
ভদ্রমহিলা আমাদের পাশের বাসায় থাকেন।
উনার দুই সন্তান। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। বাচ্চাদের চার পাঁচ বছর বয়স। উনি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। চাকরির শুরুতে উনার পোষ্টিং হয়েছিলো নাটোর। উনি এক নেতা ধরে এবং কিছু টাকাপয়সা খরচ করে ঢাকায় স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করেন। উনার বাসার কাছেই প্রাইমারী স্কুল। উনি সেখানে বাচ্চাদের পড়ান। আমার সাথে উনার মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হয়। কথা হয়। একদিন উনি বললেন, উনার ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করাবেন। কিন্তু ভালো স্কুল খুঁজে পাচ্ছেন না। আমি বললাম, আপনি যে স্কুলে পড়ান সেই স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দেন। এই কথা বলা মাত্র ভদ্রমহিলা আমার উপর রেগে গেলেন। খুব বেশী রেগে গেলেন। বললেন, আমার সন্তানদের এই ফালতু স্কুলে পড়াবো? আমার বাচ্চাদের!
ভদ্রমহিলা পারলে রাস্তার মধ্যে আমার গলা টিপে ধরেন।
আমি বললাম, আপনি যে স্কুলে বাচ্চাদের পড়ান সেই স্কুল কি খারাপ? ভদ্রমহিলা বললেন, ঐ স্কুলে সব ফকিন্নির বাচ্চারা পড়ে। আমার বাচ্চা কি ফকিন্নী? রিকশাচালকের ছেমেয়েরা ঐ স্কুলে পড়ে। বাসার কাজের বুয়ার ছেলেমেয়েরা ঐ স্কুলে পোড়ে। আমি কেন ওই স্কুলে আমার ছেলেমেয়েদের পড়াবো। আমি বললাম, তার মানে আমাদের দেশের প্রাইমারী স্কুল গুলো খারাপ! লেখাপড়ার মান খারাপ! তাহলে নিশ্চয়ই স্কুলের টিচাররাও খারাপ! ভদ্রমহিলা আরো রেগে গেলেন। বললেন, আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছি। বারো বছর পার করে ফেলেছি। আরো বারো বছর পার করলে আমি কমপক্ষে চল্লিশ লাখ টাকা পাবো। আমি বললাম, যে প্রাইমারী স্কুলে বাচ্চাদের পড়িয়ে আপনি এত টাকা পাবেন, আবার প্রতিমাসের বেতন তো আছেই। তাহলে দরিদ্র বাবা মায়ের সন্তানদের একটু ভালো শিক্ষা দিন। তারা তো এদেশেরই সন্তান। তারাই তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
ভদ্রমহিলার মানসিকতা অতি নীচু মানের।
সমাজে কিছু আছে বদমাইশ টাইপ মহিলা এরকম। যদিও উনি শিক্ষিকা। উনাকে দিয়েই প্রাইমারী স্কুলের অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকার মানসিকতা আঁচ করতে পারা যায়। আমি নিজেকে দেখেছি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকরা সঠিকভাবে শিক্ষা দেন না। আসলে তারা জানেনই না শিশুদের কিভাবে শিক্ষা দিতে হয়। প্রতি বছর প্রাইমারী স্কুল থেকেই বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে এর কারন মানহীন শিক্ষক। শিক্ষকরা শিক্ষা দানে দক্ষ নন। তারা জানেনই না শিশুদের কিভাবে শিক্ষা দিতে হয়। কিভাবে পড়ালেখা করাতে হয়। আজকে দেশের এই পরিস্থির জন্য দায়ী মানহীন শিক্ষক। যদি শিক্ষকেরা ছাত্রছাত্রীদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারতো তাহলে দেশের অর্ধেক অপরাধ'ই কমে যেত। সরকার প্রতিটা গ্রামে একটা করে প্রাইমারী স্কুলে দিলেও লাভ নেই। যদি ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারে। আমাদের দেশে শিক্ষকের অভাব নাই। কিন্তু ভালো শিক্ষক নেই।
পড়ালেখা হলো দুনিয়াতে সবচেয়ে আনন্দের একটা বিষয়।
রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন শিশুদের কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে। শান্তিনিকেতন থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। শিক্ষাগ্রহন করতে আনন্দের সাথে। অথচ প্রাইমারী স্কুলের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখাকে ভয় পায়। তারা স্কুল ফাঁকি দেয়। নানান তালবাহনায় স্কুলে যেতে চায় না। এর কারন প্রামারী স্কুলের শিক্ষকরা শিশুদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ জাগাতে পারেন নি। শিক্ষকেরা এমন পরিস্থিতি করে যে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলকে ভয় পায়। পড়ালেখাকে ভয় পায়। শেষমেষ ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাপের সাথে জমিতে কাজ করে, চায়ের দোকানে কাজ, বিস্কুটের কারখানায় কাজ করে। এজন্য দায়ী শিক্ষকরা। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকরা কেন তাদের ছেলেমেয়েদের অন্য স্কুলে ভর্তি করে? নিশ্চয়ই প্রাইমারী স্কুল খারাপ। যদিও প্রাইমারী স্কুল খারাপ হয় তাহলে সেখানে তারা শিক্ষক হোন কেন? বর্তমানে যারা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক তাদের অনেক কিছু শেখার আছে, জানার আছে। তাদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং এর প্রয়োজন আছে।
আমার একজন প্রিয় শিক্ষক আছেন।
তার নাম প্রফেসর আলতাফ হোসেন। স্যারের বাড়ী রাজশাহী। কিন্তু উনি ফরিদপুরে জীবনটা পার করে দিলেন। ফরিদপুরের সব ছাত্রছাত্রীরা তাকে চিনেন। প্রচন্ড ভালোবাসেন। আলতাফ স্যারের একজন অসাধারন মানুষ। উনার মতো শিক্ষক আমি খুব বেশি দেখি নি। স্যার মাঝে মাঝে ঢাকা আসেন। ঢাকা এলেই স্যারের সাথে আমি দেখা করি। স্যারের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। দারুন হাসি খুশি মানুষ। প্রচন্ড প্রানবন্ত একজন মানুষ। স্যার ঢাকা এলে মাঝে মাঝে আমার বাসায় আসেন। কয়েকদিন থাকেন। অবশ্য স্যারকে আমি জোর করেই রেখে দেই। আলতাফ স্যার অসংখ্য ভালো বইয়ের সন্ধান আমাকে দিয়েছেন। তিনি নিজে আমাকে অনেক বই কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সামুতে আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ১০০ পর্বের ধারাবাহিক লেখা লিখেছি। এই আলতাফ স্যারই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। স্যারের সাথে যতক্ষন থাকি মনে হয়- জীবনটা আনন্দময়। জীবনটা অনেক সুন্দর।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




