somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ছেলে বেলা-3

০৭ ই মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেড়ানোর জায়গা গুলোর মধ্যে নানা বাড়ি ছিল আমার সবচাইতে প্রিয়। তাই কেউ নানা বাড়িতে যাবে শুনলেই সাথে যাওয়ার বায়না ধরতাম। নানা বাড়ি কেন ভাল লাগত সেটা খুব স্পষ্ট করে মনে নেই। তবে সেখানে গেলে বাবার রাগী, মেজাজী মুখ খানা দেখতে হবেনা, স্বাধীন ভাবে দৌড়ে খেলে বেড়াতে পারব, এটাই ছিল ভাল লাগার অন্যতম কারণ। নানা বাড়িতে একা গিয়েছি খুব কমই। মায়ের সাথে আমরা ভাই-বোনরা সবাই মিলে যখন যেতাম, তখন খুব ভাল লাগত। বাবা সাধারণত মায়ের সাথে যেতেন না। মা নানা বাড়িতে যেতে চাইলে বাবা একটা নৌকা ডেকে দিতেন। আমাদের পাশের গ্রামে দুজন মাঝি ছিল যারা আমাদের নান বাড়ির পথ খুব ভাল চিনতেন। বাবা সব সময় ওই মাঝিদের-ই ডাকতেন।

আমাদের নৌকা যখন নানা বাড়ির কাছাকাছি পৌছুত, দূর থেকেই দেখতাম মামা-খালারা ঘাটে দাড়িয়ে আছে। আমাদের নৌকা দেখে সাবার মাঝে একটা আনন্দের সারা পড়ে যেত। ঘাটে ভিরতে না ভিরতেই আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে নৌকা থেকে নেমে পরতাম। তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর আমাদের দেখা মিলতনা আমাদের। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত নামত, সারা পাড়া মাতিয়ে ক্লান্ত হয়ে আমরা বাড়ি ফিরতাম ।

মা ছিলেন আমার নানা-নানুর আট সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তাই মা'র নানা বাড়িতে বেড়াতে আসাটা একটু বেশী গুরুত্ত্ব পেত। প্রথম দিন থেকেই খাবার দাবারের মেনু্য পাল্টে যেত। মা সাধারণত বিকেলে রওনা দিতেন আর নানা বাড়িতে পৌছুতে পৌছুতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। নানু আগে থেকেই পিঠা বানানোর সমস্ত আয়োজন করে রাখতেন। আমরা সারা পাড়া মাতিয়ে বাড়ি ফিরে দেখতাম নানু পিঠা বানাচ্ছেন আর মা-খালারা চারদিকে ঘিরে বসে পিঠা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করছেন। আমরা মুখ-হাত ধুয়ে এসে সবার সাথে পিঠা খাওয়ায় যোগ দিতাম।

আমার নানা বাড়িতে প্রচুর ফলের গাছ ছিল। আম, জাম, কাঠাল, নাড়িকেল, তেঁতুল, কলা, বেল সহ সবই ছিল। আম আর লিচু ছিল আমার পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে। তবে নানা বাড়ির কলা ছিল আমার জন্য বিশেষ পছন্দের। মা'কে বলতে শুনেছি, দুধ-ভাত-কলা ছিল আমার ছোট বেলার সব চাইতে পছন্দের খাবার। যদিও অনেকের কাছেই মেনু্যটা চরম অখাদ্য মনে হবে। খাবারের জন্য বিরক্ত করলে মা এক প্লেট ভাত, এক বাটি দুধ আর একটি কলা মাখিয়ে দিতেন। আর তাতেই নাকি আমি ঠান্ডা হয়ে যেতাম। মা-ও ঁেবচে যেতেন। আমার এই কলা প্রীতি নানা-নানু বেশ করে মনে রাখতেন। তাই নানা বাড়িতে বেড়াতে আসছি জেনে আগে থেকেই আমার জন্য বিশাল এক কলার কাঁধি ঁেকটে রাখতেন। নানা বাড়ির দূরত্ব আমাদের বাড়ি থেকে মাএ পয়তালি্লশ মিনিটের পায়ে হাটার পথ। তাই মাঝে মাঝেই নানা ছোট মামাকে দিয়ে আমার জন্য কাঁধি কাঁধি কলা পাঠাতেন।

ছোট বেলার সেই কলা প্রীতি এখনো রয়ে গেছে। আমার এখানে (কানাজাওয়া, জাপান) সব খাবারের দামই বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশী। খাবার জিনিস থেকে শুরু করে নিত্য ব্যবহার্য সব কিছুর দামই আকাশ ছোঁয়া। বাংলাদেশের তুলনায় গড়ে প্রায় দশগুণ। তবে মোটামুটি ভাবে বাংলাদেশের সব জিনিসই পাওয়া যায়। আমার প্রিয় কলা ও পাওয়া যায় যথারীতি। তবে উচ্চমূল্যের কারণে আমার কলা প্রীতি আজ হুমকির মুখে। কলা খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দিন কে দিন কমে যাচ্ছে।

রাতের বেলা আমার নানা বাড়ির পরিবেশটা একদমই বদলে যেত। কে কার সাথে শুবে সেটা নিয়ে রিতিমত প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যেত। আমি ছোট মামার সাথে শুতে পছন্দ করতাম। কারণ, ছোট মামা খুব সুন্দর কবে গল্প বলতে পারতেন। তাছাড়া কোন গাছে কতটা আম পেকেছে, কোন গাছে শালিকের বাসা আছে, কোনটাতে বাচ্চা ফুঁটেছে, এসব খবর ছোট মামাই ভাল জানতেন। রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে সে সব তথ্য আমার জানা হয়ে যেত। সেই সাথে পরের দিনে কি কি করব তার একটা খসড়া পরিকল্পনাটা শুয়ে শুয়েই করে ফেলতাম।

ভোর হতেই আগের রাতের পরিকল্পনা মত অভিযানে নেমে পরতাম। নাস্তা খাওয়ার জন্য আমাদের আর খুঁজে পাওয়া যেত না। মাঠে মাঠে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে আর গাছে গাছে চড়ে বেড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে কখন যে বিকাল হয়ে যেত টেরই পেতাম না। পেটের ক্ষিধে যখন আর সহ্য হত না, তখন বাড়ি ফিরতে বাধ্য হতাম। কিন্ত ততক্ষণে আমাদের সারা দিনের কুকীর্তির এক গাদা অভিযোগ জমা হয়ে যেত নানার কাছে। আমার নানা ছিলেন একটু সাহেবী টাইপের মানুষ। তিনি যে ঘরটাতে থাকতেন, তার দক্ষিণ মুখো বারান্দায় সব সময় দুটো চেয়ার পাতা থাকত। তার একটি নানার জন্য বরাদ্ধ থাকত। সেটাতে অন্য কেউ বসতনা। হিসাব করলে হয়তো দেখা যাবে নানা জীবনের শেষ দিকের বেশীটা সময় ওই চেয়ারে বসেই কাটিয়েছেন। পরন্ত বেলায় আমরা যখন প্রচন্ড ক্ষিধে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম তখন নানাকে দেখা যেত দুপুরের খাবার শেষে বারান্দার ওই চেয়ারটাতে বসে পান চিবুচ্ছেন। আমরা জানতাম এখন নানার সামনে পরা মানে এক গাদা বকা খাওয়া। তাই খুব সাবধানে নানার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতাম।

------------*****------------
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেট প্রেমানন্দ মহারাজ

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮



'প্রেমানন্দ' একজন ভারতীয় হিন্দু তপস্বী ও গুরু।
১৯৭১ সালে কানপুরের কাছে 'আখরি' গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম। ১৩ বছর বয়সে প্রেমানন্দ সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য গৃহ ত্যাগ করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ বিকাল ৫:১০



আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×