একটু ঠিকঠাক করে নিই।'
'নাও কিছু' বলল বাছুরটা। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দাঁত দিয়ে আলকাতরা টানতে লাগল ভালুক। টানতে টানতে এক সময় আলকাতরায় তার দাঁত এমনভাবে আটকে গেল, অনেক চেষ্টা করেও বেচারা নিজেকে মুক্ত করতে পারল না। তখন বাছুরটা তাকে টেনে নিয়ে কোথায় চলল -কেউ জানে না।
ঘুম থেকে জেগে বুড়ি দেখল, বাছুর নেই। 'হায় হায়! ঘুমিয়ে কি বোকামিই না করেছি আমি।' কপাল চাপড়াতে লাগল বুড়ি। তবে বাছুরটা বাড়িতেও যেতে পারে।'
কাটিম আর চরকা কাঁধে ফেলে তৎক্ষণাৎ বুড়ি রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশে। বাড়ি ফিরতেই বুড়ি দেখল, বাছুরটা একটা ভালুক ধরে নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে বুড়ি চেঁচাতে লাগল, 'ও বুড়ো, দেখো দেখো, আমাদের বাছুরটা এক মস্ত ভালুক ধরে নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে ওটাকে মেরে ফেলো!'
বুড়ো একলাফে বেরিয়ে এসে ভালুকটাকে তলকুঠুরিতে বেঁধে রাখল।
পরদিন ভোরের আলো ভালোভাবে না ফুটতেই কাটিম আর খড়ের বাছুরটাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ল বুড়ি। স্তেপে গিয়ে ওটাকে চরতে দিয়ে একটা ঢিবির পাশে বসে বুড়ি গান ধরল ঃ

"ঘাস খাও খড়ের বাছুর
শন পাকাই আমি
সময় হলেই তুমি হবে
সোনার চেয়ে দামী।"

শন পাকাতে পাকাতে এক সময় ঢুলতে লাগল বুড়ি। পেছনের বন থেকে পাইনগানের ফাঁক দিয়ে এক ধূসর নেকড়ে ছুটে বেরিয়ে এসে বাছুরটাকে বলল, কে তুমি? জবাব দাও!’
বাছুরটা জবাব দিল, ’তিন বছরের এক বাছুর আমি, ভেতরে খড় ঠাসা, আর সারা গায়ে আলকাতরার রঙ।’
’ওহ! আলকাতরার রঙ, তাই না? তাহলে তোমার কিছু আলকাতরা দাও, আমার গায়ে লাগাব যেন কুকুর কোনোদিন কামড়াতে না পারে।’
’নাও কিছু’, বলল বাছুরটা। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আলকাতরার ওপর দাঁত বসিয়ে দিল নেকড়ে। টানতে টানতে এক সময় তার দাঁত এমন আটকানো আটকালো যে, অনেক চেষ্টা করেও বেচারা আর খুলতে পারল না।
ঘুম থেকে জেগে বুড়ি দেখল বাছুর নেই।
সে বলল, ’আমার বাছুরটা মনে হয় বাড়ি গেছে। যাই, গিয়ে দেখি।’
বাড়ি ফিরে বুড়ি দেখল বাছুরটা একটা নেকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একছুটে ভেতরে গিয়ে বুড়োকে খবর দিল সে, বুড়োও একলাফে বাইরে এসে নেকড়েটাকে বেঁধে রাখল তলকুঠুরিতে।
তৃতীয় দিন ভোরেও বাছুরটাকে স্তেপে চরতে দিয়ে ঢিবির পাশে বসে শন পাকাতে পাকাতে ঢুলতে লাগল বুড়ি। এবার একটা শেয়াল এসে জিজ্ঞেস করল, ’কে তুমি?’
একই জবাব দিল বাছুর। ’তাহলে তোমার কিছু আলকাতরা দাও,’ বলল শেয়াল। ’আমার গায়ে লাগাব, কুকুর কামড়ে দেখ কেমন ছাল তুলে নিয়েছে।’
’নাও কিছু’ বাছুর বলল।
আলকাতরা তুলতে গিয়ে শেয়ালটার দাঁতও গেল আটকে। এবারও বুড়ির চিৎকারে বুড়ো এসে শেয়ালটাকে তলকুঠুরিতে আটকাল। পরদিনও একইভাবে সুন্দর একটা খরগোশ ধরল তারা।
এবার তলকুঠুরির সামনে বেঞ্চ পেতে বসে একটা ছুরিতে ধার দিতে লাগল বুড়ো। তাই দেখে ভালুকটা বলল, ’বুড়ো বাবা, ছুরিতে ধার দিয়ে কী করবে?’
’তোমার ছাল ছাড়াব। আমার একটা চামড়ার জ্যাকেট দরকার। আর বুড়ির দরকার একটা আলখাল্লা।’
’দোহাই বাবা, এই কাজ করো না! তার চেয়ে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে অনেক মধু এনে দেব।’
’বেশ, দেখব তুমি কথা রাখ কি না,’ ভালুকটার বাঁধন খুলে দিল বুড়ো। তারপর আবার বেঞ্চে বসে ছুরি ধার দিতে লাগল সে। এবার নেকড়ে বলল, ’বাবা, ছুরি ধার দিচ্ছ কেন?’
’তোমার ছাল ছাড়াবার জন্য। যা শীত পড়েছে! একটা গরম ক্যাপ না হলে আর চলছে না।’
’দোহাই বাবা, এই কাজটা করো না! তারচেয়ে বরং আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে পুরো একপাল ভেড়া এনে দেব।’
’বেশ, দেখব তোমার কথা ঠিক থাকে কি না,’ নেকড়ের বাঁধন খুলে দিল বুড়ো। তারপর আবার বসে ছুরি ধার দিতে লাগল। এবার নাকের ডগা বের করে শেয়াল বলল, দয়ার সমান গুণ নেই, তা ছুরি ধার দিচ্ছ কেন, বাবা?’
’শেয়ালের চামড়া দিয়ে কলার আর জামাকাপড়ের ডিজাইন হয়। কিন্তু ছাল না ছাড়ালে তো এসব কিছুই করা যাবে না।’
’এই কাজ কোরো না, বাবা! আমি তোমার জন্য অনেক মুরগি আর রাজহাঁস নিয়ে আসব।’
’বেশ, দেখব তোমার কথার দাম,’ শেয়ালটাকে যেতে দিল বুড়ো। এখন রইল কেবল খরগোশ। বুড়োকে ছুরি ধার দিতে দেখে সে বলল, ছুরিতে ধার দিচ্ছ কেন, বাবা?’
’খরগোশের চামড়া যেমন নরম তেমনি গরম, তাই এ দিয়ে খুব ভালো দস্তানা তৈরি হয়।’
’দোহাই বাবা, আমার ছাল ছাড়িয়ো না! আমি তোমাকে এনে দেব সুন্দর সুন্দর ফুলকপি, ছেড়ে দিয়ে দেখ।’
’তখন বুড়ো খরগোশটাকেও ছেড়ে দিল।
তারপর বুড়িকে নিয়ে ঘুমাতে গেল সে। পরদিন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে দরজায় একটা শব্দ শোনা গেল ডা-র-র-র-র!
’বুড়ো, তাড়াতাড়ি ওঠো!’ চিৎকার দিল বুড়ি। দরজায় কে যেন আঁচড়াচ্ছে, দেখ তো গিয়ে।’
’বাইরে যেতেই বুড়ো দেখল, আস্ত একটা মৌচাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভালুক। তার কাছ থেকে মধু নিয়ে এসে শুতে না শুতেই-গ-র-র-র-র!
এবার বাইরে গিয়ে বুড়ো দেখল একপাল ভেড়া নিয়ে এসে হাজির নেকড়ে। তার পেছনেই রাজহাঁস আর মুরগি খেদিয়ে নিয়ে আসছে শেয়াল। সবার শেষে ফুলকপি আর বাঁধাকপি নিয়ে আসছে খরগোশ।
এই দৃশ্য দেখে বুড়ো খুশি, বুড়িও খুশি। ভেড়া আর বলদগুলো বিক্রি করে ধনী হয়ে গেল বুড়ো-বুড়ি।
আর সেই খড়ের বাছুর? রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
(শেষ)

৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×