বেড়ানোর জায়গা গুলোর মধ্যে নানা বাড়ি ছিল আমার সবচাইতে প্রিয়। তাই কেউ নানা বাড়িতে যাবে শুনলেই সাথে যাওয়ার বায়না ধরতাম। নানা বাড়ি কেন ভাল লাগত সেটা খুব স্পষ্ট করে মনে নেই। তবে সেখানে গেলে বাবার রাগী, মেজাজী মুখ খানা দেখতে হবেনা, স্বাধীন ভাবে দৌড়ে খেলে বেড়াতে পারব, এটাই ছিল ভাল লাগার অন্যতম কারণ। নানা বাড়িতে একা গিয়েছি খুব কমই। মায়ের সাথে আমরা ভাই-বোনরা সবাই মিলে যখন যেতাম, তখন খুব ভাল লাগত। বাবা সাধারণত মায়ের সাথে যেতেন না। মা নানা বাড়িতে যেতে চাইলে বাবা একটা নৌকা ডেকে দিতেন। আমাদের পাশের গ্রামে দুজন মাঝি ছিল যারা আমাদের নান বাড়ির পথ খুব ভাল চিনতেন। বাবা সব সময় ওই মাঝিদের-ই ডাকতেন।
আমাদের নৌকা যখন নানা বাড়ির কাছাকাছি পৌছুত, দূর থেকেই দেখতাম মামা-খালারা ঘাটে দাড়িয়ে আছে। আমাদের নৌকা দেখে সাবার মাঝে একটা আনন্দের সারা পড়ে যেত। ঘাটে ভিরতে না ভিরতেই আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে নৌকা থেকে নেমে পরতাম। তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর আমাদের দেখা মিলতনা আমাদের। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত নামত, সারা পাড়া মাতিয়ে ক্লান্ত হয়ে আমরা বাড়ি ফিরতাম ।
মা ছিলেন আমার নানা-নানুর আট সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তাই মা'র নানা বাড়িতে বেড়াতে আসাটা একটু বেশী গুরুত্ত্ব পেত। প্রথম দিন থেকেই খাবার দাবারের মেনু্য পাল্টে যেত। মা সাধারণত বিকেলে রওনা দিতেন আর নানা বাড়িতে পৌছুতে পৌছুতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। নানু আগে থেকেই পিঠা বানানোর সমস্ত আয়োজন করে রাখতেন। আমরা সারা পাড়া মাতিয়ে বাড়ি ফিরে দেখতাম নানু পিঠা বানাচ্ছেন আর মা-খালারা চারদিকে ঘিরে বসে পিঠা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করছেন। আমরা মুখ-হাত ধুয়ে এসে সবার সাথে পিঠা খাওয়ায় যোগ দিতাম।
আমার নানা বাড়িতে প্রচুর ফলের গাছ ছিল। আম, জাম, কাঠাল, নাড়িকেল, তেঁতুল, কলা, বেল সহ সবই ছিল। আম আর লিচু ছিল আমার পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে। তবে নানা বাড়ির কলা ছিল আমার জন্য বিশেষ পছন্দের। মা'কে বলতে শুনেছি, দুধ-ভাত-কলা ছিল আমার ছোট বেলার সব চাইতে পছন্দের খাবার। যদিও অনেকের কাছেই মেনু্যটা চরম অখাদ্য মনে হবে। খাবারের জন্য বিরক্ত করলে মা এক প্লেট ভাত, এক বাটি দুধ আর একটি কলা মাখিয়ে দিতেন। আর তাতেই নাকি আমি ঠান্ডা হয়ে যেতাম। মা-ও ঁেবচে যেতেন। আমার এই কলা প্রীতি নানা-নানু বেশ করে মনে রাখতেন। তাই নানা বাড়িতে বেড়াতে আসছি জেনে আগে থেকেই আমার জন্য বিশাল এক কলার কাঁধি ঁেকটে রাখতেন। নানা বাড়ির দূরত্ব আমাদের বাড়ি থেকে মাএ পয়তালি্লশ মিনিটের পায়ে হাটার পথ। তাই মাঝে মাঝেই নানা ছোট মামাকে দিয়ে আমার জন্য কাঁধি কাঁধি কলা পাঠাতেন।
ছোট বেলার সেই কলা প্রীতি এখনো রয়ে গেছে। আমার এখানে (কানাজাওয়া, জাপান) সব খাবারের দামই বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশী। খাবার জিনিস থেকে শুরু করে নিত্য ব্যবহার্য সব কিছুর দামই আকাশ ছোঁয়া। বাংলাদেশের তুলনায় গড়ে প্রায় দশগুণ। তবে মোটামুটি ভাবে বাংলাদেশের সব জিনিসই পাওয়া যায়। আমার প্রিয় কলা ও পাওয়া যায় যথারীতি। তবে উচ্চমূল্যের কারণে আমার কলা প্রীতি আজ হুমকির মুখে। কলা খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দিন কে দিন কমে যাচ্ছে।
রাতের বেলা আমার নানা বাড়ির পরিবেশটা একদমই বদলে যেত। কে কার সাথে শুবে সেটা নিয়ে রিতিমত প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যেত। আমি ছোট মামার সাথে শুতে পছন্দ করতাম। কারণ, ছোট মামা খুব সুন্দর কবে গল্প বলতে পারতেন। তাছাড়া কোন গাছে কতটা আম পেকেছে, কোন গাছে শালিকের বাসা আছে, কোনটাতে বাচ্চা ফুঁটেছে, এসব খবর ছোট মামাই ভাল জানতেন। রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে সে সব তথ্য আমার জানা হয়ে যেত। সেই সাথে পরের দিনে কি কি করব তার একটা খসড়া পরিকল্পনাটা শুয়ে শুয়েই করে ফেলতাম।
ভোর হতেই আগের রাতের পরিকল্পনা মত অভিযানে নেমে পরতাম। নাস্তা খাওয়ার জন্য আমাদের আর খুঁজে পাওয়া যেত না। মাঠে মাঠে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে আর গাছে গাছে চড়ে বেড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে কখন যে বিকাল হয়ে যেত টেরই পেতাম না। পেটের ক্ষিধে যখন আর সহ্য হত না, তখন বাড়ি ফিরতে বাধ্য হতাম। কিন্ত ততক্ষণে আমাদের সারা দিনের কুকীর্তির এক গাদা অভিযোগ জমা হয়ে যেত নানার কাছে। আমার নানা ছিলেন একটু সাহেবী টাইপের মানুষ। তিনি যে ঘরটাতে থাকতেন, তার দক্ষিণ মুখো বারান্দায় সব সময় দুটো চেয়ার পাতা থাকত। তার একটি নানার জন্য বরাদ্ধ থাকত। সেটাতে অন্য কেউ বসতনা। হিসাব করলে হয়তো দেখা যাবে নানা জীবনের শেষ দিকের বেশীটা সময় ওই চেয়ারে বসেই কাটিয়েছেন। পরন্ত বেলায় আমরা যখন প্রচন্ড ক্ষিধে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম তখন নানাকে দেখা যেত দুপুরের খাবার শেষে বারান্দার ওই চেয়ারটাতে বসে পান চিবুচ্ছেন। আমরা জানতাম এখন নানার সামনে পরা মানে এক গাদা বকা খাওয়া। তাই খুব সাবধানে নানার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতাম।
------------*****------------
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



