অষ্টব্যঞ্জ
মোহাম্মদ শহীদুল কায়সার লিমন
১৯৮৮ সাল। বন্যায় কবলিত সারা দেশ। এমন সময় আমাকে কুকুর কামড়ালো।
আব্বা ঢাকার মহাখালি থেকে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা আনালেন।
প্রতিদিন সকালে খালি পেটে নাভির গোড়ায় চোদ্দটি টিকা দিতে হয়েছিল।
আব্বা আমাকে নিয়ে প্রতিদিন সকালে চার কিলোমিটার দূরের বরমী বাজারে নিয়ে যেতেন। তখনকার নামকরা ডাক্তার (ডা. জাভেদ) আমাকে টিকা দিতেন। এরপর হোটেলে গিয়ে রসগোল্লা আর পরোটা দিয়ে নাশতা করতাম।
প্রতিদিন নাভির গোড়ায় একই স্থানে টিকা দেয়ায় খুব ব্যথা পেতাম। কিন্তু মিষ্টি খাওয়ার লোভে ব্যথা ভুলে যেতাম।
দুই
আমার বড়মা (বাবার দাদি) ভীষণ অসুস্থ। মারা যায় যায় অবস্থা।
সব আত্মীয় রোগী দেখার জন্য আসছেন।
আমার ছোট ফুপুর শ্বশুরও এলেন বড় মাকে দেখার জন্য। কৃপণতার জন্য এলাকায় ওনার (ফুপুর শ্বশুর) অনেক সুখ্যাতি! রোগী দেখার সময় তিনি নিয়ে এলেন বাদাম আর এক পোয়া (আড়াইশ গ্রাম) জিলাপি।
এ নিয়ে আমাদের বাড়িতে কতো হাসাহাসি হলো!
তিন
সম্ভবত ১৯৯১-৯২ সালের কথা। তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমার দূরসম্পর্কের এক দাদি মৃত্যুশয্যায়। তিনি কমলা আর চমচম খেতে চাইলেন।
তখনকার যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো ছিল না। ঢাকা থেকে কমলা এনে খাওয়ানো হলো। কিন্তু তিনি চমচমের কথা ভোলেননি। কি খেতে মন চায়, এ কথা জিজ্ঞাসা করলেই চমচমের কথা বলেন।
টাঙ্গাইলে লোক পাঠানো হলো।
চমচম আনার পর তিনি খুব তৃপ্তি সহকারে খেলেন এবং খাওয়ার আধা ঘণ্টা পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
চার
১৯৯৩ সালে আমি প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং বৃত্তি পাই।
বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আমি নানাবাড়িতে ছিলাম। আমার নানাবাড়ি উপজেলার খুবই কাছে।
আমার এক মামা সাংবাদিক। দৈনিক ইনকিলাবের উপজেলা সংবাদদাতা। মামা রাতে বাসায় এসে বৃত্তি পাওয়ার কথা জানালেন। অথচ মামা কোনো মিষ্টি নিয়ে আসেননি। বিকেলে বৃত্তি পাওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পারলেও সন্ধ্যায় সংবাদ সংগ্রহ করতে এক জায়গায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে থেকে সরাসরি বাসায় চলে এসেছেন। তিনি বাজারে যাওয়ার সময় পাননি। তাই মিষ্টিও কেনা হয়নি।
পরদিন সকালে নানা আমাকে নিয়ে বাজারে গেলেন, মিষ্টি খাওয়ালেন, জামা কিনে দিলেন এবং বাড়ির জন্য অনেক মিষ্টি কিনলেন।
পাচ
১৯৯৬ সালে কাস এইটে জুনিয়র বৃত্তি পাই।
আমি যে স্কুলে পড়তাম সে স্কুলে আমার আগে আর কেউ জুনিয়র বৃত্তি পায়নি। আমার বৃত্তি প্রাপ্তিতে প্রধান শিক্ষক ওই দিন স্কুলে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেন।
তার পরদিন স্কুলের পরিচালনা পর্ষদসহ শিক্ষকদের জন্য আব্বা স্কুলে মিষ্টি নিয়ে যান।
ছয়
১৯৯৯ সাল। আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি আনা নিয়ে স্কুলের বিএসসি শিক্ষক সিরাজস্যারের সঙ্গে সামান্য ভুল বুঝাবুঝি হয় সহপাঠী কামরুল ও সোহেলের।
স্যার, কামরুল ও সোহেল মিলে এক দোকান থেকে মিষ্টি আনবেন বলে ঠিক করেন।
সহপাঠী কামরুল ও সোহেলের দায়িত্ব ছিল স্যারকে নিয়ে দোকান থেকে মিষ্টি আনা। কিন্তু কামরুল ও সোহেল স্যারকে না জানিয়ে মিষ্টি নিয়ে চলে আসে।
স্যার দোকানে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন এবং ভীষণ রাগ করেন। তিনি অনুষ্ঠানের জন্য আনা মিষ্টি খাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজে খাওয়ার জন্য আলাদা মিষ্টি কিনে আনেন।
সহপাঠী ও স্যারদের অনেকেই মিষ্টি খাওয়ার কথা বললেও সিরাজস্যার মিষ্টি না খাওয়ায় আমি সেদিন মিষ্টি খাইনি। কিন্তু নিজের জন্য আনা মিষ্টি স্যার ঠিকই খেয়েছিলেন।
সাত
২০০৪ সালের কথা। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধলা আমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ট্রেনে ধলা স্টেশনে যাওয়া খুবই সহজ। ধলাতে খুব শস্তায় বিভিন্ন মিষ্টি পাওয়া যায়। মিষ্টির মানও বেশ ভালো।
একদিন আমরা তিন বন্ধু কবির, আবুল ও আমি ট্রেনে করে ধলা গেলাম মিষ্টি খাওয়ার জন্য। প্রতিযোগিতা করে চিড়া-দই-মিষ্টি খেলাম।
মিষ্টি খাওয়ায় আবুল প্রথম আর আমি দ্বিতীয় হই।
আট
২০০৬ সাল। আমি ঢাকার কোরানীগঞ্জে থাকি। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করি। কাস টেনের এক ছাত্রীকে পড়াতাম।
পরিবারটি ভীষণ কৃপণ।
ছাত্রীর বড়বোনের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। একদিন পাত্রপক্ষ দেখতে এলো।
পরদিন আমি পড়াতে গেলাম। আমার জন্য নাশতা এলো। প্রচুর মিষ্টি। আমি তো অবাক! প্রায় চার মাস হতে চললো, ওরা আমাকে কোনোদিন নাশতা দেয়নি।
ছাত্রীর মা এসে জানালেন পাত্র পক্ষের মিষ্টি নিয়ে আসার কথা।
পড়ানো শেষে আমি নাশতা করতে বসলাম। কিন্তু এ কি! মিষ্টি এমন লাগছে কেন? বুঝতে পারলাম এতো মিষ্টি দেয়ার রহস্য।
গরমে মিষ্টি প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। প্রায় নষ্ট হতে যাওয়া মিষ্টি দিয়েই অতিথি আপ্যায়ন করতে চেয়েছিল তারা।
বড়নল, ভিটিপাড়া (বরমী), শ্রীপুর, গাজীপুর থেকে
01911 758 533,
01711 108 684
[email protected],
[email protected]
(মৌচাকে ঢিলে প্রকাশিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


