somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অণুজীব শিকারিদের নতুন প্রজন্ম

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ রাত ৮:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জুন মাসের মঙ্গলবারের এক সন্ধ্যা। হিউস্টন এর এক রেস্তোরাঁয় পাঁচ জন ডাক্তার চিন্তিত মুখে বসে আছেন। জার্মানিতে একটি খাদ্যবাহিত জীবাণুর আক্রমণে বেশ কিছু মানুষ জীবন হারিয়েছে আর শত শত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তারদের চিন্তার বিষয় কি করবেন তাঁরা যদি এই ঘটনা হিউস্টনে ও ঘটে? কোন রোগী যদি এরকম অজানা জীবাণুর ইনফেকশন নিয়ে আসে আর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, কি করার আছে তাঁদের!

সেই রাতে ঐ ডাক্তারদের একজন, জেমস এম মুসের যিনি মেথডিস্ট হাসপাতাল এর প্যাথলজি এবং জেনমিক মেডিসিন এর চেয়ারম্যান, খবর পেলেন তাঁর এক রোগী এমন একটা রোগে মারা গেছে যার লক্ষণ অনেকটা অ্যান্থ্রাক্স এর মতো। কি করবেন তিনি! তিনি ভাবলেন এটা কি সত্যি অ্যান্থ্রাক্স ছিল? যদি অ্যান্থ্রাক্স হয় তবে কি জীবাণুটি জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ার্ড। কতটা ভয়ানক হতে পারে সে? ডাক্তার মুসের অনুধাবন করলেন উত্তর আসতে পারে যদি শুধুমাত্র ঐ প্রাণঘাতীর সম্পূর্ণ জিনের বৈশিষ্ট্য জানা যায়। আর এটাই ছিল অণুজীববিজ্ঞানের নতুন দিনের সূচনা। ডাক্তার মুসের আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা আণবিক রোগ তত্তের একটা দারুন দিক নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আঁটলেন- জিন সিকোয়েন্সিং।

সর্বপ্রথম ব্যাকটেরিয়ার জিন সিকোয়েন্সিং করা হয় ১৯৯৫ সালে, সময় লেগেছিল ১৩ মাস। আর এখনকার বিজ্ঞানীরা একটি ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ জিন সিকোয়েন্স করতে সময় নেন কয়েক দিন এবং কখনো কখনো একদিন মাত্র। খরচ মাত্র হাজার ডলার যেটা প্রথম দিকে ছিল মিলিয়ন ডলার। গত ১৭ বছরে ১৫৪৫ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার জিনের ইতিহাস জানা গেছে এবং আরও ৪৮০০ প্রজাতির উপর কাজ চলছে। জানা গেছে ২৬৭৫ প্রজাতির ভাইরাসের জিন এর রহস্য যাদের অধিকাংশ হল ফ্লু আর এইডস এর ভাইরাস। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল এর অধ্যাপক ডঃ ম্যাথু বলেন “এটা অণুজীববিজ্ঞানের চেহারা পাল্টে দিয়েছে”। “রোগের মানচিত্র” নাম দিয়ে অণুজীববিজ্ঞানীরা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন। তাঁরা রোগীর ক্লিনিক্যাল নমুনা সংগ্রহ করে নমুনায় উপস্থিত সকল জীবাণুর জিন সিকোয়েন্স করেন এবং বুঝতে পারেন কোন জীবাণু কত প্রকট ভাবে নমুনায় উপস্থিত। এভাবে বের করা হচ্ছে “রোগের মানচিত্র” আর একটা প্রাণঘাতী ভাইরাস অথবা একটা ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার আগেই সাবধান হওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে রোগের উৎপত্তি কোথায় সেটা ও বুঝা সম্ভব জীবাণুর জিন সিকোয়েন্স করে। চতুর্দশ শতকে ইউরোপ এ অভিশাপ হয়ে এসেছিলো “কালো মৃত্যু”। অণুজীববিজ্ঞানীরা আজকের বুবনিক প্লেগ এর সাথে ঐ “কালো মৃত্যু”র মিল খুঁজে পান আর সর্বশেষ জানা গেলো ঐ ভয়াবহ রোগের জন্ম চীন দেশে, আজ থেকে ৩০০০ বছর আগে। কিভাবে সম্ভব হয়েছে? সিকোয়েন্স দেখে।

ফিরে আসি ডঃ মুসের এর কথায়। তাঁর সেই রোগীর বয়স ছিল ৩৯। বাস করতো হিউস্টন থেকে ৭৫ মাইল দুরের এক গ্রামে। বাড়িতে কাজ করার সময় হঠাৎ তার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। কাশির সাথে রক্তবমি শুরু হয়। রক্তচাপ ভয়াবহ রকমের কমে যায় আর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। ডাক্তাররা তাকে চতুর্থ প্রজন্মের এন্টিবাইওটিক দেন। হিউস্টন এর মেথডিস্ট হাসপাতাল এ ভর্তির ২ দিন পর লোকটি মারা যায়। ময়নাতদন্তের সময় ডাক্তাররা অ্যান্থ্রাক্স এর জীবাণু খুঁজতে থাকে এবং তার ফুসফুসে অ্যান্থ্রাক্স এর জীবাণুর মতো দেখতে লম্বা লম্বা ব্যাকটেরিয়া পেয়েও যায়। জীবাণু গুলো ল্যাবে এনে কালচার করা হল। তখন ডঃ মুসের ভাবলেন এদের জিন এর সিকোয়েন্স করবেন। মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ডঃ মুসের তাঁর উত্তর পেয়ে যান। ওরা অ্যান্থ্রাক্স এর জীবাণু নয়। তাদের জাত ভাই। অ্যান্থ্রাক্স এর জীবাণু হল ব্যাসিলাস আন্থ্রাসিস আর ঐ ঘাতকরা ছিল ব্যাসিলাস সিরিয়াস।

কিছুদিন আগে হাইতি তে ঘটে যাওয়া কলেরার মহামারির প্রসঙ্গে আসি। ভুমিকম্পের পর ভয়াবহ কলেরা ছড়িয়ে পড়ে হাইতিতে। হার্ভার্ড এর ডঃ ম্যাথু ভেবে কুল পাচ্ছিলেন না কেন এই আকস্মিক মহামারী কারণ বিগত ১০০ বছরে হাইতিতে কেউ কলেরা দেখেনি। রোগীদের ক্লিনিক্যাল নমুনা থেকে পাওয়া কলেরার জীবাণুর জিন সিকোয়েন্স করা হল। এরপর সেই সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখা হল দুনিয়ার অন্য জায়গার কলেরার জীবাণুর জিনের সাথে। ল্যাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকা নয়, ঐ জীবাণুর সাথে মিলে গেলো এশিয়ার কলেরার জীবাণুর জিন। অণুজীববিজ্ঞানীরা উপসংহার টানলেন – কলেরার মহামারীর জন্য ভূমিকম্প পরোক্ষভাবে দায়ী। ভুমিকম্পের পর দক্ষিণ এশিয়া থেকে যাওয়া সেচ্ছাসেবীরা বহন করে নিয়ে যায় ঐ কলেরার জীবাণু আর ছড়িয়ে পড়ে হাইতি জুড়ে। আর এভাবেই নতুন প্রজন্মের জীবাণু শিকারিরা আজ আরও অনেক বেশী নিখুঁত আর নির্ভুল নিশানা তাক করছেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ রাত ১২:৩৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×