
বিল্ডিং টা আঠারো তলা।
একেবারে নতুন বিল্ডিং। এখনও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। যে পরিমান কাজ বাকি আছে, সে কাজ শেষ করতেও কমপক্ষে ছয় মাস তো লাগবেই। সতের তলার ফ্লোরটা তড়িঘড়ি করে ঠিক করা হয়েছে। সেখানে একটা কর্পোরেট অফিস। এই অফিসেই চাকরি করে মিরাজ। সে সবে মাত্র (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) অনার্সে ভরতি হয়েছে জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে। চাকরি পেয়েছে পরিচিত এক আত্মীয়'র মাধ্যমে। তার বস খুব ভালো মানুষ। সে বলেছে মন দিয়ে লেখা পড়া করো। টাকা পয়সার দরকার হলে চাইবে, কোনো লজ্জা করবে না। অফিসে কাজ করতে গিয়ে লেখা পড়ার যেন ক্ষতি না হয়। মিরাজ গ্রামের ছেলে। কষ্ট করে'ই বড় হয়েছে। লেখা-পড়া ও চাকরি দু'টাই বেশ সুন্দর চালাচ্ছে। লেখাপড়ায় সে খুব ভালো।
আজ বৃহস্পতিবার।
শুক্র-শনি দুইদিন ছুটি। তার উপর রবিবারও বড় দিনের সরকারি ছুটি। মোট তিন দিন অফিস বন্ধ। চাকরিজীবিদের জন্য একটানা তিনদিন ছুটি পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার। মিরাজ ঠিক করে ফেলেছে সে গ্রামে যাবে। অনেকদিন মায়ের কাছে যাওয়া হয় না। সকাল থেকেই মিরাজের মনটা বেশ ভালো। মিরাজের অফিসের প্রধান সমস্যা হলো এখনও লিফট লাগানো হয়নি। প্রতিদিন সতের তলা হেটে উপরে উঠতে হয়। আসলে চাকরি করলে অনেক কষ্ট মেনে নিয়েই চাকরি করতে হয়। সিড়ি দিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট। সিড়ি এখনও টাইলস করা হয় নি। এমনকি এখনও সিড়িতে রেলিং পর্যন্ত লাগানো হয়নি। তবে কোনো রকমে একবার উঠতে পারলে তারপর শান্তি আর শান্তি। পুরো অফিস সেন্টাল এসি। সবচেয়ে বড় কথা এগারোটা বাজে একবার নাস্তা দেয় আবার বিকেলে একবার নাস্তা দেয়। নাস্তার মান বেশ ভালো। কোনোদিন সমুচা, কেক, কলা অথবা তিন চার রকমের ফল। চা কফির ব্যবস্থা আছে। মন চাইলেই ছাদে উঠে সিগারেট খাওয়া যায়।
এখন আমি মুল গল্পে প্রবেশ করবো।
ছয়টায় অফিস ছুটি হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার বলে সবাই একটু তাড়াতাড়ি বের হয়ে যায়। মিরাজও বের হতো। কিন্তু তার ওয়াশ রুমে যাওয়া জরুরী হয়ে পড়লো। ওয়াশ রুমে গিয়ে সে আটকা পড়ে গেল। অফিসের সবাই বের হয়ে গেছে। এমনকি পিয়ন পর্যন্ত সব দরজা-জানালা বন্ধ করে, মেইন সুইচ বন্ধ করে চলে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মিরাজ টয়লেটের দরজা খুলে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে বের হয়ে দেখে ওয়াশ রুমের মেইন দরজা পর্যন্ত তালা দেওয়া। তার সাথে নেই মোবাইল। মোবাইল আছে তার ডেস্কের ড্রয়ারে। ভয়াবহ অন্ধকার। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে এখন কি করবে? চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। এমনই দরজা তার মতো চারটা মিরাজও ভাঙতে পারবে না। তার খুব কান্না পাচ্ছে। সে সত্যি সত্যি বাচ্চা ছেলের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেদে উঠলো। পুরো বিল্ডিং এ সে একা। এ কথা ভাবতেই তার বুকের মধ্যে ভয় মোচড় দিয়ে উঠলো।
রাত কয়টা বাজে মিরাজ জানে না।
চারিদিক খুব বেশি শুনশান। তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। ক্ষুধার চেয়ে বেশি লাগছে ভয়। সোমবার অফিসে লোকজন আসবে। অর্থ্যাত তিনদিন, তিন রাত তার এখানে এই অন্ধকারে থাকতে হবে। মিরাজ মনে মনে নিজেকে শান্ত্বনা দিল- যেভাবেই হোক বেঁচে থাকতে হবে। সে আরেকটু গুছিয়ে উঠতে পারলেই মাকে ঢাকা নিয়ে আসবে। ক্ষুধাটা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলেছে। সব রকম অবস্থায় ক্ষুধা ঠিকই জানান দেয়। ক্ষুধা থেকে মিরাজ বুঝতে পারলো কমপক্ষে এখন রাত বারোটার বেশি বাজে। যদি সে এই ওয়াশরুমে আটকা না পরতো তাহলে সে এতক্ষনে নরসিংদী তার গ্রামের বাড়িতে থাকতো। তার মা অপেক্ষায় আছে ছেলে ফিরবে। মিরাজ সকালবেলায়'ই ফোনে মাকে জানিয়ে দিয়েছিল। মা জানতে চাইছিলেন কি খাবি? কি রান্না করবো? মিরাজ বলেছিল- যা খুশি রান্না করো। তোমার কাছে যাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। বড় আনন্দের।
গল্প শেষের খুব কাছে।
সোমবার অফিসে লোকজন আসলো। মিরাজ বেঁচে ছিল। তাকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল। অফিসের বস তার জন্য যথেষ্ট মমতা দেখিয়েছেন। হাসপাতালের সমস্ত বিল তিনি দিয়েছেন। এবং এরপর অফিসের ওয়াশরুমে মোবাইল নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক করেছেন। প্রায় নব্বই ঘন্টা সে ঘুটঘুটে অন্ধকার ওয়াশরুমে বন্ধী ছিল। গল্প এখানেই শেষ। আসলে এটা গল্প নয় সত্য ঘটনা।
(শিল্প মন্ত্রনালয়ের অধীনে একটা কোর্স করতে গিয়ে মিরাজের সাথে আমার পরিচয় হয়। শেষে গভীর বন্ধুত্ব। মিরাজের কাছে আমি এই ঘটনা জানতে পারি। নব্বই ঘন্টা অন্ধকারে থাকা মিরাজের সাথে অনেক কিছুই ঘটেছে। যা কেউ বিশ্বাস করবে না। হয়তো কেউ কেউ বলবেন এটা হেলুসিনেশন। এই সমস্ত ঘটনা মিরাজ আমাকে ছাড়া আর কাউকেই বলেনি।
প্রথম চব্বিশ ঘন্টা মিরাজকে কে বা কারা খুব ভয় দেখিয়েছে। অদ্ভুত সব শব্দ চারিদিকে ক্রমাগত হচ্ছিল। বিকট গলায় কারা যেন মিরাজকে ডাকছিল। দ্বিতীয় দিন মিরাজকে কারা যেন নিয়ে যেতে আসছিল। একদল মিরাজকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে, আরেক দল মিরাজকে নিতে বাধা দিচ্ছিল। একসময় তাদের সাথে মনে হলো যেন যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। তৃতীয় দিন মিরাজ কোনো ভয় পায়নি। কে বা কারা যেন মিরাজকে বলেছে- তুমি ভয় পেও না। তোমার কোনো ভয় নেই। আমরা তোমার সাথে আছি। থাকবো।)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ৯:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





