ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোর মানুষজন এবং তাদের আচার-ব্যবস্থা ও রীতি-নীতির ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিমত বরারবই নেতিবাচক। আমি সেটা নিয়ে খুব বেশী উচ্চবাচ্য না করলেও বিষয়টিকে মূলত আত্ম-সমালোচনার অংশ হিসেবেই দেখি। এটাকে অনেকেই আমার ব্যক্তিগত নেতিবাচক দিক মনে করলেও আমি সেটাকে আমি ইতিবাচক হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। বিষয়টিকে "সেল্ফ হেটিং" হিসেবে মনে করার বিন্দুমাত্র কোন অবকাশ আছে বলে আমার মনে হয় না। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের নিজের দেশের ছোট্ট সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে আমেরিকার মতো বিশাল দেশে বসবাসকারী একাধিক দেশ ও জাতির মানুষের সাথে ভাব ও তথ্যের আদান-প্রদানের পর এই নেতিবাচক ধারনাগুলোর ভিত আরো অনেক বেশী গভীর ও বদ্ধমূল হয়েছে। নিজেদের মানসিক এই দৈন্যতা বোঝার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর মানুষের সাথে আমাদের তথা উপমহাদেশের মানুষগুলোর ভাবের আরো বেশী আদান-প্রদান জরুরী বলে আমার মনে হয়।
সকালবেলা পত্রিকার পাতা পড়তে বসেই চোখে পড়লাে ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যে চলমান শান্তিনিকেতনের জমি নিয়ে দ্বন্দের বিষয়টি। আমি ভারতীয় নই, এটা নিয়ে আমার মাথা না ঘামালেও চলতো কিন্তু পুরো বিষয়টি আমাকে অন্য একটি বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছে। আর সেটা হলো নোবেল বিজীয় হোন আর যেই হোন না কেন, উপমহাদেশে সরকারের সমালোচনা করলে তাকে ঝামেলার মুখোমুখি হতে হবেই। অর্মত্য সেনের সমস্যা হলো তিনি ভারতীয় বর্তমান ক্ষমাতসীন রাজনৈতিক দল এবং তাদের কর্মকাণ্ডের একজন সমালোচক। তিনি ১৯৯৮ সালে নোবেল এবং ১৯৯৯ সালে ভারত রত্ম সম্মানে ভূষিত হলেও তাকে নিয়ে দীর্ঘদিন ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় কোন বক্তব্যের জন্য সমালোচনা বা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নি। তবে এখন হতে হচ্ছে নানা কারনে।
কেউ যখন কারো কোন গঠনমূলক সমালোচনা করেন তখন বিবাদী কোন সদুত্তর দিতে না পারলে শুরু হয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা আইনগত ঝামেলা। এটা মূলত বাকস্বাধীনতা রূদ্ধ করার এক ধরনের রাজনৈতিক হাতিয়ার। বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইঊনুসকে নিয়েও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খেলা চলেছে এবং চলছে। যে কারোর বিরুদ্ধে কোন বিষয়ে অভিযোগ করা যেতেই পারে, সেটা যেই হোক না কেন। তবে প্রশ্ন হলো, দেশের গুণীজন তথা আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত লোকজনকে নিয়ে এই টানা-হেচড়ার বিষয়গুলো মূলত কেন ঘুরে-ফিরে এই উপমহাদেশেই বারবার চোখে পড়ে? ভারত এবং বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলোতেই কেন এই ধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। ইউরোপ-আমেরিকায় হাজারখানেক না হলেও কয়েক শতাধিক নোবেল বিজয়ী বা গুণী ব্যক্তি রয়েছেন যাদের নিয়ে এ ধরনের ঘটনা তেমন একটা চোখে পড়ে না, অন্তত উল্লেখ করার মতো কোন ঘটনা আমার দৃষ্টিগোচর হয় নি।
পৃথিবীতে বর্তমান সময়ের অন্যতম একজন গুণী ব্যক্তি এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হলেন নোয়াম চমস্কি। যিনি বিভিন্ন সময়ে আমেরিকার সরকার তথা সরকারের বিভিন্ন পররাষ্ট্র নীতির ঘোর বিরোধী ও সমালোচক হলেও তাকে কখনো এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমি নোয়াম চমস্কিকে অনুসরণ করছি কয়েক দশক ধরে, তার অনেক লেখায় সরাসরি সরকারি দল তথা প্রশাসনের সরাসরি বিরোধীতা করা হয়েছে। তিনি নিজে ইহুদী হয়েও ইসরায়েল ও দেশটির দ্বারা প্যালেস্টাইন জনগণের উপর নির্যাতনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ করেছেন। তাকে কখনো এই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
সমস্যার মূল হলো কোন একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষগুলো, তাদের রীতি-নীতি ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত জ্ঞান বলে, একুশ শতকে উন্নত বিশ্বে মূলত দাস প্রথা উঠে গেলেও পৃথিবীতে যে অঞ্চলগুলোতে এখনো কম-বেশী মাত্রার দাস প্রথা প্রচলিত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আরব, আফ্রিকা এবং এশিয়া অন্যতম। মানুষের প্রতি মানুষের ভেদাভেদ এবং বৈষম্যের বিষয়গুলো এখনো এইসব অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের শারীরিক আকার বা গঠন, গায়ের রং, লিঙ্গ, জাত-পাত, ধর্ম নিয়ে বৈষম্য করার অনেক মৌলিক উপাদান বা উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। ইউরোপ আমেরিকাও একটা সময় এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে কম-বেশী হয়তো এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। তবে তারা এগিয়ে যাচ্ছে এবং পরিবর্তনও এসেছে।
আমেরিকায় ওবামা, কামালা হ্যরিস, ইউরোপে সুনাক, হামজা ইউসুফ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার পর অন্তত একটা বিষয় সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে যে, ঐ অঞ্চলে সংখ্যালঘু কমিউনিটির সদস্য হয়েও মানুষ হিসেবে নিজ যোগ্যতায় এটা অর্জন করা সম্ভব। যারা এক সময় এই উপমহাদেশ তথা আফ্রিকার লোকজনকে চাকর-বাকর হিসেবে দেখেছে বা শাসন-শোষণ করেছে আজ তাদেরই দেশে গিয়ে তাদেরই পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার অনন্য নজির ইতিহাসে বিরল, এইসব চাঞ্চল্যকর ঘটনার স্বাক্ষী আমরা অনেকেই। কিন্তু শোষিত হওয়া ঐ দেশগুলোতে হচ্ছে ঠিক তার উল্টোটা। আমরা এখন স্বজাতীর লোকজনের কাছে চাকর-বাকর হয়ে গিয়েছি, তারাও আমাদেরকে প্রভু বা মণিবের দৃষ্টিতে দেখছে। পুরো বিষয়টিকে আপনারা কিভাবে দেখছেন আমি জানি না, তবে আমার কাছে এটা মূলত আমাদের নিচু শ্রেনীর মানসিকতা বা জাতির পরিচায়ক বলে মনে হয়েছে। সময় এগিয়ে গেলেও আমরা এখনো অসভ্য, র্নিলজ্জ্ব আর বর্বর রয়ে গেছি।
আমার সোনার বাংলায় এখন একমুঠো ভাত চুরির অপরাধে একটা ছোট্ট বাচ্চাকেও বেঁধে পেটানো হয় আর দেশের পশ্চাতদেশে লাথি মারা লোকজনের পদ লেহণ করার নজির অজস্র। তিন পুরুষ আগেও যাদের পরিবারের নাম-গন্ধও ছিলোনা তারা এখন শাসক-শোষকের ভূমিকায়। দেশকে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে, পারিবারিক রাজতন্ত্র চালানোর নজির খোঁজার জন্য ইতিহাস পড়ার দরকার নেই চোখ-কান খোলা থাকাই যথেষ্ট। খুব সম্ভবত আমরা জাতি হিসেবে পেছনের দিকে ফিরে যাচ্ছি।
গুণের সমাদর এই উপমহাদেশে হয় নি, হচ্ছে না আর হওয়ার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ, অন্তত যতদিন এই অঞ্চলের মানুষগুলো তাদের নিজ নিজ মানসিক দাসত্ব থেকে বের হয়ে না আসতে পারবে ততদিন। দু'পেয়ে প্রাণী হয়ে জন্মানোর মাঝে নিজের কোন কৃতিত্ব আছে বলে আমি মনে করি না তবে "মানুষ" হতে হলে যে পুরো একটা জীবন সাধনার প্রয়োজন হয় সেটা বোঝা অতীব জরুরী। তা না হলে দু'পেয়ে প্রাণী থেকে সবার হয়তো মানুষ হওয়া হয়ে উঠবে না, অন্তত জাতিগতভাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




