somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একাত্তরের গণহত্যা । শ্রীরামসি, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ ।

২৯ শে মার্চ, ২০১৩ ভোর ৬:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত শ্রীরামসি গ্রাম । এর মধ্যস্থলে বাজার, উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডাক ঘর, তহসিল অফিস, মাদ্রাসা প্রভৃতি বিদ্যমান থাকায় বহুসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী শিক্ষক ব্যবসায়ীর বসবাস এইগ্রামে । ভৌগোলিক দিক দিয়েও গ্রামটির গুরুত্ব অত্যধিক । পূর্বদিকে বিশ্বনাথ থেকে পশ্চিম দিকে জগ্ননাথপুর পর্যন্ত যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে শ্রীরামসি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট একটি খাল । একাত্তরের ২৫ মার্চের পর জগন্নাথপুরের পূর্বাঞ্চল তথা শাহারপাড়া, মিরপুর, শ্রীরামসি গ্রাম অনেকদিন পর্যন্ত মুক্ত ছিল । এখানকার ব্রিটেন প্রবাসী বিপুল সংখ্যক বাঙালি হাজার হাজার পাউন্ড চাঁদা সংগ্রহ করে মুজিবনগরস্থ অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন সেই সময় ।

পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা সামরিক অভিযানের সূচনা থেকেই নীল নকশা আঁকছিল জগ্ননাথপুরের পূর্বাঞ্চল আক্রমণের । সেই নকশা অনুযায়ী ২৯ আগস্ট শ্রীরামসি গ্রামে আসে দুজন রাজাকার । বাড়ি তাদের চিলাউরা গ্রামে ।তাদের একজনের নাম মগনাম উল্লা অন্যজনের নাম আব্দুল ওয়াতির । এসেই তারা গ্রামের যুবকদের রাজাকার বাহিনীতে যোগদানের আহ্বান জানায় । গ্রামের মুক্তিপাগল বাঙালি সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেই দুই রাজাকারকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয় । বিতাড়িত হয়ে যাওয়ার সময় তারা গ্রামবাসীকে এর পরিণাম ভাল হবে না বলে শাসিয়ে যায় । গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক । পাকসেনাদের সম্ভাব্য আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে চলে যায় অনেক মানুষ । কিন্তু এত অল্প সময়ে স্ত্রী , পুত্র , পরিজন নিয়ে সবাইকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না । অধিকাংশ লোকই রয়ে যায় গ্রামে।

৩১ আগস্ট সকালে গ্রামের ভেতর খাল দিয়ে পাকিসেনাদের বেশ কয়েকটি নৌকা এসে ভিড়ে শ্রীরামসি গ্রামে । সাথে বেশ কয়েকজন রাজাকার । সকাল দশটার দিকে তারা পুরো গ্রাম ঘেরাও করে ফেলে ।

শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয়



শান্তি কমিটি গঠনের নাম করে গ্রামবাসীকে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানায় । যারা তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি তাদেরও অস্ত্রের মুখে ধরে এনে জড়ো করা হয় হাইস্কুলে । দুইটি দলে ভাগ করা হয় তাদের । একটি দলে গ্রামের সব যুবক এবং অন্য দলে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ও প্রবীণ । পিছন দিক থেকে হাত বেধে তাদের ঢুকানো হয় স্কুল ঘরের দুটি কক্ষে । প্রবীণদের কাছে জানতে চায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের নাম, তাদের কাছ থেকে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে হায়েনার দল আর হিংস্র রুপ ধারন করে । তারা গিয়ে ঢুকে দ্বিতীয় কক্ষে, পিছন দিকে হাত বাধা যুবকদের তারা আর দুইটি দলে ভাগ করে একটি দলকে নিয়ে যাওয়া হয় স্কুলের পাশে রসুলপুর পাড়ার মছরম উল্লার বাড়িতে । তাদের লাইন বেধে দাড় করানো হয় । কিছুক্ষনের মধ্যেই যে তারা স্বাধীনতার বলি হতে যাচ্ছেন তা বুঝতে বাকি রইল না এই নিরহ অসহায় লোকদের । জীবন বাচাতে শেষ চেষ্টা হিসাবে ছয়জন নিজেদের মুসলিম লীগের কর্মী বলে পরিচয় দিয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন । সৌভাগ্যক্রমে পাকবাহিনীর সাথে থাকা দালালদের একজন ছিল তাদের আত্মীয় । সেই দালালের সহযোগীতায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ ভিক্ষা পান তারা, সমস্ত বাজার তারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিবেন এই শর্তে । তবে মুক্তি পাওয়ার পর শর্ত পুরন না করেই সুযোগ বুঝে পালিয়ে যান তারা । অতি কষ্টে বন্ধনমুক্ত হয়ে পালিয়ে বাঁচেন আর কয়েকজন তারা হলেন জওয়াহিদ চৌধুরী , হুসিয়ার আলী , ডা আবদুল লতিফ প্রমুখ । বাকিরা পাকসেনাদের গুলিতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে ।

দ্বিতীয় দলটিকে নিয়ে যাওয়া হয় নজির মিয়ার পুকুর পাড়ে । সবাইকে লাইনে দাড় করিয়ে চালানো হয় গুলি । স্বাধীনতার জন্য শহীদের খাতায় নাম লেখালেন আর কয়েকজন, তাদের নিথর দেহ পড়ে রইল পুকুর পাড়ে । উভয় গ্রুপের গুলিবিদ্ধ অবস্তায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে যারা বেচে গিয়েছিলেন, তারা হলেন ছফিল উদ্দিন ( দীঘির পাড় ), আবদুল লতিফ ( ডাকঘরের নৈশ প্রহরী ), তপন চক্রবর্তী ( নিহত তহসিলদারের পুত্র ) প্রমুখ ।

গ্রামের দুটি স্থানে গণহত্যা চালানোর পর পাক হায়েনারা ঢুকে পড়ে গ্রাম ও বাজারে, ইচ্ছামত লুটপাটের পর গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি এবং পুরো বাজার তারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় । সারাদিন নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে ফিরতি পথে শ্রীরামসি গ্রামের পশ্চিমের হাওর থেকে একটি নৌকা থেকে একজন যুবতী মহিলাকে তুলে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী । এই হতভাগ্য মহিলার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা পরে আর জানা যায়নি ।

সেদিন গ্রামে আর কোন লোক থাকেনি । পরদিন ও ভঁয়ে গ্রামে ফিরেনি কেউ । শহীদদের লাশ গুলি পড়ে থাকে একই জায়গায় । দুদিন পর আশপাশের কিছু লোক সাহস সঞ্চয় করে আসে শ্রীরামসি গ্রামে । তারা শনাক্ত করে কিছু লাশ । ডেকে আনে তাদের আত্মীয় স্বজনদের । তাদের সহযোগীতায় লাশ গুলি দাফন করা হয় দীঘিরপাড় নামের গোরস্তানে ।

সেদিন কতজন গ্রামবাসী শহীদ হয়েছিলেন তার সঠিক হিসাব কারো জানা নেই । যাদের লাশ শনাক্ত করা হয়েছিল তারা হলেন – ছাদ উদ্দিন আহমদ ( ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয় ), মাওলানা আবদুল হাই ( হেড মৌলবী , শ্রীরামসি উচ্চ বিদ্যালয় ), এহিয়া চৌধুরী ( তহসিলদার ), সত্যেন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তী ( তহসিলদার ), সৈয়দ আশরাফ হোসেন ( পোষ্ট মাস্টার ), শফিকুর রহমান, ফিরোজ মিয়া, সুনু মিয়া, আলা মিয়া, সমুজ মিয়া, নজীর মিয়া, আবদুল মান্নান ( হবিব পুর ), ওয়ারিছ মিয়া, মানিক মিয়া, আবদুল জলিল ( সাত হাল ), ছবির মিয়া, মরম উল্লা, মমতাজ উল্লা, ছওয়াব উল্লা, রইছ উল্লা, আবদুল মজিদ, আবদুল লতিফ ( সাত হাল ), এখলাছ মিয়া, মোক্তার মিয়া, আবদুল বারি ( ইউপি সদস্য ), উছমত উল্লা, তৈয়ব উল্লা, বাক্কু মিয়া, মছদ্দর আলী, তফাজ্জল আলী, আছাব মিয়া, ছমির আলী, রওয়াব আলী, জহুর আলী, আবদুল হান্নান প্রমুখ । বাকি নামগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি । তবে সেদিন মুসলমান নামধারী নরপশুদের হাতে ১০০ জনেরও উপর শহীদ হয়েছিলেন বলে গ্রামবাসীর ধারনা । স্বাধীনতার পর পাকবাহিনীর সাথে দালালির অভিযোগে আবদুল খালিক ও ময়না মিয়া নামে দুজন রাজাকার গ্রেফতার হলেও পরে তারা ছাড়া পায় ।

শহীদদের স্মৃতির উদ্দ্যেশে নির্মিত শ্রীরামসি গ্রামের ভিতর স্মৃতি সৌধ



তথ্য সুত্রঃ- সিলেটে গণহত্যা, তাজুল মোহাম্মদ ।
বধ্যভূমির গদ্য, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ ভোর ৫:৩২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি একটি বেঈমান আর গাদ্দারদের দল।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

‘বিএনপি ৭৫এর যোদ্ধাদের রক্ষা করেনি, ২৪ এর যোদ্ধাদেরও রক্ষা করবে না।’ ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×