
বাংলাদেশ সময় রাত বারোটায় বাবা আমাকে কল দিলেন! সাধারণত কোন বিপদ-আপদ ছাড়া এতো রাতে কল দেয়ার কথা না। মুহূর্তেই নানাবিধ অশুভ কল্পনায় ঘুরপাক খেয়ে মোটামুটি লাফিয়ে উঠে কল ধরলাম। বাবা স্বাভাবিক ভাবেই হেসে বললেন,
- কিরে ব্যস্ত নাকিরে?
- হ্যা কিছুটা। এতো রাতে! কি ব্যাপার?
- ঘুম আসে না, ভাবলাম তোর সাথে গল্প করি!
- আচ্ছা!
'আচ্ছা' বললেও আদতে আমি চমকে উঠেছিলাম বাবার কথা শুনে। বর্তমান বাবাদের মতো আমার বাবা কোনকালেই আমার বন্ধুর মতো ছিলেন না। দেখো গেলো বিকেলে বন্ধুদের সাথে খেলছি, দূরে বাবা আসছে দেখলেই আমি দৌড়ে পালাতাম! বাবার সাথে কাজের কথার বাহিরে কখনো গল্প করেছি মনে পড়েনা। মূলত বাবার সাথে এক প্রকার রাগ করেই আমার দেশত্যাগ। কাজেই মাঝরাতে বাবার ঘুম না আসাতে বাবা আমার সাথে গল্প করবেন- ব্যাপারটা আমার জন্যে ভূত দেখার মতো!
বাবা ঘোরলাগা গলায় বললেন,
- তোদের ওখানকার পরিবেশ কেমন এখন?
- স্নোফল হচ্ছে কয়েকদিন ধরে।
- দেশে আসবি না আর?
- জানি না বাবা। দেখি!
- দেশ ছেড়ে থাকতে ভালো লাগে?
আমি কিছু বললাম না। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বুকের অতলে চেপে রাখলাম। বাবার কিছু একটা হয়েছে। বাবা আমার সাথে এমন গল্প করার মানুষ না। ব্যাপার কি? বাবাকে আমার এখন একজন মানুষিক সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে। যিনি আঁটঘাট বেঁধে নেমেছেন, তার দেশ বিভাগী অভিমানী ছেলেকে কাঁদানোর জন্যে!
- বাবা তোমার কি হয়েছে?
- কিছু না তো।
- এভাবে কথা বলছো কেনো?
- তোর বয়স কত হলো বলতো?
আমি বয়স বলতে গিয়ে চমকে উঠলাম! আজ আমার জন্মদিন! বরাবরের মতোই ভুলে বসে আছি। জন্মদিন এখন সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক। সকালে ফেসবুকে চেক না করায় একেবারেই মনে নেই! এখানে আমার বন্ধু বান্ধবও বিশেষ নেই, যারা জন্মদিন মনে রেখে শুভেচ্ছা জানাবে।
বাবা ফোনের ওপাশ থেকে হাসলেন। একে একে মা বাবা, ছোট বোন সবাই শুভেচ্ছা জানালো। বাবা বললেন, তোর জন্মদিনের কেক কাটা হবে। ফু দিয়ে মোমবাতি নিবিয়ে দে, আমি মোমবাতির সামনে ফোন ধরছি! আমি আটহাজার মাইল দূর থেকে ফোনে ফু দিলাম। দূরে থাকার সুবিধা হলো আমি যে এখন কাঁদছি এটা বাবা বুঝবেন না। ফোন রাখার আগে মাকে শুধু বললাম, দুই টুকরা কেক ফ্রীজে রেখো আম্মু! বাবাকে কিছু জানাবে না। একটা সারপ্রাইজ বাবারও পাওনা রইলো!
জাহিদ রাজ রনি
প্রথম প্রকাশ: ১ এপ্রিল ২০১৭, ছুটির দিনে, প্রথম আলো।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১০:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




